বিল ডাকাতিয়া : দুঃসহ স্মৃতি ও নতুন স্বপ্ন
খুলনা জেলার ফুলতলা আর ডুমুরিয়ার মাঝখানে শুয়ে আছে একটা সমুদ্র। নাম তার বিল ডাকাতিয়া। পশ্চিমা বাহিনীর নদী নামেও পরিচিত। বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিল। প্রায় ত্রিশ হাজার একর জমি নিয়ে এর বিস্তার। খুলনা মহানগরীর খানজাহান আলী ও আড়ংঘাটা থানা এবং খুলনার ডুমুরিয়া-ফুলতলা, যশোরের কেশবপুর, মণিরামপুর ও অভয়নগর উপজেলার অংশ জুড়ে এর অবস্থান। ২২.৯১° উত্তর ৮৯.৪৫° পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত এই বিল গাঙ্গেয় জোয়ারভাটা বিধৌত বদ্বীপীয় সমভূমির অন্তর্গত।
বর্ষায় যখন পানি আসে, তখন মনে হয় আকাশ নেমে এসেছে মাটিতে। এপার ওপার দেখা যায় না। শুধু ঢেউ আর ঢেউ। শীতকালে সেই সমুদ্র শুকিয়ে হয়ে যায় ধুধু মাঠ। আর চৈত্রে ফেটে যায় মাটি। এই বিলের নামের সাথে মিশে আছে আমাদের পূর্বপুরুষের ভয়, কান্না, আর বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
শাহাপুর গ্রামের মিজানুর রহমান ছোটবেলায় নানার মুখে শুনেছে, এই বিলের নাম কেন ডাকাতিয়া। তাকে তার নানা বলতেন, “নানু, এই বিলের পানি মানুষের রক্ত খায়।” তখন বুঝতাম না। বড় হয়ে বুঝেছি, এই একটা নামের ভেতর ২০০ বছরের ইতিহাস লুকিয়ে আছে। আর সেই ইতিহাসের গোড়ায় আছে সুন্দরবন।
শত বছর আগে এই পুরো এলাকা ছিল সুন্দরবনের কাছাকাছি। আজকের ফুলতলা, ডুমুরিয়া, পাইকগাছা, কয়রা, দাকোপ — সবই ছিল গহীন বনের অংশ আর জোয়ারের খাল। জোয়ারের পানি এসে বন ভাসিয়ে দিত। ভাটায় নেমে যেত।
বিল সংলগ্ন গ্রামে পুকুর কাটলে আজও ৫/৬ ফুট নিচে পোড়া সুন্দরী কাঠ পাওয়া যায়। কালো হয়ে যাওয়া গুঁড়ি। এটা প্রমাণ করে এখানে একসময় সুন্দরী গাছের জঙ্গল ছিল। জোয়ার-ভাটার পানিতে গাছ মরে পচে মাটির নিচে চাপা পড়েছে। বৃদ্ধরা বলে, “এই মাটির গন্ধেই সুন্দরবনের গন্ধ আছে।”
মিজানুর রহমানের নানা বলতেন, তার দাদার আমলেও এই বিলে বাঘ আসত। রাতের বেলা বিলের পাড়ে গরু-ছাগল টেনে নিয়ে যেত। তখন মানুষ বিলকে ভয় পেত দুই কারণে। এক, ডাকাত। দুই, বাঘ।
বিলটির ভৌগোলিক অবস্থান ৮৯°২০´ পূর্ব থেকে ৪৮°৩৫´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ এবং ২°৪৫´ উত্তর থেকে ২৩°০´ উত্তর অক্ষাংশের মধ্যে। পোল্ডারটির মোট এলাকা প্রায় ১৯,৪৩০ হেক্টর। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৯,০০০ হেক্টর বা মোট এলাকার প্রায় ৫০% স্বাভাবিকভাবে পানির নিচে থাকে। গড় গভীরতা ২ মিটার।
বিল ডাকাতিয়া নামকরণ নিয়ে এলাকায় দুইটা লোককথা সবচেয়ে বেশি প্রচলিত। দুইটাই ভয়ের। দুইটাই রক্তের। বাংলাদেশের তিনটি বড় বিলের মধ্যে একটি এটি। বাকি দুটি চলনবিল ও তামাবিল।
আজ থেকে ১৫০-২০০ বছর আগে এই বিল ছিল দক্ষিণ-পশ্চিমের প্রধান জলপথ। খুলনা শহর, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা থেকে যশোর — সব নৌকা এই বিল দিয়ে যেত। বিলটা এত বড় যে কুয়াশার দিনে দিক ঠিক করা যেত না। চারপাশে ছিল গহীন ঝোপ, কাশবন আর সুন্দরীর জঙ্গল।
