খুঁজুন
রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২ আশ্বিন, ১৪৩৩

খান এ সবুর ও ১৯৪৭: “খুলনা বাঁচানোর বছর

অধ্যক্ষ খান আখতার হোসেন
প্রকাশিত: শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬, ৫:৩৯ অপরাহ্ণ
খান এ সবুর ও ১৯৪৭: “খুলনা বাঁচানোর বছর

১৯৪৭ সাল খান এ সবুরের জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। এই একটা বছরেই তিনি উকিল থেকে রাষ্ট্রনায়ক হয়ে গেলেন। আর এই একটা বছরেই খুলনা ভারত থেকে পাকিস্তানে চলে আসলো। বয়স তখন ৩৮। পদে তিনি বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য এবং পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের প্রচার সম্পাদক। ঢাকার বড় নেতারা তখন কলকাতা আর দিল্লি নিয়ে ব্যস্ত। অথচ ইতিহাসের চাকা ঘুরলো একদম প্রান্তের একটা জেলা থেকে। সেই জেলার নাম খুলনা। আজ থেকে ৭৯ বছর আগের সেই বছরটা না থাকলে দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের মানচিত্রটা অন্যরকম হতো। খুলনা বন্দর থাকতো না, মংলা থাকতো না, সুন্দরবনের ৮০ ভাগ থাকতো না। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতীয় সীমান্ত থেকে এই অঞ্চলটা এত কাছে থাকতো না। সবকিছু বদলে যেত। আর সেই সবকিছু বদলানোর কাজটা একা খান এ সবুরের ছিল না। এটা ছিল স্থানীয় নেতা, উকিল, আর দিল্লির লবিস্টদের সম্মিলিত যুদ্ধ। কিন্তু সেই যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে যে নামটা সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে, তিনি খান এ সবুর।

২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৭। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট এটলি হাউজ অফ কমন্সে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিলেন আগস্টের মধ্যেই ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে যাবে। তারপর ৩ জুন এলো মাউন্টব্যাটেন প্ল্যান। সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। ভারত ভাগ হবে। পাকিস্তান হবে। আর বাংলা ভাগ হবে। ভাগ করার দায়িত্ব পেল “র‍্যাডক্লিফ কমিশন”। কমিশনের চেয়ারম্যান স্যার সিরিল র‍্যাডক্লিফ। জীবনে কখনো ভারতে পা রাখেননি এমন একজন ব্যারিস্টার। তাকে বলা হলো ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সীমান্ত টেনে দাও। শুনতে সহজ। কিন্তু বাস্তবতা কঠিন। কারণ বাংলা আর পাঞ্জাবে ধর্ম আর ভূগোল, অর্থনীতি আর ইতিহাস সব একসাথে জড়িয়ে আছে।

এই আবহের মধ্যেই খুলনার সমস্যাটা সামনে আসলো। ১৯৪১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী খুলনা জেলায় মুসলমান ছিল ৫১.৪ শতাংশ, হিন্দু ছিল ৪৭.৮ শতাংশ। ব্যবধান মাত্র ৩.৬ শতাংশ। এত কম ব্যবধান নিয়ে কোনো জেলাকে একপক্ষে দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। তার উপর খুলনা শহরটা ছিল হিন্দু জমিদার আর ব্যবসায়ীদের দখলে। কলকাতার কংগ্রেস নেতারা বলতে শুরু করলেন খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া ছাড়া পশ্চিমবঙ্গ বাঁচবে না। কারণ কলকাতা বন্দরের বিকল্প হিসেবে খুলনা বন্দর দরকার। আবার পাটের ব্যবসা, সুন্দরবনের কাঠ, নদীপথ সবকিছু খুলনার সাথে জড়িত। মুসলিম লীগের হাইকমান্ড তখন ঢাকা আর কলকাতা নিয়েই বেশি ভাবছে। খুলনার কথা বলার মতো শক্ত কোনো স্থানীয় নেতা তখন সামনে ছিলেন না। এই শূন্যস্থানটাতেই দাঁড়িয়ে গেলেন খান এ সবুর। তিনি ছিলেন খুলনার ছেলে। উকিল। বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য। মানুষ তাকে চিনতো। আর তার মধ্যে একটা জেদ ছিল। তিনি বুঝেছিলেন র‍্যাডক্লিফের কলমের একটা খোঁচায় ৩০ লাখ মানুষের ভাগ্য বদলে যাবে।

