সিলেটে বহুল আলোচিত এমসি কলেজে ধর্ষণকাণ্ডে আদালতের রায়ে ১জনের মৃত্যুদন্ড,৩ জনের যাবজ্জীব বাকী ৪জন বেগসুর খালাস
সিলেট এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে রাতের আঁধারে নববধূ কে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলার রায়ে ১ জনের মৃত্যুদন্ড ও ৩ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
রায়ে ৮ আসামির বাকি ৪ জনকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়েছে। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি হলেন সাইফুর রহমান।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রাপ্ত আসামীরা হলেন, শাহ মাহবুবুর রহমান রনি,তারেকুল ইসলাম ওরফে তারেক ও অর্জুন লস্কর।এছাড়া যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত আসামী সহ৩জনের জরিমানার সাড়ে ৪ লাখ টাকা ভিকটিমের পরিবারের সদস্যদের দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
রায়ে বেকসুর খালাসপ্রাপ্তরা হলো আইনউদ্দিন ওরফে আইনুল,মিসবাউল ইসলাম ওরফে রাজন, রবিউল ইসলাম ওরফে রাজন ও মাহফুজুর রহমান ওরফে মাসুম।
আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বেলা ২ টায়
সিলেটের দ্রুত বিচার আদালতের বিচারক স্বপন কুমার সরকার এই রায় ঘোষণা করেন।
রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন
দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের
পিপি অ্যাডভোকেট আবুল হোসেন এবং বাদি পক্ষের আইনজীবী আ্যডভোকেট তাজ উদ্দিন।
তিনি বলেন, দন্ডপ্রাপ্ত চারজনের বিষয়ে আসামি পক্ষ হাইকোর্টে আপিল করবেন।
এসময় আদালত পাড়ায় কড়া নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। শত শত উৎসুক জনতা রায় শোনার জন্য আাদলতে পাড়ায় উপস্থিত ছিলেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজ শহর টিলাগড় পয়েন্ট যেন ছিল
এক অজানা আতংকের নাম। বড় ভাই ছোট ভাই তারা পরিচালিত হতো পুরো এলাকা। এখানে সরকার দল করলেও হামলাও নির্যাতন থেকে রেহাই পাওয়া যেত না করতে হত বিশেষ একটি গ্রুপের রাজনীতি । আর ওই সব গ্রুপে যার নেতৃত্ব দিতেন তাদের আস্থাভাজন ও স্নেহধন্যদের কুকান্ডে এক কালো অধ্যায়ের রচনা হয়েছিল রাতের আঁধারে এম সি কলেজ ছাত্রাবাসে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে।
যে ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত স্পর্শকাতর । স্বামীকে বেঁধে রেখে এমসি কলেজের ভেতরে ছাত্রাবাসে নববধূকে চালানো হয়েছিল সংঘবদ্ধ ধর্ষণ।
এ মামলার আসামিদের তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে গ্রেফতার করা হলেও পরবর্তীতে এ মামলাকে ভিন্ন কাজে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। আদালতে বারবার পেছানো হয সাক্ষ্য গ্রহণ, মামলার শুনানি, রায়ের তারিখ কৌশলী ভাবে।
আজ দীর্ঘ ছয় বছর পর আলোচিত এমসি কলেজ ধর্ষণ মামলার রায় ঘোষণা হল অবশেষে।
২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মুরারী চাঁদ (এমসি) কলেজের শতবর্ষের ইতিহাসে কলংকজনক এক ঘটনা ঘটেছিলো সেই রাতে।
ঘটনার ছয় বছর পর মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সিলেটের বহুল আলোচিত মুরারী চাঁদ (এমসি) কলেজে নববধূ কে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলার রায় ঘোষণা করা হয়।
এরআগে বুধবার আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা যুক্তিতর্ক উপস্থাপন কাজ সম্পন্ন করেন।