এই সুযোগটা নিত জলদস্যুরা। স্থানীয়রা তাদের বলত “ডাকাত”। তারা ছোট ছোট ডিঙি নিয়ে ঝোপের ভেতর লুকিয়ে থাকত। বণিকদের নৌকা কাছে আসলেই হুট করে বের হয়ে আসত। ধারালো দা, বল্লম আর বন্দুক নিয়ে লুট করত। চাল, পাট, লবণ, তেল তুলে নিয়ে যেত।
মিজানুর রহমানের দাদার দাদা নাকি একবার এই বিলে ডাকাতের কবলে পড়েছিলেন। নৌকায় ছিল ১০০ মণ ধান। ডাকাতরা সব নিয়ে গেছে। সাথে দাদার ভাইকে গুলি করে বিলের পানিতে ফেলে দিয়েছে। সেই থেকে মিজানুর রহমানের পরিবারের মানুষ বর্ষায় এই বিলের নাম মুখে আনে না।
প্রচলিত মতে, ডাকাতিয়া বিলের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত নদীতে চলাচলকারী মানুষের মালামাল ডাকাতরা ডাকাতি করে নিতো। এ কারণে এই এলাকাকে ডাকাতপাড়া এবং এই বিলকে ডাকাতিয়া বিল নামে ডাকা হয়।
কিন্তু শুধু মানুষ ডাকাতি করতো না। প্রকৃতিও করতো। বর্ষাকালে এই বিল পাগল হয়ে যেত। আষাঢ়-শ্রাবণে ২৪ ঘণ্টায় পানি ৫-৬ ফুট বেড়ে যেত। ভৈরব, শোলমারি, হামকুরা, হরি, সালতা, ভদ্রা নদীর পানি এসে এই বিলে জমত। তারপর সেই পানি গিয়ে ভাসিয়ে দিত ফুলতলা, ডুমুরিয়ার অজস্র গ্রাম।
কৃষকের সারা বছরের ফসল — আমন ধান, পাট, সবজি — এক রাতেই শেষ। ঘর-বাড়ি, গরু-ছাগল সব ভেসে যেত। বৃদ্ধরা বলে, “বিল ডাকাতিয়া আমাদের ফসল ডাকাতি করে নিয়ে যায়।” এই কারণেও নামটা ডাকাতিয়া হয়ে থাকতে পারে।
আরেকটা কারণ ছিল এর বিশালতা। কুয়াশা বা ঝড়ের সময় নৌকার মাঝি দিক হারিয়ে ফেলত। অনেকে আর ফিরত না। বিলের মাঝখানে গেলে মনে হতো চারদিকে শুধু পানি। আকাশ আর পানি ছাড়া কিছু নাই। এই ভয়াবহতাও মানুষকে “ডাকাতিয়া” নাম দিতে বাধ্য করেছে।
আগের দিনে এই বিল শুধু বিল ছিল না। এটা ছিল একটা জীবন্ত নদী। জোয়ার-ভাটা খেলতো এখানে। ফুলতলা, আড়ংঘাটা, ডুমুরিয়ার মানুষ এই বিল পেরিয়ে কয়েকটা খাল দিয়ে বড় নদীতে যেত।
সেই খালগুলোর নাম আজও মানুষের মুখে আছে। ভৈরব নদী, শলুয়া খাল, সোন্ধার খাল, থুকড়া খাল, শিসে খাল— এগুলো দিয়ে বিলের পানি ময়ূর, কৈয়া, হাতিয়া নদীতে পড়ত। বিলের পানিতে তখন মাছরাঙা, পানকৌড়ি, বকের ঝাঁক। জেলেরা বলতো, “বিলের পানি টলটল করতো। নিচের মাছ দেখা যেত।”
কিন্তু ষাটের দশকে সরকার “পোল্ডার” বা বেড়িবাঁধ দেওয়া শুরু করলো। উপকূলকে লবণ থেকে বাঁচানোর জন্য। দৌলতপুর-শোলগাতিয়া সড়ক বাঁধের অংশ হিসেবে শলুয়া, আমভিটা, থুকড়ায় স্লুইস গেট বসানো হলো।
এই গেটের নিয়ম ছিল, জোয়ারের সময় বন্ধ, ভাটার সময় খুলে দেওয়া। প্রয়োজনে গেট খুলে দিলে বিলের পানি নেমে যেত। কিন্তু ধীরে ধীরে নদী ভরাট হতে লাগল। স্লুইস গেটও নষ্ট হলো। জোয়ারের পানি যাওয়া-আসা বন্ধ হয়ে গেল। বিলটা ধীরে ধীরে “বদ্ধ বিল” হয়ে গেল।
আশির দশকে অবস্থা এত খারাপ হয় যে রঘুনাথপুর ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান গাজী আবদুল হাদীর নেতৃত্বে এলাকাবাসী বাধ্য হয়ে সোন্দার খালের বাঁধ কেটে দেয়। উদ্দেশ্য একটাই, বদ্ধ পানি বের করা। ফুলতলার বিভিন্ন স্থান থেকেও যে পানি নদীতে পড়ত, সেই নালাগুলোও আজ বন্ধ। অনেকে বলে, সেদিন থেকেই বিলের “প্রাণ” চলে গেছে। পানি আটকে পচতে শুরু করল। মাছ কমে গেল। আর জলাবদ্ধতা বেড়ে গেল কয়েকগুণ।