কিন্তু এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যোগ করতে হবে। সবুর একা ছিলেন না। তার পাশে ছিলেন খুলনা জেলা মুসলিম লীগের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ আব্দুল হালিম। হালিম সাহেব ছিলেন স্থানীয় সংগঠক। তিনি খুলনার ৯টি থানায় মুসলিম লীগের নেটওয়ার্ক ধরে রেখেছিলেন। আবার দিল্লিতে ছিলেন হামিদুল হক চৌধুরী। তিনি মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে র‍্যাডক্লিফ কমিশনে লবিং করছিলেন। এ কে ফজলুল হক তখন কলকাতায়। তিনি খুলনার জন্য আলাদা করে কোনো বড় ভূমিকা রাখেননি। তাই ১৯৪৭ এর খুলনা আন্দোলন মূলত ৩ জনের সমন্বয়: মাঠে হালিম, নথিতে সবুর, কেন্দ্রে হামিদুল হক।

মার্চ মাস থেকে মে মাস পর্যন্ত সময়টা ছিল মাঠের যুদ্ধ। খান এ সবুর প্রথমে নামলেন জনমত গঠনে। ১৫ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি খুলনা জেলার ৯টি থানায় পরপর ১৮টি জনসভা করলেন। সকাল থেকে রাত। নদী পেরিয়ে, কাদা ভেঙে, পালকিতে করে তিনি পৌঁছে গেছেন গ্রামের হাটে। প্রতিটি সভায় তার দুইটা মূল বক্তব্য ছিল। প্রথমটা ছিল, আমরা পূর্ব পাকিস্তানের সাথে থাকব। এটা ঈমানের দাবি। দ্বিতীয়টা ছিল আরো গুরুত্বপূর্ণ। তিনি হিন্দু ভাইদের দিকে তাকিয়ে বলতেন, আপনারা থাকুন। আপনাদের জান-মালের জিম্মাদার আমরা। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে খুলনা পাকিস্তানের সাথে থাকুক। এই নরম লাইনটা কাজে দিয়েছিল। কলকাতা থেকে আসা কংগ্রেস নেতারা তখন হিন্দুদের বলছিলেন মুসলমানরা আপনাদের তাড়াবে। সবুর তার উল্টোটা বলে মধ্যবিত্ত হিন্দুদের একটা বড় অংশকে নিরপেক্ষ করে দিলেন। তারা ভাবলো, এই লোকটা অন্তত আমাদের নিরাপত্তার কথা বলছে। একই সময়ে সৈয়দ আব্দুল হালিম সাহেব গ্রামে গ্রামে মুসলিম লীগের কর্মীদের দিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে বোঝাচ্ছিলেন।

এরপর শুরু হলো স্বাক্ষর অভিযান। ১০ এপ্রিল থেকে ২০ এপ্রিল। মাত্র ১০ দিন। খান এ সবুর এবং তার কর্মীরা খুলনা শহর থেকে শুরু করে রূপসা, বাগেরহাট, দাকোপ, কয়রা পর্যন্ত ঘুরে ২ লক্ষ ৪ হাজার ৩১৭ জনের স্বাক্ষর সংগ্রহ করলেন। খাতার প্রথম লাইনে লেখা ছিল, আমরা খুলনার মুসলমান। আমরা পাকিস্তানের সাথে থাকতে চাই। এই খাতাটা শুধু কাগজ ছিল না। এটা ছিল জনগণের রায়। তিনি এই খাতা নিয়ে নিজে দিল্লি গেলেন। র‍্যাডক্লিফের হাতে তুলে দিয়ে বললেন, স্যার, আপনি মানচিত্র দেখে রায় দেবেন। আমি জনগণের ইচ্ছা দেখে রায় চাই।

