ভারতে ছাত্র জনতার ব্যাপক আন্দোলনে বিপাকে সরকার
ঢাকার ডাক আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা, বিশেষ করে জাতীয় স্তরের উচ্চমানের প্রবেশিকা পরীক্ষাগুলোর ধারাবাহিক প্রশ্নপত্র ফাঁস ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা এ বিক্ষোভ এখন বিজেপি সরকারের জন্য এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে আর ছাত্র জনতার ব্যাপক আন্দোলনে বিপাকে পড়েছে নরেন্দ্র মোদির সরকার।
ভারতের ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বা এনটিএ পরিচালিত নিট-ইউজি ও ইউজিসি-নেট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসকে কেন্দ্র করে যে অনলাইন ক্ষোভ শুরু হয়েছিল, তা দিল্লির জন্তর-মন্তর, সংসদ ভবন চত্বর এবং দেশের বিভিন্ন রাজ্যের প্রধান সড়কগুলোতে লাখ লাখ তরুণের স্বতঃস্ফূর্ত গণবিস্ফোরণে রূপ নিয়েছে। দিল্লির রাজপথে দমন-পীড়নের তোয়াক্কা না করে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীর অবস্থান কর্মসূচি মোদী সরকারের ক্ষমতার ভিতকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রথম দিকে বিক্ষোভকারীদের মূল দাবি কেবল কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং দায়ী কর্মকর্তাদের শাস্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, আন্দোলনের ব্যাপ্তি বৃদ্ধির সাথে সাথে তা সরকারের সামগ্রিক নীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যর্থতা এবং শাসন ব্যবস্থার জবাবদিহির ওপর সরাসরি অনাস্থায় রূপান্তরিত হয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বিগত এক দশকে মোদি সরকার কৃষক আন্দোলন, শাহীন বাগের বিক্ষোভ কিংবা নাগরিকত্ব আইনবিরোধী আন্দোলনের মুখোমুখি হলেও, এবারের ছাত্র-যুব আন্দোলনটি সরকারের অস্তিত্বের জন্য অনেক বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। কারণ এটি সরকারের প্রধান রাজনৈতিক ও নির্বাচনী স্তম্ভ অর্থাৎ দেশের তরুণ ভোটারদের সরাসরি প্রতিপক্ষে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
বর্তমানে ভারতে ৩৫ বছর বয়সের নিচে তরুণ ও যুবকের সংখ্যা প্রায় ৬৫ কোটির বেশি, যা যেকোনো দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতি নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। ২০১৪ এবং ২০১৯ সালের ভারতের সাধারণ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিশাল বিজয়ের পেছনে এই তরুণ ও প্রথমবার ভোট দেওয়া নাগরিকদের বিপুল সমর্থন সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল। তবে বিগত কয়েক বছরে ভারতে চাকরির সংকট এবং পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা তাদের সেই আশাকে হতাশায় পরিণত করেছে।
গত এক দশকে ভারতের কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন রাজ্য পর্যায়ের সরকারি নিয়োগ এবং প্রবেশিকা পরীক্ষায় অন্তত ৮৯টিরও বেশি বড় ধরনের প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে সরাসরি প্রভাবিত হয়েছেন ২ কোটিরও বেশি চাকরিপ্রার্থী ও শিক্ষার্থী। শুধু ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক নিট পরীক্ষার কথাই যদি বিবেচনা করা হয়, তবে প্রতি বছর ২৪ লাখেরও বেশি তরুণ চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নে এই পরীক্ষায় অংশ নেন।সেন্টার ফর মনিটরিং ইনডিয়ান ইকোনমির (সিএমআইই) একটি আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারতের শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং যখন মেধা ও কঠোর পরিশ্রমের বদলে লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে প্রশ্ন কিনে নেওয়ার সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেই হতাশা কেবল ব্যক্তিপর্যায়ে থাকে না, তা একটি সম্পূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। এই আন্দোলনটি মোদি সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংকটাপন্ন হওয়ার দ্বিতীয় প্রধান কারণ হলো ভারতীয় পার্লামেন্টের বর্তমান সমীকরণ ও জোট সরকারের নাজুক পরিস্থিতি।
আগের দুই মেয়াদে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার পরিচালনা করলেও, ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর নরেন্দ্র মোদিকে তেলেগু দেসম পার্টি (টিডিপি) এবং জনতা দল ইউনাইটেডের মতো আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর ভর করে ৩.০ বা তৃতীয় মেয়াদের জোট সরকার চালাতে হচ্ছে। টিডিপি ও জেডি-ইউ-এর মতো দলগুলোর মূল নির্বাচনী ভিত্তি তাদের নিজ নিজ রাজ্যের যুবসমাজ ও সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। রাজপথে আন্দোলনরত হাজার হাজার ক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার ওপর চরম পুলিশি নির্যাতন কিংবা আন্দোলন দীর্ঘায়িত হওয়ার ফলে রাজ্য রাজনীতিতে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, তাতে সরকারের ভেতরের এই শরিক দলগুলো ভেতরে ভেতরে চরম অস্বস্তিতে পড়েছে।
রয়টার্স ও দ্য হিন্দু-র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জোট সরকারের শরিক দলের একাধিক প্রবীণ নেতা জানিয়েছেন, তরুণদের এই মৌলিক ক্ষোভকে পুলিশি লাঠিচার্জ বা কাঁদানে গ্যাস দিয়ে দাবিয়ে রাখার সরকারি নীতি দীর্ঘমেয়াদে তাদের নিজ নিজ রাজ্যে নির্বাচনী বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ফলে এই ইস্যুতে মোদি সরকার যদি অতি দ্রুত সন্তোষজনক কোনো সমাধানে না পৌঁছায়, তবে জোটের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পেয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের টিকে থাকাই সংশয়ে পড়ে যেতে পারে।
রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ক্ষমতাসীন বিজেপি বরাবরই যেকোনো আন্দোলনকে দমন বা দুর্বল করতে ধর্মীয় মেরুকরণ, জাতিগত বিভাজন কিংবা বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির ‘দেশবিরোধী চক্রান্ত’ বলে তকমা দেওয়ার পুরোনো ব্যাকরণ ব্যবহার করে সাফল্য পেত।
কিন্তু গবেষক ও প্রখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান যুব আন্দোলনের বিরুদ্ধে এই প্রথাগত কৌশল পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে এবং এটিই মোদি সরকারকে সবচেয়ে বেশি ভীতিতে ফেলেছে।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক অপূর্বানন্দ এ বিষয়ে তার এক বিশেষ রাজনৈতিক পর্যালোচনায় লিখেছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্নীতির বিস্তার এবং বেকারত্ব এমন কতগুলো বিষয় যা কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, জাত বা রাজনৈতিক ভাবাদর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উত্তর প্রদেশের একজন হিন্দু মধ্যবিত্ত পরীক্ষার্থী কিংবা বিহারের একজন অনগ্রসর শ্রেণির চাকরিপ্রার্থী হুবহু একই প্রশাসনিক জালিয়াতির শিকার হয়েছেন।
অধ্যাপক অপূর্বানন্দ বলেন, যখন সাধারণ তরুণরা বুঝতে পারে যে তাদের ভবিষ্যৎ রক্ষার লড়াইয়ে তারা সবাই একই নৌকার যাত্রী, তখন সরকারের পক্ষ থেকে একে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা বিরোধী দলের চক্রান্ত হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা আর কাজ করে না। বরং উল্টো সরকারের এই ধরনের অনমনীয় মনোভাব আন্দোলনকারীদের আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ ও ক্ষুব্ধ করে তোলে। আন্দোলনের মুখে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রতি সাধারণ তরুণদের তীব্র অনাস্থাও সরকারকে চরম চাপের মুখে ফেলেছে। বিচারবিভাগ, পার্লামেন্ট কিংবা দেশের মূলধারার বেশ কিছু কর্পোরেট গণমাধ্যম সাধারণ মানুষের সংকট সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না বলে মনে করছেন রাজপথে থাকা শিক্ষার্থীরা।
যখন কোনো গণতান্ত্রিক দেশে তরুণরা অনুধাবন করে যে দেশের প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক পথগুলো তাদের সুরাহা দিতে ব্যর্থ এবং গণমাধ্যম কেবল সরকারি প্রচারণায় ব্যস্ত, তখন তারা বাধ্য হয়ে রাজপথকে দাবি আদায়ের চূড়ান্ত ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেয়।
ছাত্ররা আজ কোনো মধ্যস্থতা বা কাগুজে আশ্বাস মানতে রাজি নয়, কারণ বিগত কয়েক বছরে অসংখ্য তদন্ত কমিটি ও কমিশন গঠন করা হলেও মূল অপরাধী চক্র এবং প্রশাসনিক মাথার কোনো শাস্তি হয়নি। ফলে আন্দোলনকারীরা এখন রাজপথ ছাড়তে অস্বীকার করছেন, যা দিল্লির কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক এলাকাকে এক প্রকার স্থবির করে রেখেছে।
রাজনৈতিক চাপ প্রবল হওয়ায় শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেই এনডিএ জোটের সংসদীয় দলের বৈঠকে এই বিষয়ে মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছেন। দ্য হিন্দু ও টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী মোদি প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই পুরো ঘটনাকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও ‘ঘোর পাপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং আশ্বাস দিয়েছেন যে দেশের যুবসমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা অপরাধীদের বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না।
কেন্দ্রীয় সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, নিট ও ইউজিসি-নেট পরীক্ষার অনিয়ম সামনে আসার পরপরই সরকার তাৎক্ষণিক কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে (সিবিআই) তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং ১৩ জনেরও বেশি প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ যাতে কোনোভাবেই নষ্ট না হয় তা নিশ্চিত করতে অতি দ্রুত পুনর্র্নিবাচনের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের অপরাধ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে ‘পাবলিক এক্সামিনেশনস (প্রিভেনশন অব আনফেয়ার মিন্স) অ্যাক্ট ২০২৪’ প্রয়োগের মাধ্যমে কঠোর শাস্তির বিধান নিশ্চিত করা হচ্ছে। তবে আন্দোলনকারী ছাত্র সংগঠন ও সংসদ ভবনের অভিমুখে পদযাত্রা পরিচালনাকারী ‘চকরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি-র সমন্বয়করা মোদি সরকারের এই বক্তব্যকে কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা ঢাকার অপচেষ্টা ও ‘ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ’ (ড্যামেজ কন্ট্রোল) কৌশল হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দিল্লির রাজপথে শুরু হওয়া এই অভূতপূর্ব যুব আন্দোলন মোদি শাসনের গত এক দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও বাস্তবমুখী চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ২০২০-২১ সালের ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলনের পর মোদি সরকারকে কোনো জাতীয় ইস্যুতে এভাবে পিছু হটতে বা আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে যেতে দেখা যায়নি। পুলিশি ব্যারিকেড, গ্রেপ্তার, অনশনরত অ্যাক্টিভিস্ট সোনাম ওয়াংচুকের আটকাদেশ কিংবা জলকামানের মুখেও তরুণদের রাজপথ আঁকড়ে ধরে থাকার এই জেদ প্রমাণ করে যে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে।
ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ এই তরুণ সমাজ যদি সরকারের প্রতি তাদের আস্থা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলে, তবে কেবল শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ বা প্রশাসনিক সংস্কারের ঘোষণাই মোদি সরকারের জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন