খুঁজুন
রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২ আশ্বিন, ১৪৩৩

বর্ষার শুরুতেই পদ্মার গ্রাসে ফরিদপুর

ফরিদপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬, ৬:৫০ অপরাহ্ণ
বর্ষার শুরুতেই পদ্মার গ্রাসে ফরিদপুর

ফরিদপুরে পদ্মা নদীর ভাঙন পরিস্থিতি দিন দিন আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। শুরুতে ভাঙনের গতি কম থাকলেও, গত প্রায় এক মাস ধরে চলা তীব্র ও ধারাবাহিক ভাঙনে ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে কয়েক কিলোমিটার এলাকা। নদীপাড়ের শত শত একর ফসলি জমি, গাছপালা ও বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন চরাঞ্চলের হাজারো মানুষ। ভাঙনের এই তীব্রতা বাড়ায় চরম আতঙ্কে দিন কাটানো নদীতীরের বাসিন্দারা জরুরি ভিত্তিতে তাদের ঘরবাড়ি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন। একই সঙ্গে ভাঙনের চরম ঝুঁকিতে রয়েছে একাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি ক্লিনিক, মসজিদ ও গুচ্ছগ্রামসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।

জেলার সদর ও সদরপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল জুড়ে বর্তমানে চলছে পদ্মার এই করাল গ্রাস। ফরিদপুর সদর উপজেলার পদ্মার তীরবর্তী নর্থ চ্যানেল ইউনিয়নে দীর্ঘ প্রায় এক মাস ধরে নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের ইউসুফ মাতুব্বরের ডাঙ্গী ও আসমত আলীর ডাঙ্গীর উত্তর-পশ্চিমে কবির মোল্লার বাড়ি থেকে দক্ষিণে মৃধাডাঙ্গী এলাকার আলেপ খাঁর বাড়ি পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এখন তীব্র ভাঙন চলছে।

 

দীর্ঘদিনের এই ভাঙনে ইতোমধ্যে কয়েক কিলোমিটার এলাকা ও কয়েক শত একর ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। জমিতে রোপণ করা পাট, তিল ও ইরি ধান হারিয়ে কৃষকেরা এখন পুরোপুরি সর্বস্বান্ত। ভাঙনকবলিত এলাকা থেকে মাত্র ১০০ মিটার দূরে অবস্থিত চর টেপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চর টেপুরা কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউসুফ মাতুব্বরের ডাঙ্গী জামে মসজিদ বর্তমানে চরম ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে। ভাঙনের মুখে পড়ে কৃষক শাহাবুদ্দিন শেখসহ চরের বহু বাসিন্দা তাদের পাকা ভিতের বাড়ি ও ঘরদোর ভেঙে অন্যত্র সরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। জমির ফসল পুরোপুরি পাকার আগেই তা কেটে ফেলতে হচ্ছে স্থানীয় কৃষকদের।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নদী থেকে অবাধে বালু লুট, অপরিকল্পিত ড্রেজিং এবং স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ না দেওয়ার কারণেই প্রতিবছর তাদের এভাবে ভিটেমাটি হারাতে হচ্ছে। ভাঙন প্রতিরোধে এ পর্যন্ত কেবল কিছু বালির বস্তা বা জিও ব্যাগ ফেলা ছাড়া কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভপ্রকাশ করেছেন তারা।

 

এদিকে জেলার সদরপুর উপজেলার আকোটের চর ইউনিয়নের শয়তানখালী ও ছলেনামা গ্রাম এলাকায় নতুন করে পদ্মা নদীর ভাঙন দেখা দিয়েছে। তীব্র ঝুঁকিতে রয়েছে আকোটের চর গুচ্ছগ্রামটি। এসব এলাকার প্রায় দুই শতাধিক পরিবার নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় এখন নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন।

 

শয়তানখালী ঘাট এলাকার বাসিন্দারা জানান, এ বছর প্রায় শতাধিক বিঘা ফসলি জমি ও গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। হঠাৎ তীব্র ভাঙন শুরু হওয়ায় ঘরবাড়ি ছেড়ে কোথায় আশ্রয় নেবেন, তা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় আছেন তারা। অনেকেই ঘরবাড়ি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

 

পদ্মার এই ভয়াবহ ভাঙন পরিস্থিতি নিয়ে সদরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শরীফ শাওন এবং ফরিদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মেশকাতুল জান্নাত রাবেয়া জানিয়েছেন, “চরাঞ্চলের এই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও ভাঙনের বিষয়টি প্রশাসন অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদারকি করছে। ইতোমধ্যে ভাঙনকবলিত এলাকাগুলো পর্যবেক্ষণ করে পুরো বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। একই সাথে দুই উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত ও নিঃস্ব হওয়া পরিবারগুলোর তালিকা তৈরি করে দ্রুত সরকারি সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং ভাঙনরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাথে সমন্বয় করে মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত তদারকি চালানো হচ্ছে বলে দুই উপজেলার স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়।”

 

ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব হোসেন জানান, “প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম শুরু হতেই ফরিদপুর সদর ও সদরপুর-উভয় উপজেলাতেই পদ্মার তীব্র নদীভাঙন দেখা দেয়। এবারও বর্ষার শুরুতেই ভাঙন পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে এবং আমরা দুটি উপজেলার পরিস্থিতিই অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছি। ইতোমধ্যে ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলো রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৩ হাজার জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে, যাতে চর টেপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি ক্লিনিক ও মসজিদসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো রক্ষা পায়। তবে চরাঞ্চলের এই বিস্তীর্ণ ভাঙন প্রতিরোধে শুধু জিও ব্যাগ ফেলা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়; তাই সদর উপজেলার নর্থ চ্যানেল এবং সদরপুরের আকোটের চরের এই কয়েক কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা জুড়ে খুব শিগগিরই একটি দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