বিল ডাকাতিয়া খুলনা জেলার ফুলতলা ও ডুমুরিয়া উপজেলার ৩০টি গ্রাম ঘিরে রেখেছে। এর মধ্যে আছে শাহাপুর, থুকড়া, রূপরামপুর, রংপুর, শলুয়া, আমভিটা, আন্দুলিয়া, রঘুনাথপুর, চেচুড়ী, দেড়োলী, জামিরা, আটলিয়াসহ আরও অনেক গ্রাম।
এই ৩০টি গ্রামের প্রায় ২ লক্ষ মানুষ প্রত্যক্ষভাবে ডাকাতিয়া বিলের জন্য ক্ষতিগ্রস্থ। বর্ষায় তাদের ঘরবাড়ি ডোবে, ফসল নষ্ট হয়, স্কুল বন্ধ থাকে।
বর্ষায় এর রূপ দেখলে বুক কেঁপে ওঠে। এখনো জুন-জুলাই মাসে নৌকা নিয়ে বিলের মাঝখানে গেলে এপার-ওপার কিছু দেখা যায় না। শুধু পানি আর আকাশ। মাঝিরা বলে, “এইটা বিল না, এইটা সমুদ্রের ছোট ভাই।”
শীতে আবার পুরো চেহারা বদলে যায়। পানি নেমে যায় ২-৩ ফুটে। জেগে ওঠে চর। তখন কৃষকরা ধান, গম, সরিষা চাষ করে। কিন্তু মাটি লবণাক্ত। তাই ফলন কম।
উল্লেখ্য, এখানে পানি আটকে বন্যা হয়। বাড়ি ঘর তলিয়ে যায়। শুরু হয় দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা। আর মিল-কারখানার বর্জ্যও এখানে পড়ে। সমস্যার মূল হলো পানি নিষ্কাশন না হওয়া।
আশির দশকে স্থানীয় মানুষের জন্য বিল ডাকাতিয়া অভিশাপ হিসাবে দেখা দেয়। ১৯৮৪ সালে বন্যায় বিল ডাকাতিয়া অঞ্চল প্লাবিত হয়। স্থানীয় অধিবাসীরা সাতক্ষীরা সড়কের শলুয়া এবং আমভিটা বেড়িবাঁধে আশ্রয় নেয়। দুর্যোগে ৭৬ হাজার একর জমির ফসল নষ্ট হয়। ১২ বছর ধরে জলাবদ্ধতা স্থায়ী হয়।
১৯৮৮ সালে কৃষক সংগ্রাম সমিতি এবং বিল ডাকাতিয়া অঞ্চলের সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী বিশ হাজার লোকের সমন্বয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও করে এই এলাকাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানান। তৎকালীন শাসক এরশাদ সরকার ৬৮ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করলেও জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যর্থ হয়। ১৯৯০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর থুকড়া বাজারে মহাসমাবেশের ডাক দিলে সরকার ১৪ ধারা জারি করে এবং ১৬০০ পুলিশ মোতায়েন করে। এই বাধা অতিক্রম করে মহাসমাবেশ সফল করে। কৃষক সংগ্রাম সমিতির নেতৃত্বে ১৮ই সেপ্টেম্বর বিল ডাকাতিয়ায় অবাধ জোয়ার ভাটার কার্যকর কৃষক জনতার আন্দোলন সফল করে। এই দিনটিকে বিল ডাকাতিয়া দিবস হিসেবে পালন করে ডুমুরিয়াবাসী।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ইমার্জেন্সি অ্যাকশন প্ল্যানের আলোকে ১৯২-৯৩ সালে নেয়া হয় খুলনা-যশোর নিষ্কাশন পুনর্বাসন প্রকল্প (কেজেডিআরপি)। এর আগে আরও দুটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। কিন্তু সরকারি প্রায় প্রতিটি প্রকল্পই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। তবে শলুয়া স্লুইচ গেট হতে কৈয়া নদী খনন এবং শলুয়া থেকে বিল ডাকাতিয়ার মাঝখান দিয়ে ফুলতলা উপজেলার জামিরা পর্যন্ত ৮০ ফুট চওড়া খালটি খননের পর থেকেই বিল ডাকাতিয়ার পানি নিষ্কাশন শুরু হয়।
