বাংলাদেশের ২৩ তম রাষ্ট্রপতি
শ্রেণিকক্ষের ব্ল্যাকবোর্ড থেকে রাষ্ট্রপতির বঙ্গভবন। চক-ডাস্টারের গন্ধ থেকে রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনারের সালাম। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন গল্প কম। কিন্তু ২০ আগস্ট ২০২৬ সালে এসে সেটাই সত্য হলো।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপির মহাসচিব। ঠাকুরগাঁও এর শিক্ষক। সাবেক মন্ত্রী। আর আজ তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২৩ তম রাষ্ট্রপতি।
নির্বাচন কমিশনের গেজেটে সই করেছেন সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন ফলাফল ঘোষণা করেছেন। ৩৪৯ জন ভোটারের মধ্যে ৩৪৩ জন ভোট দিয়েছেন। মির্জা ফখরুল পেয়েছেন ২৫৫ ভোট। প্রতিদ্বন্দ্বী এলডিপির প্রেসিডেন্ট কর্নেল অব. অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। রাজনীতির মানুষরা বলেন “এটা বিএনপির কৌশল”। সাধারণ মানুষ বলে “একজন শিক্ষক রাষ্ট্রের অভিভাবক হলেন”।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি, ঠাকুরগাঁও জেলায়। পিতা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন প্রখ্যাত আইনজীবী, রাজনীতিক, সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী। মাতা মির্জা ফাতেমা আমিন। চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ও মন্ত্রী। আরেক চাচা এস আর মির্জা ১৯৭১ সালে মুজিবনগর সরকারের সাথে যুক্ত ছিলেন। স্ত্রী রাহাত আরা বেগম। তাদের দুই কন্যা সন্তান মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ।
ছোটবেলা কেটেছে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অর্থনীতিতে অনার্স ও মাস্টার্স। ডিগ্রি শেষ করেই তিনি ১৯৭২ সালে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেন। কর্মজীবন শুরু করেন ঢাকা কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে। এরপর বিভিন্ন সময়ে দিনাজপুর সরকারি কলেজ ও ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত তিনি উপ-প্রধানমন্ত্রীর সচিব হিসেবে কাজ করেন। এরপর আবার ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে ফিরে আসেন এবং ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন।
সহকর্মীরা বলেন, “ফখরুল স্যার ক্লাসে ঢুকলেই ঘড়ি দেখতেন না। ৫০ মিনিটের ক্লাস ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট হয়ে যেত”। তার পড়ানোর স্টাইল ছিল গল্প দিয়ে বোঝানো। “মুদ্রাস্ফীতি” বোঝাতে তিনি বাজারের পেঁয়াজের দামের উদাহরণ দিতেন। “বেকারত্ব” বোঝাতে গ্রামের যুবকদের কথা বলতেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি ছাত্রদের নিয়ে বিতর্ক, আবৃত্তি, নাটক করাতেন। কলেজের বার্ষিক ম্যাগাজিনের সম্পাদকও ছিলেন। তার ডায়েরিতে লেখা থাকত “শিক্ষক মানে যে শুধু পড়ায় না, যে মানুষ গড়ে”। ১৯৮৬ সালে তিনি চাকরি ছেড়ে পুরোদমে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। কিন্তু আজও ঠাকুরগাঁও গেলে পুরনো ছাত্ররা বলে “স্যার”। শিক্ষকতা তার রক্তে মিশে আছে।
শিক্ষকতা ছাড়ার পর রাজনীতি শুরু হয় তৃণমূল থেকে। ১৯৮৮ সালে নিরপেক্ষ প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯০ এর দশকের শুরুতে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগদান করেন এবং ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হন। ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালে মোট ৪ বার ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৬ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এই ৬ মাসে তিনি ৪৫৭১টি ইউনিয়ন পরিষদে অনলাইন জন্মনিবন্ধন ও ট্রেড লাইসেন্স চালু করেন, ১০ হাজার কিলোমিটার গ্রামীণ রাস্তা মেরামতের বরাদ্দ দেন এবং ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য সমবায় ব্যাংকের মাধ্যমে সুদবিহীন ঋণের ব্যবস্থা করেন। সচিবরা বলতেন “স্যার ফাইল ১০ মিনিটের বেশি রাখতেন না। নোট দিয়ে ফেরত দিতেন”। মাঠ পর্যায়ের চেয়ারম্যান- মেম্বাররা বলত “মন্ত্রী স্যার ফোন ধরেন”। ২০১১ সালে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সালে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি দলটিকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। বিভিন্ন সময়ে প্রায় ১৪ বছর কারাবাস করেছেন।
২৪ জুলাই ২০২৬। তৎকালীন ২২-তম রাষ্ট্রপতি অসুস্থতা দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। ৬ আগস্ট নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় দুজনের মধ্যে। বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর প্রার্থী ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ১ দলীয় জোটের প্রার্থী ছিলেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি এলডিপির প্রেসিডেন্ট কর্নেল অব. অলি আহমদ। ২০ আগস্ট ২০২৬, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভোটগ্রহণ হয়। মোট ভোটার ৩৪৯ জন। ভোট পড়ে ৩৪৩টি। ফলাফলে মির্জা ফখরুল পান ২৫৫ ভোট এবং অলি আহমদ পান ৮৮ ভোট। সন্ধ্যায় নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করে। সই করেন সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। গেজেটে বলা হয় “রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯১ এর ধারা ১ অনুসারে… মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর-কে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বিধিমালা, ১৯১ এর বিধি ১২ (৬) অনুযায়ী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হইয়াছেন মর্মে ঘোষণা করা হইল”। ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন “এখন শপথ আয়োজনের বিষয়টি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে”।
দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দুটি নাম আসে। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয় মির্জা ফখরুলের নামে। তিনটি কারণে তাকে বেছে নেওয়া হয়। এক, ত্যাগ ও গ্রহণযোগ্যতা। ১৪ বছর কারাবাস ও আন্দোলন। দলের সবচেয়ে সিনিয়র ও ত্যাগী নেতা। দুই, ভাবমূর্তি। শিক্ষক ও সাবেক মন্ত্রী হিসেবে তার ইমেজ পরিচ্ছন্ন, বিতর্ক কম। তিন, আঞ্চলিক ভারসাম্য। উত্তরাঞ্চল, ঠাকুরগাঁও থেকে প্রতিনিধিত্ব। বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে সংসদে ভোটাভুটির দরকার হয়নি।
নব নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বলেছেন “আমি একজন শিক্ষক। শিক্ষক কখনো ছাত্রকে শত্রু ভাবে না। রাষ্ট্রপতি হিসেবে আমার কাজ হবে সব দল, সব মতের মানুষকে এক টেবিলে বসানো”। তিনি তিনটি অগ্রাধিকার ঘোষণা করেছেন। প্রথমটি শিক্ষা ও গবেষণা। “আমি বঙ্গভবনকে ‘জ্ঞানের বঙ্গভবন’ বানাতে চাই। প্রতি মাসে ১০ জন শিক্ষক, গবেষক ও ছাত্রকে এখানে আমন্ত্রণ জানাব।” তিনি রাষ্ট্রপতির তহবিল থেকে ১০ কোটি টাকা দিয়ে “জাতীয় শিক্ষক কল্যাণ ট্রাস্ট” গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। দ্বিতীয়টি স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ। মন্ত্রী থাকার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি বলেছেন “ইউনিয়ন পরিষদকে শক্তিশালী না করলে গণতন্ত্র নিচ পর্যন্ত যাবে না”। তৃতীয়টি জাতীয় সংলাপ। রাজনৈতিক সংকটে তিনি অল পার্টি সংলাপের উদ্যোগ নিয়েছেন। বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ, শিক্ষক সবাইকে ডাকছেন। বঙ্গভবনের কর্মকর্তারা বলেন, রাষ্ট্রপতি প্রতিদিন সকাল ৭টায় উঠেন। এক ঘণ্টা বই পড়েন। টেবিলে এখনও অর্থনীতির বই থাকে।