# সেদিন কী ঘটেছল
২০২০ সালের ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় স্বামীর সাথে প্রাইভেট কারে করে শাহপরান মাজারে বেড়াতে গিয়েছিলেন ওই নববধূ (২০)। ফেরার পথে আওয়ামী আমলের ত্রাসের রাজত্ব , অশ্রের ঝঞ্ঝরানি আর প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মিছিল এখানে ছিল নিত্যদিনের ঘটনা সেই টিলাগড় এলাকায় এমসি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে গাড়ি থামিয়ে পার্শ্ববর্তী দোকানে প্রবেশ করেন স্বামী।
এই সময়ে ৫/৬ জন তরুণ এসে তাদের জিম্মি করে প্রাইভেটকারসহ বালুচর এলাকায় এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে নিয়ে যায়।এরপর স্বামীকে মারধরের পর
এক ধরনের টর্চার ছেলে আটকে রেখে ছাত্রাবাসের ভেতরে উল্লাস করে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয় নব বধূকে।
পরে স্বামীর টাকা পয়সা ও প্রাইাভেটকার রেখে দিয়ে তাদের ছেড়ে দেয় ধর্ষকরা।ছাত্রাবাস থেকে বেরিয়ে এসে তরুণীর স্বামী ঘটনাটি পুলিশকে জানান।
সম্ভ্রম হারানো অসহায় এ নারীর বুক ফাঁটা আর্তনাদ মুর্হুতে ছড়িয়ে পড়ায় গোটা দেশ পেরিয়ে প্রবাসেও আওয়াজ উঠেছিল সে দিন
নাড়া দিয়েছিল গণমানুষের বিবেকে।
তবে অভিযুক্তরা ছাত্রলীগের কর্মী হওয়ায় প্রথমে ছাত্রাবাসে প্রবেশে গড়িমসি করে পুলিশ। এই সুযোগে ছাত্রাবাস থেকে পালিয়ে যায় ধর্ষকরা।।
এক পর্যায়ে শাহপরান থানা পুলিশের কর্তা ওসি বিষয়টি আপস মীমাংসা করার চেষ্টা করেন আসামিপক্ষ সরকারদলীয় ও তার পরিচিতজন হওয়ার কারণে বলেও অভিযোগ ছিলো।

কিন্তু পুলিশের ঊর্ধন কর্তৃপক্ষ রাজনৈতিক একাধিক নেতার চাপে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন কক্ষ থেকে অস্ত্র উদ্ধার করলেও পাওয়া যায়নি আসামি। পরবর্তীতে জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে আসামিদের সনাক্ত গ্রেফতার করা হয়।
এ ঘটনায় ধর্ষিতার স্বামী বাদী হয়ে মহানগর পুলিশের শাহপরান থানায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করে এবং দুজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা করেন।ঘটনার পর আসামিরা পালিয়ে গেলেও তিন দিনের মধ্যে ছয় আসামি ও সন্দেহভাজন দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনী।
গ্রেপ্তারের পর তাদের পাঁচ দিন করে রিমান্ডে নেয় পুলিশ। পরবর্তী সময়ে সবাই আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে ঘটনার দায় স্বীকার করেন।
#অভিযুক্ত ছিলেন যারা
২০২০ সালের ৩ ডিসেম্বর আলোচিত
এধর্ষণ মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা ও মহানগর পুলিশের শাহপরান থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য।
অভিযোগপত্রে সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান ওরফে রনি, তারেকুল ইসলাম ওরফে তারেক, অর্জুন লস্কর, আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল ও মিসবাউল ইসলাম ওরফে রাজনকে দল বেঁধে ধর্ষণের জন্য অভিযুক্ত করা হয়। আসামি রবিউল ইসলাম ও মাহফুজুর রহমান ওরফে মাসুমকে ধর্ষণে সহায়তা করার জন্য অভিযুক্ত করা হয়। তারা সবাই ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে পরিচিতি।
অভিযুক্ত ৮ জনকেই কলেজ কর্তৃপক্ষ স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে। এরপর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও এই ৪ জনের ছাত্রত্ব ও সার্টিফিকেট বাতিল করে।
আর ছাত্রাবাস থেকে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় সাইফুর রহমান ও শাহ মাহবুবুর রহমান রনিকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ।
# যেভাবে সম্পন্ন হলো বিচার
প্রক্রিয়া