মিজানুর রহমানের ছোটবেলা কেটেছে ডাকাতিয়া বিলের পাড়ে। তার নানাবাড়ি ফুলতলার জামিরা গ্রামে। প্রতিদিন সকালে দেখতাম জেলেরা জাল নিয়ে বিলে যাচ্ছে।
প্রতিবারই বিল ডাকাতিয়া তার নামের সার্থকতা প্রমাণ করেছে। পানি এসে সব ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। ১৯৮৮ তে মিজানূর রহমানের নানার ৫ বিঘা ধান এক রাতে শেষ। নানা ৩ দিন না খেয়ে ছিল। বলতো, “বিল আমাদের পেটে লাথি মারল।”
সেই সময় জেলেদেরও অবস্থা খারাপ ছিল। বিলে মাছ ছিল, কিন্তু ধরার মতো জাল-নৌকা ছিল না। মহাজনরা কম দামে মাছ কিনে নিয়ে যেত।
কিন্তু গত ১০-১৫ বছরে চিত্রটা কিছুটা পাল্টেছে। সরকারি কোনো মৎস্য খামার না থাকলেও বেসরকারি উদ্যোগে এই বিলে এখন “মাছের ঘের” করা হচ্ছে। বিলের বড় অংশ লিজ নিয়ে জেলেরা এবং স্থানীয় উদ্যোক্তারা মাছ চাষ করছে।
তেলাপিয়া, পাঙাশ, কার্প, গলদা চিংড়ি — এখন বিল ডাকাতিয়া থেকে প্রতি বছর কোটি টাকার মাছ যাচ্ছে খুলনা, ঢাকা, এমনকি বিদেশেও। কৃষকরাও শীতকালে বিলের জমি লিজ নিয়ে সবজি চাষ করছে। বেগুন, টমেটো, লাউ। ঢাকার বাজারে যাচ্ছে, বিদেশ রপ্তানি হচ্ছে।
ফুলতলার রহিম জেলে আমাকে বলেছিল, “স্যার, আগে বিল আমাদের খাইত। এখন আমরা বিলকে খাওয়াই।” তার ৩ ছেলেকে এখন সে কলেজে পড়াচ্ছে। বিলের টাকায়।
তাই বলা যায়, বিল ডাকাতিয়া এখন আর শুধু ডাকাতি করে না। সে এখন রুটি-রুজিও দেয়। যদিও বর্ষায় সব ভেসে যায়। সমস্যা হলো, প্রতি বছর বর্ষায় বিল আবার আগের রূপে ফিরে যায়। জলাবদ্ধতা হয়। উজান থেকে পলি এসে বিল ভরে গেছে। নদী-খাল ভরাট। পানি নামার রাস্তা নাই। স্লুইস গেট থাকলেও তা অকার্যকর। ফলে ৩-৪ মাস পানি থাকে। ফসল হয় না। ষাটের দশকে পোল্ডার দেওয়ার পর পানি নিষ্কাশনের সমস্যা আরও বেড়েছে।
গত বছর ২০২৫ এর বর্ষায় ডুমুরিয়ার ৮টা গ্রাম ২ মাস পানির নিচে ছিল। মানুষ নৌকায় করে বাজার করেছে। স্কুল বন্ধ ছিল। সেই পুরনো “ডাকাতিয়া” রূপটা আবার ফিরে এসেছিল। এলাকাবাসী আজও এই বিলকে “দুঃসহ” বলেই ডাকে।
এই অঞ্চলের জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ভ্যাপসা গরম ও মৃদু শীত। সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা সাধারণত ২৯° সেলসিয়াস থেকে ৪০° সেলসিয়াস এবং ৭° সেলসিয়াস থেকে ২৫° সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করে। এই এলাকায় বাৎসরিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১,৭৫০ মিমি। শুকনা মৌসুমে গড় আপেক্ষিক আর্দ্রতার পরিমাণ ৭৫%। স্বাভাবিক অবস্থায় অঞ্চলটি সোলমারি, হামকুরা, হরি, সাল্টা, ভাদ্র ও ভৈরব নদীর পানিতে সিঞ্চিত হয়ে থাকে।
এই বিলকে ঘিরে আমাদের এলাকায় অনেক গান, কিচ্ছা, প্রবাদ আছে।
বৃদ্ধরা বলে, “বিল ডাকাতিয়ার পানি, খাইলে পরে জানি।” মানে এই পানি খেলে পেটের অসুখ হয়।
