অপরাধের বিস্তার ও প্রশাসনিক দোলাচল: ওসির সাধু: চরিত্র, এসআইদের ‘ঘুষ’ বাণিজ্য অধরা রাঘববোয়াল, খুচরা সেবনকারী গ্রেপ্তার
সততা যখন কাঠগড়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রাথমিক ও মূল দায়িত্ব হলো অপরাধ দমন ও জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু কোনো থানার প্রশাসনিক প্রধান যদি ব্যক্তিগতভাবে অনৈতিক কাজ বা ঘুষ গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন, অথচ তার চোখ এড়িয়ে কিংবা তার অধীনে কর্মরত কর্মকর্তারা নিয়মিত ঘুষ-চাঁদাবাজি চালান, তখন সেই সততার কার্যকর মূল্য নিয়ে সমাজে প্রশ্ন ওঠে।
ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা থানায় সম্প্রতি যে চিত্র উদঘাটিত হয়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হুমায়ুন কবির মোল্লা ব্যক্তিক্রমীভাবে ঘুষ গ্রহণ বা বড় কোনো অনাচারের সাথে জড়িত নন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। কিন্তু তাঁর থানারই একাধিক উপ-পরিদর্শক (এসআই) মাদক কারবারিদের থেকে চাঁদা আদায় ও অবৈধ সুবিধা নেয়ার অভিযোগে ক্লোজ হয়েছেন। একজন ওসি ব্যক্তিগতভাবে নিষ্কলঙ্ক হলেও যদি অধীনস্থ কর্মকর্তাদের অনাচার রুখতে ব্যর্থ হন, তবে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলা ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিস্তীর্ণ প্রান্তিক অঞ্চল অপরাধীদের গোপন আস্তানা তৈরিতে সহায়তা করে। সীমান্ত এলাকা থেকে আসা ফেন্সিডিল, ইয়াবা, গাঁজা এবং অন্যান্য ক্ষতিকর মাদকের প্রধান ট্রানজিট রুট হিসেবে শৈলকুপা ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই এলাকায় মাদকের সামাজিক প্রভাব আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তরুণ ও যুবসমাজ ধ্বংসের মুখে পড়ছে, বাড়ছে চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো সহিংস অপরাধ। এই প্রেক্ষাপটে শৈলকুপা থানার ভূমিকা ও প্রশাসনিক তৎপরতা অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শৈলকুপার অপরাধ ব্যবচ্ছেদ — ওসির ‘সাধু’ চরিত্র ও এসআইদের ‘ঘুষ’ বাণিজ্য নিরপেক্ষতার মুখোমুখি, শৈলকুপা থানায় সাধারণ সেবাগ্রহীতারা যখন প্রবেশ করেন, তারা একটি ভিন্ন চিত্র দেখতে পান। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হুমায়ুন কবির মোল্লা নিজে সরাসরি কোনো অর্থ লেনদেন করেন না বা সরাসরি ঘুষ নেন না। স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন সমাজের মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ব্যক্তি হিসেবে ওসির প্রতি সাধারণ মানুষের নেতিবাচক ধারণা নেই। কিন্তু প্রশাসনিক নেতৃত্বের মূল ভিত্তি কেবল ‘নিজে সৎ থাকা’ নয়, বরং পুরো ইউনিটকে দুর্নীতিমুক্ত রাখা। জানা যায় শৈলকুপা থানার কতিপয় কর্মকর্তা মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসোহারা ও সরাসরি চাঁদা আদায় করছেন। সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ ও প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে থানার তিনজন উপ-পরিদর্শককে (এসআই) প্রত্যাহৃত (ক্লোজ) করে ঝিনাইদহ পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়। স্থানীয় মাদক কারবারিদের গোপন আস্তানা ও রুট সম্পর্কে জেনেও আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে নিয়মিত আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করা হচ্ছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিরীহ মানুষকে মাদক দিয়ে ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। গুঞ্জন প্রবল হওয়ার পর জেলা পুলিশের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে ভিত্তিতে ৩ জন এসআই-কে ক্লোজ করা হয়। এসআইদের সংগৃহীত এই বিপুল অর্থ ও ঘুষের টাকার নেটওয়ার্ক কতটা বিস্তৃত? স্থানীয়ভাবে গুঞ্জন উঠেছে, এসআইরা একলা এই অর্থ ভোগ করতেন না; চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির একটি বড় অংশের ভাগ ছড়িয়ে পড়ত থানার অন্যান্য চেইনেও।
ওসি নিজে সরাসরি টাকা গ্রহণ না করলেও এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদী চাঁদাবাজি ও আর্থিক লেনদেন ওসির অগোচরে থাকা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে তীব্র আলোচনা চলছে। থানার ওসি যদি প্রশাসনিক ও মানসিকভাবে শতভাগ শক্ত এবং কঠোর নীতিতে অটল থাকেন, তবে কোনো এসআই-এর পক্ষে সরাসরি দুর্নীতি করার দুঃসাহস পাওয়ার কথা নয়। ওসি ঠিক থাকলে অধীনস্থদের অপকর্ম বন্ধ হতে বাধ্য।
এই মন্তব্য শৈলকুপা থানার প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভেতরের দুর্বলতাকে উন্মোচিত করে। একজন ওসি যদি ব্যক্তিগতভাবে ভালো হন, তবুও কেন তার ইউনিটে এত বড় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলো? দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাজ শুধু ফাইল স্বাক্ষর করা নয়; অধিনস্তরা মাঠে কী ভূমিকা রাখছেন তার সার্বক্ষণিক খোঁজ রাখা। শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিলম্ব: এসআইরা দীর্ঘদিন ধরে অপকর্ম চালিয়ে আসছিল বলে অভিযোগ উঠলেও থানা পর্যায় থেকে ব্যবস্থা না নিয়ে তা জেলা সুপার কার্যালয় পর্যন্ত গড়াতে হলো কেন?