 

স্থানীয় ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রতি বছর বর্ষা এলেই ভাঙন ঠেকানোর নামে সাময়িক জোড়াতালির কাজ না করে, এবার যেন দ্রুত দৃশ্যমান ও স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পদ্মা নদীর এই ভয়াবহ করাল গ্রাস থেকে ফসলি জমি, শত শত বসতভিটা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় সরকার দ্রুত একটি স্থায়ী টেকসই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে—এমনটাই এখন প্রত্যাশা নদীপাড়ের ভাগ্যবিড়ম্বিত হাজারো মানুষের।

গৌরীপুরের প্রাচীন নিদর্শন তালিকাভুক্ত ও পর্যটন কেন্দ্র গড়ার দাবিতে বিশ্ব পর্যটন দিবস পালিত

রায়হান উদ্দিন সরকার
প্রকাশিত: রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:২৯ অপরাহ্ণ
গৌরীপুরের প্রাচীন নিদর্শন তালিকাভুক্ত ও পর্যটন কেন্দ্র গড়ার দাবিতে বিশ্ব পর্যটন দিবস পালিত

ময়মনসিংহের গৌরীপুরে উপজেলার প্রাচীন নিদর্শন ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পুরাকীর্তির তালিকাভুক্ত করে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার দাবিতে বিশ্ব পর্যটন দিবস পালিত হয়েছে।

বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে গৌরীপুর জমিদারবাড়ির ঐতিহাসিক প্রাচীন ভবন—বর্তমানে গৌরীপুর মহিলা কলেজ প্রাঙ্গণের সামনে—সমাবেশ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশন হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি এন্ড লাইব্রেরি ও এসিক এসোসিয়েশনের যৌথ উদ্যোগে এবং ক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশনের সহযোগিতায় এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

 

এর আগে দুই দিনব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় ঐতিহাসিক ধান মহালস্থ ক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশন হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি এন্ড লাইব্রেরির মিলনায়তনে প্রাচীন নিদর্শন ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোর ওপর ডিসপ্লে ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

 

রবিবারের সমাবেশ ও আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন দি ইলেক্টোরাল কমিটি ফর বীরাঙ্গনা সখিনা সিলভার পেন অ্যাওয়ার্ড কমিটির সভাপতি ও সরকারি টেক্সটাইল ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটের অবসরপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, ক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশন হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি এন্ড লাইব্রেরির সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ রায়হান উদ্দিন সরকার, সহকারী অধ্যাপক মোশারফ হোসেন, গৌরীপুর মহিলা কলেজের প্রভাষক মো. আনোয়ার হোসেন, গৌরীপুর উপজেলা বিএনপি কমিটির সদস্য ও উপজেলা শাখার ছাত্রদলের সাবেক আহবায়ক মীর হোসেন মিরন, গৌরীপুর রিপোর্টার্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক জহিরুল হুদা লিটন, সহ-সভাপতি মো. লুৎফর রহমান খান খোকন, সাবেক সভাপতি মহসিন মাহমুদ শাহ, বিশিষ্ট সমাজসেবক আব্দুল গফুর, সাংবাদিক মোহাম্মদ সাইফুল আলম, সাংবাদিক সুপক রঞ্জন উকিল, সাংবাদিক মো. দিলীপ কুমার দাস এবং এসিক ইয়ুথ এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাহাদাৎ শাহ প্রমুখ।

 

বক্তারা বলেন, ময়মনসিংহের উত্তরের জনপদ গৌরীপুর রাজা-জমিদারদের স্মৃতিবিজড়িত একটি ঐতিহাসিক জনপদ। এখানে মুঘল, সুলতানি ও ব্রিটিশ আমলের বহু প্রাচীন নিদর্শন রয়েছে। রয়েছে ১২টি জমিদারবাড়ির ইতিহাস ও স্থাপত্যনিদর্শন, প্রাচীন মসজিদ, ঐতিহাসিক দীঘি, মন্দির, মধ্যযুগীয় মাজার, দুটি কেল্লা বা ফোর্টের ধ্বংসাবশেষ এবং ইতিহাসখ্যাত ব্যক্তিদের সমাধি।

 

এ ছাড়া পূর্ব বাংলার গীতিকায় সমৃদ্ধ বীরাঙ্গনা সখিনার ইতিহাস ও সমাধি এবং মুঘল আমলের খাজা উসমান খাঁর স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক কেল্লার নিদর্শনও গৌরীপুরের ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে বক্তারা উল্লেখ করেন।

 

তারা বলেন, এসব ঐতিহাসিক স্থাপনা ও প্রত্ননিদর্শন যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে গৌরীপুরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। এজন্য উপজেলার প্রাচীন নিদর্শনগুলো জরিপ করে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পুরাকীর্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত, সংরক্ষণ ও পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নের দাবি জানান তারা।

 

স্মারকলিপি প্রদান

সমাবেশ শেষে গৌরীপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আফিয়া আমীন পাপ্পার মাধ্যমে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের বরাবর একটি স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।

 

স্মারকলিপিতে গৌরীপুরের প্রাচীন ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো চিহ্নিত করে তালিকাভুক্তি, সংরক্ষণ এবং পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানানো হয়।

 

আয়োজকদের প্রত্যাশা, সরকারি উদ্যোগ ও স্থানীয় মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গৌরীপুরের হারিয়ে যেতে বসা ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছে তা তুলে ধরা সম্ভব হবে।