খুঁজুন
রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২ আশ্বিন, ১৪৩৩

বনদস্যুদের বিরুদ্ধে অভিযানের ‘খেসারত’: চুনারুঘাটে ডেপুটি রেঞ্জারকে পিটিয়ে হত্যাচেষ্টা ও লুটপাট

সৈয়দ আখলাক উদ্দিন মনসুর
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬, ১১:১৮ অপরাহ্ণ
বনদস্যুদের বিরুদ্ধে অভিযানের ‘খেসারত’: চুনারুঘাটে ডেপুটি রেঞ্জারকে পিটিয়ে হত্যাচেষ্টা ও লুটপাট

হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে বনদস্যুদের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযান পরিচালনা ও মামলা দায়েরের জের ধরে সিলেট বন বিভাগের এক ডেপুটি রেঞ্জারের ওপর নারকীয় হামলার অভিযোগ উঠেছে। হত্যার উদ্দেশ্যে মোটরসাইকেলে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার পর তাকে বেধড়ক মারধর, মোবাইল ফোন ও ব্যবহৃত মোটরসাইকেল ভাঙচুর এবং নগদ ২০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় মৌলভীবাজারের কুলাউড়া রেঞ্জে কর্মরত ডেপুটি রেঞ্জার সৈয়দ আশিক আহমদ (৫৪) বাদী হয়ে চুনারুঘাট থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে চুনারুঘাট উপজেলার ১০ নম্বর মিরাশি ইউনিয়নের রতনপুর (প্রকাশ গোয়াছপুর) গ্রামের আজগর আলী ওরফে কনা মিয়ার ছেলে মিজানুর রহমান সোহাগকে। অভিযুক্ত সুহাগ মিরাশি ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ও কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন। তাকে চুনারুঘাট পূর্বাঞ্চলের গাছচুরি ও মাদকের ‘গডফাদার’ এবং ত্রাস হিসেবে চেনে স্থানীয়রা।

অভিযোগের বিস্তারিত ও হামলার বিবরণ:
এজাহারে উল্লেখ করা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত হবিগঞ্জ বন বিভাগে কর্মরত থাকাকালে সৈয়দ আশিক আহমদ বনদস্যুদের বিরুদ্ধে একাধিক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এর মধ্যে অভিযুক্ত সুহাগের সহযোগীদের বিরুদ্ধে চুনারুঘাট থানায় একাধিক মামলা এবং সুহাগের নিজের বিরুদ্ধেও বন বিভাগের একটি মামলা রয়েছে। এসব আইনগত পদক্ষেপের কারণে সুহাগ দীর্ঘদিন ধরে ওই কর্মকর্তাকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আসছিল।
গত ৫ আগস্ট দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নালমুখ বাজার থেকে নিজ বাড়িতে ফেরার পথে নালমুখ-সাটিয়াজুরি সড়কে সুহাগ তার সহযোগীদের নিয়ে ডেপুটি রেঞ্জারের মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে। পরে হত্যার উদ্দেশ্যে মোটরসাইকেল দিয়ে ধাক্কা দিলে তিনি সড়কে ছিটকে পড়েন। এরপর তাকে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়। হামলার সময় তার মোটরসাইকেলের লুকিং গ্লাস ও স্যামসাং গ্যালাক্সি মোবাইল ফোন আছড়ে ভেঙে ফেলা হয় এবং শার্টের পকেট থেকে নগদ ২০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। সৈয়দ আশিক আহমদের ডাক-চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে আসামিরা প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে পালিয়ে যায়। পরে আহত অবস্থায় তাকে চুনারুঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয় এবং চিকিৎসা শেষে রাতে তিনি চুনারুঘাট থানায় মামলা দায়ের করেন।

প্রশাসনিক প্রতিবেদনে গাছচুরির তথ্য, তবুও অধরা সুহাগ:
সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কার্যালয়ের এক গোপনীয় প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান ও রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্য থেকে অবৈধভাবে গাছ চুরি করে পাচারের মূল নেপথ্যে রয়েছেন এই সুহাগ। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থানীয় সাবেক সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার সুমনের দাপট দেখিয়ে সুহাগ বনের মূল্যবান গাছ লুটপাট করেন। অভিযোগ রয়েছে, থানা পুলিশকে অনৈতিকভাবে ম্যানেজ করার কারণে একাধিক অপরাধের সাথে যুক্ত থাকলেও কোনো এজাহারে তার নাম আসেনি; উল্টো বহু নিরীহ মানুষকে আসামি করা হয়েছে।
৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পরও তিনি বর্তমানে কতিপয় বিএনপি নেতার ছত্রছায়ায় থেকে অবাধে বনসম্পদ লুট ও মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।

