বনদস্যুদের বিরুদ্ধে অভিযানের ‘খেসারত’: চুনারুঘাটে ডেপুটি রেঞ্জারকে পিটিয়ে হত্যাচেষ্টা ও লুটপাট
হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে বনদস্যুদের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযান পরিচালনা ও মামলা দায়েরের জের ধরে সিলেট বন বিভাগের এক ডেপুটি রেঞ্জারের ওপর নারকীয় হামলার অভিযোগ উঠেছে। হত্যার উদ্দেশ্যে মোটরসাইকেলে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার পর তাকে বেধড়ক মারধর, মোবাইল ফোন ও ব্যবহৃত মোটরসাইকেল ভাঙচুর এবং নগদ ২০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় মৌলভীবাজারের কুলাউড়া রেঞ্জে কর্মরত ডেপুটি রেঞ্জার সৈয়দ আশিক আহমদ (৫৪) বাদী হয়ে চুনারুঘাট থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে চুনারুঘাট উপজেলার ১০ নম্বর মিরাশি ইউনিয়নের রতনপুর (প্রকাশ গোয়াছপুর) গ্রামের আজগর আলী ওরফে কনা মিয়ার ছেলে মিজানুর রহমান সোহাগকে। অভিযুক্ত সুহাগ মিরাশি ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ও কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন। তাকে চুনারুঘাট পূর্বাঞ্চলের গাছচুরি ও মাদকের ‘গডফাদার’ এবং ত্রাস হিসেবে চেনে স্থানীয়রা।
অভিযোগের বিস্তারিত ও হামলার বিবরণ:
এজাহারে উল্লেখ করা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত হবিগঞ্জ বন বিভাগে কর্মরত থাকাকালে সৈয়দ আশিক আহমদ বনদস্যুদের বিরুদ্ধে একাধিক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এর মধ্যে অভিযুক্ত সুহাগের সহযোগীদের বিরুদ্ধে চুনারুঘাট থানায় একাধিক মামলা এবং সুহাগের নিজের বিরুদ্ধেও বন বিভাগের একটি মামলা রয়েছে। এসব আইনগত পদক্ষেপের কারণে সুহাগ দীর্ঘদিন ধরে ওই কর্মকর্তাকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আসছিল।
গত ৫ আগস্ট দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নালমুখ বাজার থেকে নিজ বাড়িতে ফেরার পথে নালমুখ-সাটিয়াজুরি সড়কে সুহাগ তার সহযোগীদের নিয়ে ডেপুটি রেঞ্জারের মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে। পরে হত্যার উদ্দেশ্যে মোটরসাইকেল দিয়ে ধাক্কা দিলে তিনি সড়কে ছিটকে পড়েন। এরপর তাকে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়। হামলার সময় তার মোটরসাইকেলের লুকিং গ্লাস ও স্যামসাং গ্যালাক্সি মোবাইল ফোন আছড়ে ভেঙে ফেলা হয় এবং শার্টের পকেট থেকে নগদ ২০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। সৈয়দ আশিক আহমদের ডাক-চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে আসামিরা প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে পালিয়ে যায়। পরে আহত অবস্থায় তাকে চুনারুঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয় এবং চিকিৎসা শেষে রাতে তিনি চুনারুঘাট থানায় মামলা দায়ের করেন।
প্রশাসনিক প্রতিবেদনে গাছচুরির তথ্য, তবুও অধরা সুহাগ:
সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কার্যালয়ের এক গোপনীয় প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান ও রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্য থেকে অবৈধভাবে গাছ চুরি করে পাচারের মূল নেপথ্যে রয়েছেন এই সুহাগ। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থানীয় সাবেক সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার সুমনের দাপট দেখিয়ে সুহাগ বনের মূল্যবান গাছ লুটপাট করেন। অভিযোগ রয়েছে, থানা পুলিশকে অনৈতিকভাবে ম্যানেজ করার কারণে একাধিক অপরাধের সাথে যুক্ত থাকলেও কোনো এজাহারে তার নাম আসেনি; উল্টো বহু নিরীহ মানুষকে আসামি করা হয়েছে।
৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পরও তিনি বর্তমানে কতিপয় বিএনপি নেতার ছত্রছায়ায় থেকে অবাধে বনসম্পদ লুট ও মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।
‘খাট উপহার’ ও অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে সখ্যতা
গোপন অনুসন্ধানে জানা গেছে, চুনারুঘাট পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় গাঁজা ও ফেনসিডিল চোরাচালানের প্রধান ট্রানজিট পয়েন্ট চণ্ডী চা-বাগান ও চণ্ডীছড়া এলাকা। এসব অবৈধ সিন্ডিকেট সচল রাখতে সুহাগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে কৌশলগতভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখেন।
বনের চোরাই সেগুন কাঠ দিয়ে তৈরি বিলাসবহুল খাট-পালং উপহার দিয়ে তিনি অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করতেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানাগেছে । খাট উপহার দিয়ে পুলিশ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব বিস্তার করতেন তিনি। চণ্ডী চা-বাগানের ডিজিএম বাংলো ও আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সাথে নিয়ে তাকে খোলামেলা আড্ডা দিতেও দেখা যায়। সেনাবাহিনীর নাম ভাঙিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন
আওয়ামী শাসন আমলে সাবেক এমপি সুমনের প্রভাব কাজে লাগিয়ে সেনাবাহিনীর রেশনের আটা-চাল বিক্রির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে সুহাগ কিছু কর্মকর্তার সাথে ছবি তোলার সুযোগ পান। বর্তমানে সেই পুরোনো ছবিগুলো দেখিয়ে এলাকায় তিনি নিজেকে ‘সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ঠ’ হিসেবে জাহির করেন এবং সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখান। ৫ আগস্টের পূর্বে রাজনৈতিক পরিচয়ে দাপট দেখালেও বর্তমানে তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাম ভাঙিয়ে অপরাধের সাম্রাজ্য রক্ষা করছেন।
জনগণের ক্ষোভ ও আইনের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন
চুনারুঘাট থানার রেকর্ড অনুযায়ী, সুহাগের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলাসহ (এফআইআর নং ৮, জিআর ১৮৯- যেখানে তিনি ৪২ নম্বর আসামি) চুরি, ডাকাতি ও ধর্ষণের অভিযোগে ৬ থেকে ৭টি মামলা রয়েছে।
এতগুলো গুরুতর মামলা ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন থাকা সত্ত্বেও প্রকাশ্য দিবালোকে তার চলাফেরা নিয়ে স্থানীয়দের মনে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সৈয়দ আশিক হতাশা প্রকাশ করে বলেন, যে লোক প্রকাশ্যে অপরাধ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাম ভাঙিয়ে ঘুরে বেড়ায়, তাকে গ্রেপ্তার না করা প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা।
এলাকাবাসীর দাবি, চুনারুঘাটে মাদক, অবৈধ বনসম্পদ লুটপাট ও রাজনৈতিক সন্ত্রাসের প্রতীক হয়ে ওঠা এই ‘ডেভিল মিজানুর রহমান সুহাগ’ সিন্ডিকেটের হাত থেকে চুনারুঘাটকে রক্ষা করতে প্রশাসন যেন দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
এবিষয়ে চুনারুঘাট থানার ওসি মো: সাইফুল ইসলাম বলেন – অভিযোগ পেয়েছি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আপনার মতামত লিখুন