একই সময়ে তিনি খুলনার ১২ জন প্রভাবশালী হিন্দু উকিল এবং ব্যবসায়ীর সাথে আলাদা আলাদা বৈঠক করলেন। তাদের বাসায় গিয়ে, চেম্বারে বসে বোঝালেন। বললেন, আপনারা যদি ভারতের সাথে যান, ২০ বছর পর সেখানে আপনারা সংখ্যালঘু হয়ে যাবেন। আর যদি পাকিস্তানে থাকেন, আমরা আপনাদের রক্ষা করব। আপনাদের মন্দির, ব্যবসা, স্কুল সব থাকবে। এই যুক্তিটা অনেক হিন্দু নেতার মাথায় ঢুকেছিল। ফলে কংগ্রেস খুলনা থেকে যত বড় আন্দোলন আশা করেছিল, তত বড় আন্দোলন তারা দাঁড় করাতে পারেনি।

জুন মাস চলে আসলো। ৩০ জুন র‍্যাডক্লিফ কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে গঠন হলো। সদস্য ছিলেন দুইজন কংগ্রেসের উকিল, দুইজন মুসলিম লীগের উকিল। নথি জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ১৫ জুলাই। খান এ সবুর তার জীবনের সবচেয়ে বড় নথিটা তৈরি করলেন। নাম দিলেন “The Case of Khulna District”। ২০০ পৃষ্ঠার নথি। হাতে লেখা, টাইপ করা, মানচিত্র সহ। নথির প্রথম যুক্তি ছিল জনসংখ্যা। তিনি দেখালেন খুলনার ৯টি থানার মধ্যে ৭টিতেই মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ। শুধু বনগাঁ আর গাইঘাটায় হিন্দু বেশি। তাই পুরো জেলাটাকে একসাথে পাকিস্তানে রাখা যৌক্তিক। দ্বিতীয় যুক্তি ছিল অর্থনীতি। তিনি তথ্য দিয়ে দেখালেন খুলনা বন্দর দিয়ে যে পাট রপ্তানি হয় তার ৯০ শতাংশ আসে যশোর, ফরিদপুর, বরিশালের মুসলমান কৃষকের জমি থেকে। কলকাতার সাথে খুলনার অর্থনৈতিক সম্পর্কের চেয়ে ঢাকা আর পূর্ববঙ্গের সাথে সম্পর্ক অনেক গভীর। তাই বন্দরটা পূর্ববঙ্গেরই থাকা উচিত। তৃতীয় যুক্তি ছিল ভূগোল। ভৈরব নদী আর সুন্দরবন প্রাকৃতিক সীমান্ত। এর পশ্চিমে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা, পূর্বে মুসলমান অধ্যুষিত এলাকা। এই নদী আর জঙ্গলকে সীমান্ত মানলে দাঙ্গা কম হবে। চতুর্থ যুক্তি ছিল প্রশাসনিক। ১৮৪২ সাল থেকে খুলনা ঢাকা বিভাগের অংশ। কলকাতার সাথে এর প্রশাসনিক যোগাযোগ কখনোই ছিল না। ফাইল, কোর্ট, পুলিশ সব ঢাকা থেকে চলতো।