সমালোচকরা তিনটি প্রশ্ন তুলেছেন। এক, দলীয় রাষ্ট্রপতি। বিএনপির মহাসচিব থেকে রাষ্ট্রপতি। তিনি কি নিরপেক্ষ থাকতে পারবেন? ফখরুলের উত্তর “আমি আজ থেকে কোনো দলের না। আমি ১৮ কোটি মানুষের”। দুই, সাংবিধানিক ভূমিকা। রাষ্ট্রপতি পদ মূলত আনুষ্ঠানিক। কিন্তু সংকটে তার সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেনাবাহিনী, নির্বাচন কমিশন, তত্ত্বাবধায়ক— এসব বিষয়ে তার ভূমিকা কী হবে? তিন, শিক্ষকসুলভ নমনীয়তা। রাজনীতি কঠিন। শিক্ষকের নরম সুরে কি কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে? সমর্থকরা বলেন, “একজন শিক্ষকই পারেন জাতিকে বিভক্তি থেকে বাঁচাতে”।
ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে এখন উৎসব। ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা “আমাদের স্যার রাষ্ট্রপতি”। তার প্রথম ব্যাচের ছাত্র, এখন ৭০ বছরের বৃদ্ধ আব্দুল হামিদ বলেন, “স্যার ক্লাসে বলতেন, বড় হও। দেশের জন্য কিছু করো। আজ স্যার নিজেই দেশের সবচেয়ে বড় চেয়ারে”। সামাজিক মাধ্যমে ট্রেন্ড #TeacherPresident। তরুণরা পোস্ট দিচ্ছে “শিক্ষকরাই জাতি গড়ে”। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম লিখেছে “From Classroom to Bangabhaban: Bangladesh gets a Teacher as President”।
বাংলাদেশের ২২ জন রাষ্ট্রপতির মধ্যে সেনা কর্মকর্তা, আইনজীবী, ব্যবসায়ী ছিলেন। কিন্তু পেশাদার শিক্ষক থেকে সরাসরি রাষ্ট্রপতি এটা প্রথম। এটা তিনটি বার্তা দেয়। এক, রাজনীতিতে ভদ্রতার প্রত্যাবর্তন। গালাগালি, হুমকির রাজনীতির বদলে একজন শিক্ষকের ভাষা। দুই, মেধার মূল্যায়ন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্র, বিসিএস ক্যাডার, কলেজের শিক্ষক— মেধা দিয়ে উপরে ওঠা সম্ভব। তিন, স্থানীয় নেতৃত্বের উত্থান। ঠাকুরগাঁও এর মতো সীমান্ত জেলা থেকেও রাষ্ট্রপতি হওয়া যায়।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার পরিবারও এখন আলোচনায়। পিতা মির্জা রুহুল আমিন আইনজীবী ও রাজনীতিক। মাতা মির্জা ফাতেমা আমিন। স্ত্রী রাহাত আরা বেগম শিক্ষক ছিলেন। কন্যা মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ দুজনেই উচ্চশিক্ষিত। পরিবারের লোকজন বলেন, “তিনি বাসায় এখনও সকালে পত্রিকা পড়ে নোট করেন। শিক্ষকের অভ্যাস যায়নি”।
মির্জা ফখরুলের জীবন একটা সার্কেল। ১৯৭২ এ বিসিএস ক্যাডার হয়ে ক্লাসরুম। ২০০১ এ মন্ত্রণালয়। ২০২৪ এ আবার মন্ত্রী। ২০২৬ এ বঙ্গভবন। তিনি বলেছেন “আমি রাষ্ট্রপতি হয়েছি, কিন্তু শিক্ষকতা ছাড়িনি। জাতিই আমার সবচেয়ে বড় ক্লাস”। আগামী ৫ বছর তার সামনে চ্যালেঞ্জ। নির্বাচন, অর্থনীতি, আঞ্চলিক রাজনীতি। একজন শিক্ষক কিভাবে এই কঠিন প্রশ্নের উত্তর দেন সেটাই এখন দেখার বিষয়। ইতিহাস লিখবে, ২০ আগস্ট ২০২৬ সালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির চেয়ারে বসেছিলেন একজন শিক্ষক। যিনি ১৯৭২ সালে চক দিয়ে বোর্ডে চক দিয়ে সাজেশন লিখতেন, আর আজ সংবিধান দিয়ে দেশ চালাবেন।
শেষ করার আগে তার পুরনো ডায়েরির একটা লাইন দিয়ে শেষ করি। ১৯৭৮ সালে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের শিক্ষক কক্ষে লেখা “যদি কখনো সুযোগ পাই, আমি আমার ছাত্রদের জন্য, আমার দেশের জন্য স্কুলের মতো একটা সুন্দর রাষ্ট্র বানাব। যেখানে সবাই পড়বে, শিখবে, বড় হবে।” আজ সেই সুযোগ এসেছে। দেখার পালা শিক্ষক রাষ্ট্রপতি কী করেন।

আপনার মতামত লিখুন