‘খাট উপহার’ ও অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে সখ্যতা

গোপন অনুসন্ধানে জানা গেছে, চুনারুঘাট পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় গাঁজা ও ফেনসিডিল চোরাচালানের প্রধান ট্রানজিট পয়েন্ট চণ্ডী চা-বাগান ও চণ্ডীছড়া এলাকা। এসব অবৈধ সিন্ডিকেট সচল রাখতে সুহাগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে কৌশলগতভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখেন।
বনের চোরাই সেগুন কাঠ দিয়ে তৈরি বিলাসবহুল খাট-পালং উপহার দিয়ে তিনি অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করতেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানাগেছে । খাট উপহার দিয়ে পুলিশ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব বিস্তার করতেন তিনি। চণ্ডী চা-বাগানের ডিজিএম বাংলো ও আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সাথে নিয়ে তাকে খোলামেলা আড্ডা দিতেও দেখা যায়। সেনাবাহিনীর নাম ভাঙিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন
আওয়ামী শাসন আমলে সাবেক এমপি সুমনের প্রভাব কাজে লাগিয়ে সেনাবাহিনীর রেশনের আটা-চাল বিক্রির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে সুহাগ কিছু কর্মকর্তার সাথে ছবি তোলার সুযোগ পান। বর্তমানে সেই পুরোনো ছবিগুলো দেখিয়ে এলাকায় তিনি নিজেকে ‘সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ঠ’ হিসেবে জাহির করেন এবং সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখান। ৫ আগস্টের পূর্বে রাজনৈতিক পরিচয়ে দাপট দেখালেও বর্তমানে তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাম ভাঙিয়ে অপরাধের সাম্রাজ্য রক্ষা করছেন।

জনগণের ক্ষোভ ও আইনের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন
চুনারুঘাট থানার রেকর্ড অনুযায়ী, সুহাগের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলাসহ (এফআইআর নং ৮, জিআর ১৮৯- যেখানে তিনি ৪২ নম্বর আসামি) চুরি, ডাকাতি ও ধর্ষণের অভিযোগে ৬ থেকে ৭টি মামলা রয়েছে।
এতগুলো গুরুতর মামলা ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন থাকা সত্ত্বেও প্রকাশ্য দিবালোকে তার চলাফেরা নিয়ে স্থানীয়দের মনে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সৈয়দ আশিক হতাশা প্রকাশ করে বলেন, যে লোক প্রকাশ্যে অপরাধ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাম ভাঙিয়ে ঘুরে বেড়ায়, তাকে গ্রেপ্তার না করা প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা।
এলাকাবাসীর দাবি, চুনারুঘাটে মাদক, অবৈধ বনসম্পদ লুটপাট ও রাজনৈতিক সন্ত্রাসের প্রতীক হয়ে ওঠা এই ‘ডেভিল মিজানুর রহমান সুহাগ’ সিন্ডিকেটের হাত থেকে চুনারুঘাটকে রক্ষা করতে প্রশাসন যেন দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
এবিষয়ে চুনারুঘাট থানার ওসি মো: সাইফুল ইসলাম বলেন – অভিযোগ পেয়েছি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

গৌরীপুরের প্রাচীন নিদর্শন তালিকাভুক্ত ও পর্যটন কেন্দ্র গড়ার দাবিতে বিশ্ব পর্যটন দিবস পালিত

রায়হান উদ্দিন সরকার
প্রকাশিত: রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:২৯ অপরাহ্ণ
গৌরীপুরের প্রাচীন নিদর্শন তালিকাভুক্ত ও পর্যটন কেন্দ্র গড়ার দাবিতে বিশ্ব পর্যটন দিবস পালিত

