মালাউন কা বাচ্চা
১৯৭১। নয় মাস। পাক বাহিনী, বিহারি আর রাজাকারদের একটাই টার্গেট ছিল- হিন্দু নিশ্চিহ্ন করতে হবে। ওদের ধারণা ছিল, “মালাউন” শেষ করতে পারলে পাকিস্তান “পবিত্র” হবে। নির্বাচনে আওয়ামীলীগ কোনোদিন আর জিততে পারবে না।
এজন্য দেশের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত – একই কায়দায় হিন্দু নিধন শুরু হলো। কোথাও পিটিয়ে, কোথাও গলা কেটে, কোথাও ব্রাশফায়ার করে লাইন ধরে মারা হলো। আবার কোথাও কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে, কোথাও নদী-খালে ডুবিয়ে মারা হলো। দেশের প্রায় সকল হিন্দু পাড়া ওরা আক্রমন করেছে। ওদের উদ্দেশ্য ছিলো এদেশ থেকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নাম ঠিকানা মুছে দেয়া।
সৈয়দপুর গণহত্যা তার একটা নমুনা মাত্র।
রেলওয়ে শহর সৈয়দপুর। মার্চ থেকে ডিসেম্বর – নয় মাসে ৪ হাজারের বেশি হিন্দু মাটিতে মিশে গেছে। হিসাব রাখার লোক ছিল না। লাশ গোনার সময় ছিল না।
শ্যামলাল আগরওয়ালার দাদু তুলসি রামকে নিসবেতগঞ্জে নিয়ে গুলি করে মারল। রামেশ্বরলাল আগরওয়ালা, যমুনাপ্রসাদ কেডিয়া – মাড়োয়ারিপট্টির মাথা সবাইকে শেষ করলো। অনককে গুম করা হলো।
রেলওয়ে ওয়ার্কশপের লোহার চুল্লিতে জ্যান্ত শ্রমিক পুড়িয়ে মারা হলো। হাড়গোড়ও খুঁজে পাওয়া গেল না। কারখানার মধ্যিখানে শ্রমিকদের লাইনে দাঁড়িয়ে মেজর কামরুজ্জামানের আদেশে ব্রাশ ফায়ার করা হলো। হিন্দুপাড়া, মাড়োয়ারিপট্টির ঘরে ঘরে লুট। মেয়েদের ইজ্জত লুট। মন্দির ভেঙে ফেলা হলো। ওরা তুলসি মঞ্চে লাথি মারলো।
এলো ১৩ জুন। মিথ্যা আশ্বাস। মাইকে ঘোষণা দিলো – “ভারতে নিরাপদে পৌঁছে দেব।” নির্দিষ্টদিনে সৈয়দপুর রেলওয়ে প্লাটফর্মে ৪ বগির ট্রেন এলো। ৪৭৮ জন মারোয়ারী উঠল। গাদাগাদি করে সবাই বসলো। ট্রেন থেকে নামিয়ে ২০জন নারীকে সেনা জীপে উঠানো হলো। বন্ধ হলো ট্রেনের দরজা ও জানালা। পরিচিতদের তত্বাবধানে ছেড়ে দিলো ট্রেন। ঝিক্ ঝিক্ ঝিক্….কু.. কু….।
হঠাৎ গোলাহাট ব্রিজের উপর ট্রেন থামাল। দরজা খুলে গেলো। সবাই বুঝতে পারলো ভারতে আর যাওয়া হলো না।
খোলা তলোয়ার ও রামদা নিয়ে ট্রেনে উঠলো বিহারীরা।
পাক সেনা অফিসার মেজর কামরুজ্জামান হাসতে হাসতে বলল: “মালাউন কা বাচ্চা, তোম লোককো মারনে কি লিয়ে সরকারকা কিমতি গোলি কিউ খরচ কারু?”
দামি গুলি খরচ হবে না। রামদা আছেতো। মার মালায়নগো।
এক কোপে ঘাড় থেকে মাথা ছিটকে পড়লো। কোপের পরে কোপ।
২ ঘণ্টা ধরে কোপ। শিশু-বৃদ্ধ-নারী কেউ বাদ গেলো না। রেললাইন রক্তে লাল। গোলাহাট এলাকার মাটি লাল। রক্তের প্রবাহ বৃষ্টিস্নাত নদীর দিকে।
কারও হাত নেই, কারও পা নেই, কারও মাথা নেই। বিভৎস দৃশ্য। মুহূর্তে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলো ৪৩৭ জন মারোয়াড়ী নারী পুরুষ শিশু।।
ঘাতকদের অলক্ষ্যে ১০ জন মারওয়ারী যুবক তরুন লাফ দিয়ে পালালো। শ্যামলাল তাদেরই একজন। পা ভাঙা, শরীরে ৭টা কোপ। ধানক্ষেতে ২ দিন অজ্ঞান পড়ে ছিল। মাথার উপর শকুন উড়ছিল।
রজনী সিংহানিয়াকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে গেল “অফিসারদের উপহার” বানাতে। ওখান থেকে রজনী নিজে জিপ থেকে পালিয়ে লোকালয়ে আশ্রয় পেলো। ট্রেনের ভেতর রজনীর ছোটবোন কাঞ্চনকেও স্বামী বুক দিয়ে আড়াল করেও বাঁচাতে পারলো না। মরল দুজনই খুন হলো ট্রেনের ভেতর।
লাশের উপর ঘাতকদের উল্লাস: শত্রুমুক্ত হয়েছে সৈয়দপুর, হিন্দু মুক্ত হয়েছে সৈয়দপুর, পুরো পাকিস্তান রাজত্ব করবে মুসলমানেরা।
ডিসেম্বরে দেশ স্বাধীন হলো। শ্যামলাল খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে গোলাহাটে ফিরলো। রজনীও একবুক আশা নিয়ে ভারত থেকে ফিরলো।
সবার দৃষ্টি গোলাহাটের সবুজ প্রান্তরে যেখানে শুয়ে আছে ৪৩৭ জন মারওয়ারী পরিবার। স্মৃতিতে আজও ভেসে ওঠে রেললাইন এলাকা। আর বাতাসে ভাসে একটা বাক্য – “মালাউন কা বাচ্চা…তোদের পাকিস্তান ছাড়া করবো, গুলির দাম বেশি, তোদের পেছনে দামি গুলি খরচ হবে না।”
৪৩৭ জনসহ ৪ হাজারের বেশি নামহীন লাশ সৈয়দপুরের মাটিতে শুয়ে আছে। ওরা মরেছে বলেই আমরা বেঁচে আছি। ওদের ভুলে গেলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম আমাদেরও ভুলে যাবে।
মনে রাখতে হবে মালাউন কা বাচ্চা গালি নয়, একটা সম্প্রদায়কে মুছে ফেলার নীল নকশা।
সমাপ্ত

আপনার মতামত লিখুন