২০২০ সালের ২২ নভেম্বর অস্ত্র ও চাঁদাবাজি মামলার অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ। এরপর ধর্ষণ মামলায় ওই বছরের ৩ ডিসেম্বর ৮ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র প্রদান করা হয়। এরপর ২০২১ সালের ১৭ জানুয়ারি সিলেটের নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মোহিতুল হক চৌধুরী মামলার অভিযোগ গঠন করে বিচার কাজ শুরু করেন। আর ২০২২ সালের ১১ মে একই আদালতে অস্ত্র ও চাঁদাবাজির মামলার অভিযোগ গঠন করে আদালত।
ধর্ষণ মামলার অভিযোগ গঠনের পর ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করেছিলেন আদালত। তবে ওই বছরের ২৪ জানুয়ারি আদালতে দুটি মামলার বিচার কার্যক্রম একসঙ্গে শুরুর আবেদন করেন বাদীপক্ষ।
শুনানি শেষে বিচারক আবেদনটি খারিজ করে দেন। এরপর বাদীপক্ষ এই আবেদন জানিয়ে উচ্চ আদালতে একটি ফৌজদারি বিবিধ মামলা করেন।
ওই বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের ভার্চুয়াল বেঞ্চ মামলা দু’টির বিচার কার্যক্রম এক সাথে একই আদালতে সম্পন্নের আদেশ দেন। এরপর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বদলে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা দুটির কার্যক্রম চালানোর আবেদন করেন বাদীপক্ষ।
বাদীর আইনজীবী সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগ গঠনের দীর্ঘদিন পরও সাক্ষ্যগ্রহণের শুরু না হওয়ায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা দুটির কার্যক্রম চালানোর জন্য ২০২২ সালের ১ আগস্ট বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে বাদি একটি রিট করেন।
ওইবছরের ১৬ আগস্ট রিটের শুনানি শেষে দুই মামলার কার্যক্রম দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বদলির প্রক্রিয়া গ্রহণে কেন নির্দেশনা দেয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট।
এর আগে ২০২২ সালের ২৭ জুলাই আসামি রবিউল ইসলামের জামিন শুনানিতে মামলার বিচার বিলম্বিত হওয়ায় উষ্মা প্রকাশ করেন বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান ও বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ার কাজলের হাইকোর্ট বেঞ্চ।
আদালত সূত্রে জানা জানায়, মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ কেন শুরু করা হয় না মর্মে রাষ্ট্রপক্ষকে ২০২২ সালের ২১ আগস্ট কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন সিলেটের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহিতুল হক।
আদালত সূত্রে জানা গেছে,২৪ সালের ৫ আগস্ট রাষ্ট্রীয় পটপরিবর্তনের পর মামলাটি গত বছরের মে মাসে দ্রুত নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনাল থেকে দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর হয়ে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়।
মামলায় ২৪ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের মধ্যে ওই গৃহবধূ, তার স্বামী, আসামিদের স্বীকারোক্তি নেওয়া ম্যাজিস্ট্রেট, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, এমসি কলেজের অধ্যাপক, ওসমানী হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক রয়েছেন।
সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার ২ মেট্রোপলিটন কারাগারে সিনিয়র জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিক জানান, আদালতের রায়ের ধর্ষণ মামলা থেকে যারা বেকসুর খালাস পেয়েছে তারা সন্ধ্যায় সিলেট কারাগার থেকে বের হয়ে বাড়ি ফিরেছে।



আপনার মতামত লিখুন