মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে নতুন প্রত্যয় আহত জুলাই যোদ্ধা তৌফিক শাহারিয়ারের
নিজস্ব প্রতিবেদক |
বাম হাতে এখনো অস্ত্রোপচারের দাগ। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না। তবু আহতদের অধিকার নিয়ে বৈঠক, স্মরণসভা কিংবা সংগঠনের কার্যক্রমে নিয়মিত অংশ নেন মো: তৌফিক শাহারিয়ার। বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার এই তরুণ ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে গিয়ে একাধিকবার গুরুতর আহত হয়েছিলেন। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে আজও তাঁর চোখে ভেসে ওঠে হাসপাতালের বেডে বসে থাকা মায়ের মুখ।
আমার ছেলে বেঁচে আছে, এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া। আলহামদুলিল্লাহ।” — ছেলেকে জীবিত দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে এই কথাই বলেছিলেন তৌফিকের মা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মায়ের এই একটি বাক্যই তাঁকে নতুন করে বেঁচে থাকার শক্তি জুগিয়েছিল। আজও, শরীরে আন্দোলনের ক্ষতচিহ্ন বয়ে বেড়িয়েও, সেই শক্তি নিয়েই তিনি প্রতিদিন এগিয়ে চলেন।
দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত তৌফিক ছোটবেলা থেকেই ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। স্কুলজীবনে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং তাঁর ভাষ্যমতে, ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে যুগ্ম সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, মোদি-বিরোধী ছাত্র আন্দোলন, বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদ এছাড়া যুগপৎ এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলনে একাধিক গণতান্ত্রিক কর্মসূচিতে তাঁর অংশগ্রহণের কথা জানা যায়।
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে তৌফিক মোট চারবার আহত হন বলে জানান — প্রথমবার ১৭ জুলাই, দ্বিতীয়বার ১৯ জুলাই, তৃতীয়বার আগস্ট মাসের আন্দোলনের সময় এবং সর্বশেষ ২৫ আগস্ট আনসার সদস্যদের হামলায়। তাঁর দাবি, এসব ধারাবাহিক হামলায় তাঁর বাম হাত ভেঙে যায়, বুকে গুরুতর আঘাতের ফলে কিডনিতে জটিলতা দেখা দেয় এবং আন্ডকোষে গুরুতর আঘাতে দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। এরপর তাঁকে চিকিৎসা নিতে হয় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ) ও কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে। ছাত্র অধিকার পরিষদের একজন নেতা তৌফিকের সংগঠনিক দায়িত্ব ও আন্দোলনে সম্পৃক্ততার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বর্তমানে তৌফিক ছাত্র অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও স্মৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক’ এবং জুলাই আন্দোলনে আহতদের সংগঠন ‘জুলাই জাগ্রত ফোরাম’-এর সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে আজও কষ্ট হয় তাঁর, তবু সভা-সমাবেশ কিংবা স্মরণ অনুষ্ঠান এড়িয়ে যান না তিনি। আহতদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে তিনি নিয়মিত সোচ্চার — সম্প্রতি ওসমান হাদীর বিচারের দাবিতে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ কর্মসূচিতেও অংশ নিয়েছেন তিনি।
তৌফিক একা নন। তিনি যেমন বেঁচে ফিরেছেন, তাঁর উপজেলার আরও অনেকে ফিরেননি। বরিশালের মোট ২৭ জন শহীদের মধ্যে মেহেন্দিগঞ্জ থেকেও ছিলেন একাধিকজন — পানবাড়িয়া গ্রামের ঢাকায় পড়ুয়া ১৮ বছর বয়সী সরোয়ার হোসেন খান এবং নন্দপুরা গ্রামের পোশাক শ্রমিক ২২ বছর বয়সী সুমাইয়া সুমি, উভয়েই আন্দোলনে প্রাণ হারান। জুলাই আন্দোলন কোনো একক শ্রেণির নয় — ছাত্র, শ্রমিক, রিকশাচালক থেকে পোশাক-কারখানার কর্মী পর্যন্ত বিচিত্র পেশার মানুষ দুর্নীতি, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিরুদ্ধে এক কাতারে দাঁড়িয়েছিলেন। তৌফিকের ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাই বৃহত্তর এক সামাজিক আন্দোলনেরই প্রতিচ্ছবি, যেখানে আঘাত ও আত্মত্যাগ কোনো একক শ্রেণি বা পেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।

এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপট থেকেই তৌফিকের বর্তমান উদ্বেগ — জুলাই গণঅভ্যুত্থান যেন কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত না হয়। তিনি বলেন, “জুলাই সবার। যারা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করেছেন, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, আহত হয়েছেন কিংবা জীবন উৎসর্গ করেছেন — তারাই জুলাইয়ের প্রকৃত শক্তি। জুলাইকে বিভাজনের নয়, জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ধরে রাখতে হবে।” বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি নানা সময়ে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের যে সমালোচনা রয়েছে, সেই প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, জুলাইয়ের চেতনা যেন একই পরিণতি না পায়।
বর্তমান অবস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আহত ও শহীদ পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। তাদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন, সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। জুলাইয়ের প্রকৃত ইতিহাস সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো স্বৈরাচারী শক্তি আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে।”মেহেন্দিগঞ্জের সরোয়ার হয়তো ফিরে আসতে পারেননি। কিন্তু তৌফিকের মতো হাজারো আহত যোদ্ধা আছেন, যাঁরা প্রতিদিন নিজের শরীরের যন্ত্রণাকে জয় করে এগিয়ে চলেছেন।
“আজও প্রতিনিয়ত শরীরের ব্যথা নিয়ে চলাফেরা করি,” বলেন তৌফিক শাহারিয়ার। “কিন্তু দেশের মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার এবং জুলাইয়ের চেতনা রক্ষার প্রশ্নে আমি কখনো আপস করিনি, ভবিষ্যতেও করব না। যতদিন বেঁচে থাকব, এই লড়াই চালিয়ে যেতে চাই।”

আপনার মতামত লিখুন