শৈলকুপা থানার সরকারি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অসংখ্যক মাদক মামলা ও আসামীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শত শত পিস ইয়াবা, কেজি কেজি গাঁজা ও ফেনসিডিল উদ্ধার হচ্ছে। কিন্তু এই অভিযানের গভীরে গেলে এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। বাস্তবতা ও পর্যালোচনা দেখা গেছে গ্রেপ্তারকৃত আসামী, সিংহভাগই প্রান্তিক সেবনকারী, খুচরা ফেরিওয়ালা বা পরিবহনকারী।
পুলিশি তৎপরতা পরিসংখ্যানে মামলা ও গ্রেপ্তারের সংখ্যা বাড়িয়ে সাফল্য দেখানো হচ্ছে। কেন রাঘববোয়ালরা ধরাছোঁয়ার বাইরে? স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, শৈলকুপার প্রধান প্রধান মাদকের আস্তানা ও পাইকারি সরবরাহকারীরা ধরা পড়ে না দুটি কারণে। নিয়মিত তথ্য পাচার: থানার অসাধু কর্মকর্তাদের সাথে সখ্য থাকার ফলে অভিযানের খবর আগেই মূল সিন্ডিকেটের কাছে পৌঁছে যায়,অর্থের বিনিময়ে অভয়ারণ্য: খুচরা সেবনকারীদের গ্রেপ্তার করে মামলা বা অভিযানের খতিয়ান ভারী করা হলেও মোটা অঙ্কের মাসোহারা দেওয়া বড় কারবারিদের ছোঁয়া হয় না। শৈলকুপার শিক্ষক, সাংবাদিক, নাগরিক অধিকার কর্মী ও সচেতন সাধারণ জনগণ বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্ষোভে ফুসে উঠেছেন। স্থানীয় একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি জানান, ওসি সৎ শুনে আমরা আশাবাদী হয়েছিলাম। কিন্তু তাঁর থানার এসআইরা যদি মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা নেয়, আর আসল মাদক সম্রাটরা যদি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়, তবে এই সততার ফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না। মাদকের কারণে আমাদের তরুণ প্রজন্ম ধ্বংসের মুখে। জনমনে প্রধান ৩টি প্রশ্ন:
সততার সুফল কোথায়? প্রধান কর্মকর্তা নিজে সৎ হলে যদি অধীনস্থদের দুর্নীতি বন্ধ না হয়, তবে জনগণের নিরাপত্তা কোথায়? এসআইদের দুর্নীতির দায় কার? ৩ জন এসআই ক্লোজ হওয়ার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে চাঁদা নেওয়ার ঘটনা সত্য। তাহলে এত দিন ধরে চলা এই চাঁদাবাজির আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতির দায়িত্ব কে নেবে? মাদকের রুট কবে বন্ধ হবে? চুনোপুঁটি ধরে পরিসংখ্যান না দেখিয়ে মূল হোতাদের গ্রেপ্তারে কেন বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না? শৈলকুপা থানা থেকে ৩ জন এসআই-কে ক্লোজ করা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, এটি কেবল ব্যাধির উপসর্গ লাঘবের চেষ্টা। অপরাধের মূল উৎপাটন করতে হলে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা কাঠামোর আধুনিকায়ন ও অভ্যন্তরীণ কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। খুচরা সেবনকারী নয়, ঝিনাইদহ ও শৈলকুপার শীর্ষ মাদক সিন্ডিকেট ধ্বংসে র্যাব, এনএসআই এবং বিশেষ পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা ও নিরব

আপনার মতামত লিখুন