এই নথি জমা দেওয়ার জন্য তিনি তিনবার দিল্লি গেলেন। ৫ জুলাই র‍্যাডক্লিফের সাথে ৪০ মিনিটের বৈঠক করলেন। ইংরেজিতে যুক্তি দিলেন। মানচিত্র খুলে বোঝালেন। ১০ জুলাই লর্ড মাউন্টব্যাটেনের প্রাইভেট সেক্রেটারি জর্জ অ্যাবেলের সাথে দেখা করলেন। সেখানে তিনি একটা লাইন বলেছিলেন যেটা ব্রিটিশদের নাড়া দিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, স্যার, খুলনা যদি ভারতকে দেন, তাহলে পূর্ব পাকিস্তানে ১০ লাখ হিন্দুকে তাড়াতে হবে। দাঙ্গা হবে। ব্রিটিশ সরকারের বদনাম হবে। ব্রিটিশরা “দাঙ্গা” শব্দটা খুব ভয় পেত। কারণ তারা শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চাচ্ছিল। ১২ জুলাই তিনি পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের সাথে দেখা করলেন। লিয়াকত তাকে মামলা লড়ার জন্য ১০ হাজার টাকা দিলেন। একই সময়ে কংগ্রেসের পক্ষে শরৎ বসু এবং কিরণ শংকর রায়ও লবিং করছিলেন। তাদের নথিতে অর্থনীতির যুক্তি ছিল। কিন্তু তাদের কাছে ২ লক্ষ মানুষের স্বাক্ষর ছিল না। জনগণের ইচ্ছার সরাসরি প্রমাণ ছিল না।

এবার আসি সবচেয়ে বিতর্কিত ৩ দিনে। ১৪ আগস্ট থেকে ১৭ আগস্ট।

১৪ আগস্ট রাত ১২টা ১ মিনিট। ভারত-পাকিস্তান স্বাধীন হলো। কিন্তু র‍্যাডক্লিফ রায় তখনও প্রকাশ হয়নি। ব্রিটিশ সরকার নির্দেশ দিয়েছিল রায় প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত “স্ট্যাটাস কো” বজায় রাখতে। খুলনা তখন প্রশাসনিকভাবে ব্রিটিশের অধীনেই ছিল।

১৫ আগস্ট সকাল। খুলনা শহরে একটা ঘটনা ঘটলো। খুলনার কিছু হিন্দু নেতা এবং কংগ্রেস কর্মী উত্তেজিত হয়ে খুলনা কোর্ট প্রাঙ্গণে ভারতের পতাকা উত্তোলন করলেন। তারা মাইকে ঘোষণা দিলেন “খুলনা ভারতের”। এই খবর কলকাতায় চলে গেল। অনেক পত্রিকায় পরের দিন লেখা হলো “খুলনা ভারতে যোগ দিল”। কিন্তু এটা ছিল আবেগের বহিঃপ্রকাশ। কোনো সরকারি ঘোষণা না। বিকেলের মধ্যেই জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশ দিয়ে পতাকা নামিয়ে দেন। কারণ রায় না হওয়া পর্যন্ত এটা আইনবিরুদ্ধ।

এই ১৫ আগস্টের ঘটনার কারণেই পরবর্তীতে অনেকে বলে “খুলনা প্রথমে ভারতের ছিল”। এটা আংশিক সত্য। পতাকা উঠেছিল, কিন্তু ২-৩ ঘণ্টার জন্য। প্রশাসনিকভাবে খুলনা কারো অংশ হয়নি।

১৭ আগস্ট রাত ১টা। রেডিওতে র‍্যাডক্লিফ রায় ঘোষণা হলো। সারাত মানুষ রেডিওর সামনে বসে ছিল। রায়ে বলা হলো খুলনা জেলার খুলনা সদর, বাগেরহাট, তেরখাদা, রূপসা, ডুমুরিয়া, দাকোপ, কয়রা, পাইকগাছা, ফুলতলা এই ৯টি থানার মধ্যে ৫টি পাকিস্তান পাবে। আর বনগাঁ, গাইঘাটা এবং সীমান্তের কিছু এলাকা ভারত পাবে। মানে খুলনা শহর, খুলনা বন্দর এবং সুন্দরবনের ৮০ ভাগ পাকিস্তানের অংশ হলো। রাত ৩টায় খুলনা শহরে মিছিল বের হলো। স্লোগান উঠলো খান এ সবুর জিন্দাবাদ, পাকিস্তান জিন্দাবাদ। পরের দিন দৈনিক আজাদ পত্রিকার প্রথম পাতায় বড় হরফে হেডলাইন, সবুরের যুক্তিতে খুলনা রক্ষা।

