অবৈধ সম্পদ, জমি দখল ও অপরাধ সাম্রাজ্যের অভিযোগ : নাজিম সরকারের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অনুসন্ধান
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রত্যয় রাষ্ট্রের অন্যতম ভিত্তি। তবে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষের জমি দখল, সরকারি সম্পত্তি আত্মসাৎ, প্রতারণা, চাঁদাবাজি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের মতো গুরুতর অভিযোগে বিভিন্ন ব্যক্তির নাম সামনে এসেছে। এমনই নানা অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন নাজিম সরকার।

স্থানীয় বাসিন্দা, ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে নাজিম সরকারের বিরুদ্ধে জমি দখল, জাল দলিল ব্যবহার, সরকারি সম্পত্তি দখল, অর্থ আত্মসাৎ, চাঁদাবাজি এবং ক্ষমতাসীন ও প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগসাজশের নানা অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে।
মন্দির ও ধর্মীয় সম্পত্তি দখলের অভিযোগ
নাজিম সরকারের বিরুদ্ধে তার বাড়ির পেছনে থাকা একটি ঐতিহাসিক মন্দির ও এর আশপাশের দেবোত্তর সম্পত্তি দখলের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই জমি দখল করে সেখানে একটি ফ্যাক্টরি নির্মাণ করা হয়েছে এবং সেখান থেকে বাণিজ্যিক সুবিধা নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ওই সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ থাকলেও নাজিম সরকারের প্রভাবের কারণে অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস করেননি।
ধউর ও আশপাশে জমি দখলের অভিযোগ
নাজিম সরকারের বিরুদ্ধে তার বাড়ির এলাকা থেকে ধউর পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যক্তি, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মালিকানাধীন জমি দখলের অভিযোগও রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জাল বা বিতর্কিত দলিল ব্যবহার এবং প্রশাসনিক প্রভাবের ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন জমিতে ফ্যাক্টরি ও বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। পরে এসব স্থাপনা বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছে ভাড়া বা লিজ দিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।

রাজধানীতে একাধিক বাড়ি ও ফ্ল্যাটের তথ্য
নাজিম সরকারের বিরুদ্ধে অবৈধ উপায়ে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, রাজধানীর উত্তরায় তার একাধিক বাড়ি এবং ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, উত্তরায় তার ছয় থেকে সাতটি বাড়ি রয়েছে। এর মধ্যে একটি বাড়ি বিশেষ নকশায় নির্মিত এবং অত্যন্ত বিলাসবহুল বলে দাবি করা হচ্ছে।
‘উত্তোলন’ প্রকল্পে খাস জমি ও জলাশয় দখলের অভিযোগ
রাজধানীর উপকণ্ঠে ‘উত্তোলন’ নামের একটি প্রকল্পের ভেতরে থাকা সরকারি খাস জমি ও জলাশয় দখলের অভিযোগও উঠেছে নাজিম সরকারের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই প্রকল্পের প্রায় ১০০ বিঘা সরকারি খাস জমি ও জলাশয় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে দখলে নেওয়া হয়েছে। এসব জমি ও জলাশয়ের ওপর বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ রয়েছে।
বেরিবাঁধের সরকারি জায়গা দখল ও চাঁদা আদায়ের অভিযোগ
নদী তীরবর্তী ও বেরিবাঁধসংলগ্ন সরকারি জায়গা দখল করে সেখানে অস্থায়ী দোকান, গ্যারেজসহ বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে নাজিম সরকারের বিরুদ্ধে।
দোকানদার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত ভাড়া বা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ করেছেন কয়েকজন স্থানীয় ব্যবসায়ী। তাদের দাবি, একটি প্রভাবশালী চক্রের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে এসব অর্থ আদায় করা হয়েছে।
অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ
‘আবির্ভাব সমিতি’ নামে একটি সংগঠনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সদস্য ফি, সঞ্চয় ও শেয়ার বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহের অভিযোগও রয়েছে নাজিম সরকারের বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীদের দাবি, সংগঠনের তহবিল থেকে সদস্যদের প্রাপ্য অর্থ বা লভ্যাংশ ফেরত দেওয়া হয়নি। বরং ওই অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
বন্ধু হুমায়ূন আহমেদকে হত্যা: অভিযোগ ও রহস্য
নাজিম সরকারের বিরুদ্ধে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হুমায়ূন আহমেদকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ব্যক্তিগত সম্পর্কের জের ধরে হুমায়ূন আহমেদকে পুবাইলে নাজিম সরকারের বাংলোবাড়িতে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগকারীরা দাবি করছেন।
তবে ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
পুবাইলে ৭০ বিঘা জমির বাংলোবাড়ি ও প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্ক
গাজীপুরের পুবাইলে প্রায় ৭০ বিঘা জমির ওপর নাজিম সরকারের একটি বাংলোবাড়ি রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই সম্পত্তির মালিকানা ও জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
এ ছাড়া তৎকালীন ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদের সঙ্গে নাজিম সরকারের ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীরা দাবি করছেন, প্রভাবশালী ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে দুই বিঘা জমি এবং দুই কোটি টাকা দেওয়ার বিনিময়ে বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা নেওয়া হয়েছিল।
উত্তরা কেন্দ্রিক প্রভাব ও অপরাধচক্রের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন ডিবি কর্মকর্তা হারুন অর রশীদের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে উত্তরা ও আশপাশের এলাকায় বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য, জমি দখল, টেন্ডার এবং চাঁদাবাজির কর্মকাণ্ডে নাজিম সরকার প্রভাব বিস্তার করতেন।
স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ীর অভিযোগ, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হতো।
আশা ইউনিভার্সিটির জমি নিয়ে জাল দলিলের অভিযোগ
আশা ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ-এর জমি নিয়ে জাল দলিল ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে নাজিম সরকারের বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীদের দাবি, জাল বা বিতর্কিত দলিলের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট মূল্যবান জমি বিক্রির চেষ্টা বা লেনদেন করা হয়েছিল। পরে বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়।
রাজনৈতিক পরিচয়ে পুনর্বাসনের অভিযোগ
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নাজিম সরকার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সাবেক ও বর্তমান জনপ্রতিনিধি এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তুলে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করছেন এমন অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এর মাধ্যমে তিনি অতীতের বিভিন্ন অভিযোগ আড়াল করে নতুন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বলয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন।
ক্লাব, বার ও অন্যান্য ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
উত্তরা এলাকার কয়েকটি ক্লাব ও বিনোদনকেন্দ্রের ওপর নাজিম সরকারের প্রভাব রয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিভিন্ন ক্লাবের ব্যবসা ও পরিচালনায় তার সম্পৃক্ততার দাবি করা হলেও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ক্লাব কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেওয়া প্রয়োজন।
এ ছাড়া ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বার ব্যবসা এবং বিনোদনকেন্দ্র পরিচালনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। তার মালিকানাধীন বা নিয়ন্ত্রিত ‘ইস্পা সেন্টার’কে ঘিরেও অনৈতিক ও অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে বলে কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
নাজিম সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো জমি দখল, সরকারি সম্পত্তি দখল, জাল দলিল, অর্থ আত্মসাৎ, চাঁদাবাজি, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং গুরুতর অপরাধে সম্পৃক্ততার দাবি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে অভিযোগগুলোর তদন্ত করা হলে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসবে। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অবৈধভাবে অর্জিত সম্পত্তি থাকলে তা আইনানুগ প্রক্রিয়ায় জব্দ বা বাজেয়াপ্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

আপনার মতামত লিখুন