জনপ্রিয় অভিনেতা চ্যালেঞ্জারের ১৬তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ
ঢাকার ডাক বিনোদন: কখনো মন্ত্রী, কখনো নাপিত, আবার কখনো গ্রামের সাধারণ মানুষ। চরিত্র যেমনই হোক, সাবলীল অভিনয় আর স্বতন্ত্র সংলাপ বলার ভঙ্গিতে দর্শকের মন জয় করেছিলেন অভিনেতা চ্যালেঞ্জার। প্রধান চরিত্রে না থেকেও নিজের উপস্থিতিকে স্মরণীয় করে রাখার বিশেষ দক্ষতা ছিল তাঁর। বিশেষ করে হুমায়ূন আহমেদের নাটকে অভিনয় করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন তিনি।
সোমবার (১২ অক্টোবর) জনপ্রিয় এই অভিনেতার ১৬তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১০ সালের এই দিনে মারা যান তিনি। মৃত্যুর এত বছর পরও তাঁর অভিনীত নাটক ও চলচ্চিত্রের চরিত্রগুলো দর্শকের স্মৃতিতে রয়ে গেছে।
চ্যালেঞ্জারের প্রকৃত নাম এ এস এম তোফাজ্জল হোসেন। পরিবারের কাছে তিনি সাদেক নামে পরিচিত ছিলেন। তবে অভিনয়জগতে ‘চ্যালেঞ্জার’ নামেই পরিচিতি পান। ১৯৫৯ সালের ১০ আগস্ট ঢাকার খিলগাঁওয়ের হাজীপাড়ায় তার জন্ম। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। তার ছোট বোন জনপ্রিয় অভিনেত্রী মনিরা মিঠু।
২০০০ সালে হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত ‘হাবলঙ্গের বাজার’ নাটকের মাধ্যমে অভিনয়জীবন শুরু করেন চ্যালেঞ্জার। প্রথম কাজেই নিজের অভিনয়দক্ষতার পরিচয় দেন তিনি। এরপর হুমায়ূন আহমেদের একের পর এক নাটকে অভিনয় করে হয়ে ওঠেন দর্শকের পরিচিত মুখ।
চ্যালেঞ্জারের অভিনয়জীবনের অন্যতম আলোচিত কাজ ‘মন্ত্রী মহোদয়ের আগমন’। নাটকটিতে মন্ত্রীর চরিত্রে তার অভিনয় দর্শকের বিশেষ নজর কাড়ে। ক্ষমতাবান ব্যক্তির আচরণ, কথাবার্তা ও অঙ্গভঙ্গি তিনি এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, যা তাঁর অভিনয়জীবনের স্মরণীয় কাজগুলোর একটি হয়ে রয়েছে।
হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘উড়ে যায় বকপক্ষী’তেও অভিনয় করেছিলেন চ্যালেঞ্জার। এ ছাড়া ‘পিশাচ মকবুল’, ‘জুতা বাবা’, ‘বৃক্ষমানব’, ‘খোয়াবনগর’, ‘আজিজ সাহেবের পাপ’ ও ‘ওয়ারেন্ট’-এর মতো নাটকে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে দেখা গেছে তাঁকে।
চ্যালেঞ্জারের অভিনীত নাটকের তালিকায় আরও রয়েছে ‘শওকত সাহেবের গাড়ি কেনা’, ‘চন্দ্র কারিগর’, ‘গণি সাহেবের শেষ কিছুদিন’, ‘কালা কইতর’, ‘লীলাবতী’, ‘সালেক দফাদার’, ‘ঢোলবাত্তি’, ‘আজ জরির বিয়ে’, ‘চোর’ ও ‘জিন্দা কবর’। সালাহউদ্দিন লাভলু পরিচালিত জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘ভবের হাট’-এও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি।
দুই শতাধিক টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করেছেন চ্যালেঞ্জার। তার অভিনয়ের বিশেষত্ব ছিল সাধারণ চরিত্রকেও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা। সংলাপ বলার নিজস্ব ধরন, মুখের অভিব্যক্তি এবং পরিস্থিতির সঙ্গে মানানসই অভিনয়ের কারণে ছোট চরিত্রেও দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখতে পারতেন তিনি। টেলিভিশনের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন চ্যালেঞ্জার। ২০০১ সালে হুমায়ূন আহমেদের ‘দুই দুয়ারী’ চলচ্চিত্রে ট্রেনের যাত্রীর চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে তার।
এরপর ২০০৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘শ্যামল ছায়া’য় অভিনয় করেন তিনি। ‘লাল-সবুজ’ চলচ্চিত্রে সোহরাব আলী, ‘নয় নম্বর বিপদ সংকেত’-এ করিম এবং ‘দারুচিনি দ্বীপ’-এ জরির বাবার চরিত্রে দেখা যায় তাঁকে। এ ছাড়া আমজাদ হোসেন পরিচালিত ‘কাল সকালে’ চলচ্চিত্রে মাতবর সাহেবের চরিত্রেও অভিনয় করেছিলেন তিনি।
চ্যালেঞ্জারের ব্যক্তিজীবন ছিল সংগ্রামমুখর। পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে অল্প বয়স থেকেই দায়িত্ব নিতে হয়েছিল তাকে। কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে ভাই-বোনদের বড় করে তোলেন। পরে অভিনয়জগতে এসে ধীরে ধীরে অর্জন করেন পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা। তবে তাঁর অভিনয়জীবন দীর্ঘ হয়নি। ২০১০ সালের ১২ অক্টোবর মারা যান এই অভিনেতা। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটক ও চলচ্চিত্র অঙ্গন হারায় একজন দক্ষ চরিত্রাভিনেতাকে।
অভিনয়ের জন্য বড় কোনো পুরস্কার না পেলেও দর্শকের ভালোবাসা অর্জন করেছিলেন চ্যালেঞ্জার। ‘মন্ত্রী মহোদয়ের আগমন’-এর মন্ত্রী থেকে ‘নয় নম্বর বিপদ সংকেত’-এর করিম কিংবা ‘দারুচিনি দ্বীপ’-এর জরির বাবা, ভিন্নধর্মী এসব চরিত্র তাঁর অভিনয়দক্ষতার পরিচয় বহন করে।
প্রয়াণের ১৬ বছর পরও পুরোনো নাটক ও চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দর্শকের কাছে পরিচিত মুখ হয়ে আছেন চ্যালেঞ্জার। অল্প সময়ের অভিনয়জীবনে দুই শতাধিক নাটক ও বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে কাজ করে বাংলাদেশের অভিনয়জগতে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিলেন তিনি।

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]