১৮ আগস্ট সকাল থেকে পাকিস্তানি প্রশাসন দায়িত্ব নিল। ব্রিটিশ অফিসাররা চলে গেলেন।

১৯৪৭ সালে খান এ সবুরের এই সাফল্যের পেছনে তিনটা কারণ কাজ করেছিল। প্রথমত তার সময়জ্ঞান। ঢাকার বড় নেতারা যখন বিষয়টাকে গুরুত্ব দিচ্ছিল না, তখন তিনি মার্চ মাসেই মাঠে নেমে গিয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত তার ভাষার দক্ষতা। গ্রামে তিনি বাংলায় কথা বলেছেন। দিল্লিতে ইংরেজিতে যুক্তি দিয়েছেন। দুই জায়গাতেই মানুষকে বোঝাতে পেরেছেন। তৃতীয়ত তথ্য আর আবেগের মিশ্রণ। তিনি শুধু স্লোগান দেননি। ২০০ পৃষ্ঠার নথি দিয়েছেন। ২ লক্ষ স্বাক্ষর দিয়েছেন। ব্রিটিশরা আইন আর কাগজ ছাড়া কিছু বোঝে না। তিনি সেটাই তাদের দিয়েছেন। এর সাথে যোগ হয়েছিল সৈয়দ আব্দুল হালিমের স্থানীয় সংগঠন এবং হামিদুল হক চৌধুরীর কেন্দ্রীয় লবিং।

এখন প্রশ্ন আসে, সবুর না থাকলে কী হতো? ইতিহাসবিদরা বলেন রায় অন্যরকম হতে পারত। যদি খুলনা ভারতের অংশ হতো, তাহলে প্রথমত ভৌগোলিকভাবে পশ্চিমবঙ্গ সরাসরি সমুদ্র পেয়ে যেত। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা ২০০ নটিক্যাল মাইল কমে যেত। মংলা বন্দর হতো না। দ্বিতীয়ত অর্থনৈতিকভাবে দক্ষিণ-পশ্চিমের ১০ জেলার পাট, চিংড়ি, কৃষিপণ্য সব কলকাতার দিকে চলে যেত। ঢাকার সাথে এই অঞ্চলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। তৃতীয়ত জনসংখ্যার দিক থেকে খুলনার ৩০ লাখ মুসলমান ভারতে সংখ্যালঘু হয়ে যেত। ১৯৫০ সালের দাঙ্গার সময় তাদের অবস্থা খুব খারাপ হতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুন একবার বলেছিলেন, ১৯৪৭ সালে খুলনা বেঁচে যাওয়া মানে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের জন্য একটা নিরাপদ করিডোর বেঁচে যাওয়া। ভারতের সীমান্ত ঘেঁষা এই অঞ্চলটা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বড় ভরসা ছিল।

১৯৪৭ এর খান এ সবুর আমাদের তিনটা শিক্ষা দিয়ে গেছেন। প্রথম শিক্ষা হলো স্থানীয় নেতৃত্ব জাতীয় সিদ্ধান্ত বদলাতে পারে। ঢাকার সাহায্য ছাড়াই একজন মানুষ তার জেলাকে বাঁচাতে পারে। দ্বিতীয় শিক্ষা হলো যুদ্ধ শুধু বন্দুক দিয়ে হয় না। ফাইল, নথি, স্বাক্ষর দিয়েও সীমান্ত বদলে যায়। তৃতীয় শিক্ষা হলো ইতিহাস কখনো কখনো একজন মানুষের কাঁধে ভর করে। ১৯৪৭ এর পর থেকে খুলনার সাধারণ মানুষ তাকে খুলনার জনক বলা শুরু করে।

