গুমের শিকার পরিবারেরগুলোর সংগঠন মায়ের ডাকের সমন্বয়ক সানজিদা তুলি ও গুম থেকে ফেরত ভিকটিম ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান, জুলাই অভ্যুত্থানে সম্মুখসারীতে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও হাসনাত আব্দুল্লাহ এসময় উপস্থিত ছিলেন। সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর নেতৃত্বে জাদুঘরের কিউরেটর তানজীম ওয়াহাব, মেরিনা তাবাসসুম খান, জুলাই জাদুঘরের গবেষকসহ দায়িত্বশীল অন্যান্যরা আগতদের পুরো জাদুঘর ঘুরিয়ে দেখান। জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে অভ্যুত্থানের ছবি, বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন, শহীদদের পোশাক, চিঠিপত্র, গুরুত্বপূর্ণ দলিল, সে সময়কার পত্রিকার কাটিং, অডিও-ভিডিওসহ নানা উপকরণ সংরক্ষণ করা হয়েছে। এছাড়া, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্যও সেখানে সংরক্ষিত রয়েছে।
জাদুঘরে পরিদর্শনে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস ১৫ মিনিটের একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখেন— যেখানে ফ্যাসিস্ট শাসনামলে গুম, রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত দমন-পীড়ন, বিরোধীদের ওপর হামলা এবং চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত গণহত্যার চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণ করেছে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়। পরিদর্শনকালে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘‘এই জাদুঘর জুলাই শহীদদের রক্ত তাজা থাকতেই করা সম্ভব হয়েছে, এটা গোটা পৃথিবীর এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত।’’ তিনি বলেন, ‘‘আমরা চাই না ভবিষ্যতে কোথাও যেন আর এমন জাদুঘর তৈরির প্রয়োজন হোক। যদি আমাদের জাতি কখনো কোনো কারণে দিশেহারা হয় তবে এই জাদুঘরে পথ খুঁজে পাবে।’’ প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘‘দেশের প্রতিটি নাগরিকের উচিত হবে— এখানে এসে একটি দিন কাটানো, শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে এই জাদুঘরে আসবেন। এই জাদুঘরে একটা দিন কাটালে মানুষ জানতে পারবে— কী নৃশংসতার মধ্য দিয়ে এ জাতিকে যেতে হয়েছে। এখানে যে আয়নাঘরগুলো তৈরি হয়েছে, সেখানে কিছু সময়, কয়েক ঘণ্টা অথবা একটা দিন কেউ যদি থাকতে চায় সে যেন থাকতে পারে।’’
তিনি বলেন, ‘‘আয়নাঘরে বসে পরিদর্শনকারীরা উপলব্ধি করতে পারে কী নৃশংসতার মধ্যে বন্দিরা ছিল! এ ধরনের নৃশংস ঘটনা না হওয়ার পক্ষে কীভাবে আমরা সবাই এক থাকতে পারি, সেটা মনের মধ্যে আনতে হবে। এই একটা মতে আমরা সবাই এক থাকবো— এই ধরনের নৃশংস দিনগুলোতে এ জাতি আর ফিরে যাবে না।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘নৃশংস একটা কাণ্ড হচ্ছিল। তরুণরা, ছাত্ররা এটার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, প্রতিহত করেছে। তাদের কোনও অস্ত্রশস্ত্র ছিল না, কিছু ছিল না। সাধারণ মানুষও যে এমন নির্ভয়ে, সাহসিকতার সঙ্গে অস্ত্রের মুখে দাঁড়াতে পারে— এটাই আমাদের শিক্ষা।’’ সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীসহ জাদুঘরের কাজে নিয়োজিত সবাইকে ধন্যবাদ জানান প্রধান উপদেষ্টা। সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, ‘‘অল্প সময়ে এই জাদুঘরের কাজ এই পর্যায়ে এসেছে এটা একটা রেকর্ড। এটা সম্ভব হয়েছে অনেক ছেলেমেয়ের অক্লান্ত পরিশ্রমে। আট মাস ধরে বিনা পারিশ্রমিকে এখানে কাজ করেছেন অনেকে। তাদের সবার প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা জানাই।’’ তিনি বলেন, ‘‘আমাদের আরও বেশ কিছু সেকশনের কাজ আগামী কিছুদিনের মধ্যেই শেষ হবে। এবং নির্বাচনের আগেই সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। জুলাই জাদুঘর ইতিহাসের চিহ্ন বহন করে দাঁড়িয়ে থাকবে। বাংলাদেশের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের রাজনীতির আকর হয়ে থাকবে এটা। ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ডিসকোর্স-শিক্ষা-গবেষণায়, শিল্প-সাহিত্য চর্চায়ও এই জাদুঘর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’’
আপনার মতামত লিখুন