ময়মনসিংহের গৌরীপুরে উপজেলার প্রাচীন নিদর্শন ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পুরাকীর্তির তালিকাভুক্ত করে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার দাবিতে বিশ্ব পর্যটন দিবস পালিত হয়েছে।

বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে গৌরীপুর জমিদারবাড়ির ঐতিহাসিক প্রাচীন ভবন—বর্তমানে গৌরীপুর মহিলা কলেজ প্রাঙ্গণের সামনে—সমাবেশ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশন হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি এন্ড লাইব্রেরি ও এসিক এসোসিয়েশনের যৌথ উদ্যোগে এবং ক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশনের সহযোগিতায় এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

 

এর আগে দুই দিনব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় ঐতিহাসিক ধান মহালস্থ ক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশন হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি এন্ড লাইব্রেরির মিলনায়তনে প্রাচীন নিদর্শন ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোর ওপর ডিসপ্লে ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

 

রবিবারের সমাবেশ ও আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন দি ইলেক্টোরাল কমিটি ফর বীরাঙ্গনা সখিনা সিলভার পেন অ্যাওয়ার্ড কমিটির সভাপতি ও সরকারি টেক্সটাইল ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটের অবসরপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, ক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশন হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি এন্ড লাইব্রেরির সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ রায়হান উদ্দিন সরকার, সহকারী অধ্যাপক মোশারফ হোসেন, গৌরীপুর মহিলা কলেজের প্রভাষক মো. আনোয়ার হোসেন, গৌরীপুর উপজেলা বিএনপি কমিটির সদস্য ও উপজেলা শাখার ছাত্রদলের সাবেক আহবায়ক মীর হোসেন মিরন, গৌরীপুর রিপোর্টার্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক জহিরুল হুদা লিটন, সহ-সভাপতি মো. লুৎফর রহমান খান খোকন, সাবেক সভাপতি মহসিন মাহমুদ শাহ, বিশিষ্ট সমাজসেবক আব্দুল গফুর, সাংবাদিক মোহাম্মদ সাইফুল আলম, সাংবাদিক সুপক রঞ্জন উকিল, সাংবাদিক মো. দিলীপ কুমার দাস এবং এসিক ইয়ুথ এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাহাদাৎ শাহ প্রমুখ।

 

বক্তারা বলেন, ময়মনসিংহের উত্তরের জনপদ গৌরীপুর রাজা-জমিদারদের স্মৃতিবিজড়িত একটি ঐতিহাসিক জনপদ। এখানে মুঘল, সুলতানি ও ব্রিটিশ আমলের বহু প্রাচীন নিদর্শন রয়েছে। রয়েছে ১২টি জমিদারবাড়ির ইতিহাস ও স্থাপত্যনিদর্শন, প্রাচীন মসজিদ, ঐতিহাসিক দীঘি, মন্দির, মধ্যযুগীয় মাজার, দুটি কেল্লা বা ফোর্টের ধ্বংসাবশেষ এবং ইতিহাসখ্যাত ব্যক্তিদের সমাধি।

 

এ ছাড়া পূর্ব বাংলার গীতিকায় সমৃদ্ধ বীরাঙ্গনা সখিনার ইতিহাস ও সমাধি এবং মুঘল আমলের খাজা উসমান খাঁর স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক কেল্লার নিদর্শনও গৌরীপুরের ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে বক্তারা উল্লেখ করেন।

 

তারা বলেন, এসব ঐতিহাসিক স্থাপনা ও প্রত্ননিদর্শন যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে গৌরীপুরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। এজন্য উপজেলার প্রাচীন নিদর্শনগুলো জরিপ করে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পুরাকীর্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত, সংরক্ষণ ও পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নের দাবি জানান তারা।

 

স্মারকলিপি প্রদান

সমাবেশ শেষে গৌরীপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আফিয়া আমীন পাপ্পার মাধ্যমে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের বরাবর একটি স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।

 

স্মারকলিপিতে গৌরীপুরের প্রাচীন ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো চিহ্নিত করে তালিকাভুক্তি, সংরক্ষণ এবং পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানানো হয়।

 

আয়োজকদের প্রত্যাশা, সরকারি উদ্যোগ ও স্থানীয় মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গৌরীপুরের হারিয়ে যেতে বসা ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছে তা তুলে ধরা সম্ভব হবে।