১৯৪৭ কে বুঝতে হলে খান এ সবুরকে বুঝতে হবে। আর খান এ সবুরকে বুঝতে হলে ১৯৪৭ কে বুঝতে হবে। এই দুইটা আলাদা করা যায় না।

আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যখন আমরা খুলনা শহর দেখি, মংলা বন্দর দেখি, সুন্দরবন দেখি, তখন মনে রাখতে হবে এই সবকিছুর গোড়ায় ১৯৪৭ এর সেই ২০০ পৃষ্ঠার নথি আর ২ লক্ষ স্বাক্ষর আছে। আর সেই নথি আর স্বাক্ষরের পেছনে আছে একজন ৩৮ বছরের উকিলের এক বছরের অমানুষিক পরিশ্রম। তার সাথে ছিলেন সৈয়দ আব্দুল হালিমের মতো স্থানীয় সংগঠক, হামিদুল হক চৌধুরীর মতো কেন্দ্রীয় নেতা। তারা রাতের পর রাত জেগে মানচিত্র দেখেছেন। গ্রামে গ্রামে ঘুরে মানুষের হাতের ছাপ নিয়েছেন। দিল্লির সাহেবদের বুঝিয়েছেন।

১৫ আগস্টের সেই ২ ঘণ্টার ভারতের পতাকা একটা ভুল বোঝাবুঝির জন্ম দিয়েছে। কিন্তু ১৭ আগস্টের রায় প্রমাণ করেছে জনগণের ইচ্ছা আর যুক্তির জোর। ইতিহাস অনেক সময় বড় যুদ্ধ, বড় নেতা আর বড় চুক্তির কথা বলে। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় ছোট হরফে লেখা থাকে খান এ সবুরের মতো মানুষদের নাম। যারা একটা জেলাকে বাঁচিয়ে দিয়ে একটা দেশের ভবিষ্যৎ বাঁচিয়ে দেয়। ১৯৪৭ সালটা খান এ সবুরের জন্য যেমন টার্নিং পয়েন্ট, খুলনার জন্যও তেমন টার্নিং পয়েন্ট। আর বাংলাদেশের জন্যও তেমন টার্নিং পয়েন্ট। কারণ আজকের বাংলাদেশের মানচিত্রে দক্ষিণ-পশ্চিমের যে বিশাল অংশটা আমরা দেখি, তার ভিত্তি স্থাপন হয়েছিল ১৯৪৭ এর সেই গরমের দিনগুলোতে। কয়েকজন মানুষের কলমের কালি দিয়ে।

আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে পেরুকে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:১৩ অপরাহ্ণ
আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে পেরুকে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র

ঢাকার ডাক স্পোর্টস: যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দলে অভিষেক হয়েছে কাভান সুলিভানের অভিষেক ম্যাচে পেরুর বিপক্ষে শুরুর একাদশে জায়গা করেই চমক দেখিয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের এই মিডফিল্ডার। শনিবার ওরল্যান্ডোর ইন্টারকো স্টেডিয়ামে আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে পেরুকে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

অভিষেকের দিন সুলিভানের বয়স ছিল ১৬ বছর ৩৬৩ দিন। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক হওয়া চতুর্থ সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় এখন তিনি।পেরুর বিপক্ষে ম্যাচে ৬২ মিনিট খেলেছেন সুলিভান। বিশ্বকাপের বিরতির পর থেকেই ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের হয়ে নজর কেড়েছেন তিনি। চলতি মৌসুমে এমএলএসে ২৪ ম্যাচে ৭ গোলের পাশাপাশি করেছেন ১২টি সহায়তা

সুলিভানের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে ফিলাডেলফিয়াও ঘুরে দাঁড়িয়েছে। টানা ১১ ম্যাচ অপরাজিত থেকে ইস্টার্ন কনফারেন্সের তলানি থেকে উঠে এখন প্লে-অফের জায়গায় রয়েছে দলটি।