নৌকার মাঝিরা এখনো বিল পার হওয়ার সময় “বিলের দেবতা”র নামে মানত করে। বলে, “বাবা ডাকাতিয়া, আজকে পার করে দাও।”
আশ্বিন মাসে বিলের পাড়ে “বিলের মেলা” বসে। জেলে, কৃষক, ব্যবসায়ী সবাই আসে। তবে এখানে নৌকা বাইচ হয় না। মেলাটাই এখন ঐতিহ্য।
➤
বর্তমান অবস্থা নিয়ে রঘুনাথপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সনজিৎ বালা বলেন, “বিল ডাকাতিয়ার জলাবদ্ধতা এলাকার জন্য অভিশাপ। সবার সুখ শান্তি ও ভবিষ্যৎ কেড়ে নিয়েছে এই বিল ডাকাতিয়া। যদিও কিছু মাছের ঘের থেকে আয় হয়, কিন্তু বর্ষায় সবকিছুই তলিয়ে যায়। বিল ডাকাতিয়ার চারপাশের মানুষেরা পানির ভেতর বাস করে। এ থেকে আমরা মুক্তি চাই, সরকারি উদ্যোগ চাই।”
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন ফুলতলা-ডুমুরিয়া আসনের সংসদ সদস্য আলী আজগর লবি। বাসসের সাথে এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “বিল ডাকাতিয়া এবং ডুমুরিয়ার আশেপাশের গ্রামগুলিতে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার সমস্যা সমাধানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বিল ডাকাতিয়ার হাজার হাজার মানুষ বারবার জলাবদ্ধতার কারণে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। আমি এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী সমাধানের জন্য কাজ করব। এজন্য প্রয়োজনমতো আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেব।”
তিনি আরও বলেন, “আমার মূল লক্ষ্য এলাকার ডুমুরিয়া-ফুলতলায় দীর্ঘদিন ধরে দুর্দশার প্রতীক হিসেবে পরিচিত বিল ডাকাতিয়াকে পরিকল্পিত হস্তক্ষেপ এবং বিশেষজ্ঞদের নির্দেশনার মাধ্যমে একটি বাসযোগ্য ও উৎপাদনশীল অঞ্চলে রূপান্তর করা যেতে পারে। এই অঞ্চলকে বছরব্যাপী চাষাবাদ, উন্নত পরিবহণ এবং আধুনিক নাগরিক সুবিধার জন্য উপযুক্ত করে তোলা হবে।”
আজও বর্ষার রাতে যখন টিনের চালে বৃষ্টি পড়ে, মিজানুর রহমানের নানির কথা মনে পড়ে। নানি বলতো, “বিল ডাকাতিয়া কাঁদতেছে।”
সেই কান্না আমাদের দুঃসহ স্মৃতি। ডাকাতের ভয়। বন্যার ক্ষুধা। ফসল হারানোর যন্ত্রণা। সুন্দরবন হারানোর বেদনা। জোয়ার-ভাটা হারানোর কষ্ট।
কিন্তু সেই কান্নার মাঝেই এখন হাসি ফুটেছে। জেলের ছেলেটা এখন ইঞ্জিনিয়ার। কৃষকের মেয়েটা এখন নার্স।
বিল ডাকাতিয়া আমাদের শিখিয়েছে, প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে বাঁচতে হয়। সে ডাকাতি করলে, আমরাও তার কাছ থেকে রুটি ছিনিয়ে নেব।
আগামী ১০ বছরে যদি সঠিক পরিকল্পনা হয়, ড্রেজিং হয়, খালগুলো আবার খুলে দেওয়া হয়, স্লুইস গেটগুলো কাজ করে, এমপি মহোদয়ের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়, তাহলে এই “ডাকাতিয়া” নামটা শুধু ইতিহাসের বইয়ে থাকবে। বাস্তবে বিলটা হয়ে উঠবে “সমৃদ্ধির বিল”।
খুলনার ফুলতলা-ডুমুরিয়ার ২ লক্ষ মানুষ সেটাই চায়। কারণ আমরা জানি, জল ছাড়া আমরা বাঁচব না। আর ডাকাতির ভয় নিয়ে বাঁচতে চাই না।



আপনার মতামত লিখুন