খুঁজুন
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৩০ আশ্বিন, ১৪৩৩

জীবিত থেকেও আজ এক যুগ ধরে কাগজ পএে মৃত

মো :আব্দুল বাতেন বাচ্চু
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৪৯ অপরাহ্ণ
জীবিত থেকেও আজ এক যুগ ধরে কাগজ পএে মৃত

বেঁচে থেকেও সরকারি নথিতে মৃত তিনি। নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে প্রায় এক যুগ ধরে ঘুরছেন সরকারি দপ্তরে। কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্রে তাকে জীবিত করানো যায়নি। বন্ধ হয়ে গেছে বয়স্ক ভাতাও। জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে ধরনা দিতে দিতে এখন ক্লান্ত ৭০ বছর বয়সী মো. আবুল কাশেম। তিনি বলেন, বেঁচে থেকেও কাগজে-কলমে মৃত হয়ে থাকতে হবে আর কত দিন?

আবুল কাশেম গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের লোহাগাছ গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবার নাম মৃত মাঈন উদ্দিন। জন্মসূত্রে এই গ্রামের বাসিন্দা আবুল কাশেমের জাতীয় পরিচয়পত্রও ছিল। কিন্তু ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে বয়স্ক ভাতার টাকা তুলতে গিয়ে জানতে পারেন, সরকারি নথিতে তিনি মৃত। এরপর উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে তাকে জানানো হয়, ২০১৪ সালে বরিশালের বাবুগঞ্জে তার মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। সেই থেকে নিজেকে জীবিত প্রমাণের লড়াই শুরু তার।

পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, আবুল কাশেম তাদের চোখের সামনেই বেঁচে আছেন। নিয়মিত চলাফেরা করছেন, মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন। অথচ সরকারি নথিতে মৃত থাকায় নিজের ভোটাধিকার ফিরে পাওয়া ও বয়স্ক ভাতা চালু করা নিয়ে তাকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। তাকে দ্রুত ভোটার তালিকায় পুনর্বহাল করে জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালে আবুল কাশেম বরিশালের বাবুগঞ্জের একটি ইউনিয়নে মাইগ্রেশন করেন। একই বছর তিনি মারা গেছেন উল্লেখ করে আজিজুর রহমান নামের এক ব্যক্তি তার মৃত্যুসনদের জন্য আবেদন করেন। পরে স্থানীয় ওয়ার্ড সদস্যের স্বাক্ষরিত পত্রের ভিত্তিতে তাকে মৃত হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে তার ভোটার পরিচয়পত্রও কর্তন করা হয়। তবে কীভাবে এবং কোন তথ্যের ভিত্তিতে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি।

আবুল কাশেম বলেন, কয়েকটা ট্যাহা বয়স্ক ভাতা পাইতাম। হেইডাও বন্ধ করে দিছে। আমি নাকি মইরা গেছি। বাইচ্চা থাকতেও আমাকে মাইরা ফালাইছে, এইডা কেমনে মাইন্না লই? মেম্বার-চেয়ারম্যানের পেছনে ঘুরতে ঘুরতে জুতার তলি ছিঁড়া গেছে। আর কবে জীবিত হমু?

স্থানীয় বাসিন্দা মনির হোসেন বলেন, আবুল কাশেম আমাদের গ্রামের মানুষ। তিনি সব সময় আমাদের চোখের সামনে আছেন। আজও একসঙ্গে চা খেয়েছি। কয়েক বছর আগে শুনলাম, তিনি নাকি মারা গেছেন। আমরা তাকে কবর দিলাম না, জানাজা দিলাম না, তাহলে তিনি মারা গেলেন কীভাবে?

আরেক বাসিন্দা আমির হোসেন বলেন, তাকে দীর্ঘদিন ধরে চিনি। তিনি অত্যন্ত ভালো মানুষ। উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ের মাধ্যমে আবুল কাশেমকে জীবিত করে ভোটার তালিকায় পুনর্বহালের জোর দাবি জানাচ্ছি।

এ বিষয়ে শ্রীপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা বাহাউদ্দিন আহমেদ দৈনিক ঢাকার ডাক কে বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্রের বিষয়টি নির্বাচন কার্যালয় সমাধান করবে। পরিচয়পত্রে জীবিত হিসেবে পুনর্বহাল হলে আবেদনের মাধ্যমে তাকে আবার বয়স্ক ভাতার আওতায় আনা হবে।

শ্রীপুর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) তামান্না রশিদ বলেন, তিনি এ উপজেলায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। আবুল কাশেম আগে কতবার কার্যালয়ে এসেছেন, তা তার জানা নেই। তবে তার কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মাইগ্রেশনের পর বাবুগঞ্জে যাওয়ার পর সেখানে তার মৃত্যুর তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। ওই উপজেলায় যোগাযোগ করে জাতীয় পরিচয়পত্রে কর্তন-সংক্রান্ত বিষয়টি সংশোধন করতে হবে। সেখানে যোগাযোগ করলে সমস্যার সমাধান হতে পারে।

গাজীপুর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, ভুক্তভোগী ব্যক্তি জেলা নির্বাচন কার্যালয়ে এলে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হবে। জেলা কার্যালয় থেকে সমাধান করা সম্ভব হলে তা করা হবে। অন্যথায় দ্রুত কীভাবে সংশোধন করা যায়, সে বিষয়ে তাকে পরামর্শ দেওয়া হবে।

শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদ ভূঞা বলেন, এ বিষয়ে তার কাছে কেউ আসেননি। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি তিনি দেখেছেন। ভুক্তভোগী ব্যক্তি তার কাছে এলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রায় এক যুগ ধরে সরকারি নথিতে নিজের অস্তিত্ব ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন আবুল কাশেম। এখন তার বয়স হয়েছে, শরীরেও আগের মতো শক্তি নেই। জনপ্রতিনিধি ও সরকারি দপ্তরের দরজায় ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত তিনি। তার পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীদের প্রত্যাশা, দাপ্তরিক জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত তাকে জীবিত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। বেঁচে থাকা একজন মানুষকে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে, সেই প্রশ্নই এখন তাদের।

তিন জীবন সংগ্রামী ব্যক্তির ব্যতিক্রমী উদ্যোগের জন্য সহযোগিতার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:৫৩ অপরাহ্ণ
তিন জীবন সংগ্রামী ব্যক্তির ব্যতিক্রমী উদ্যোগের জন্য সহযোগিতার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর

বিশেষ প্রতিনিধি: শিক্ষা ও পরিবেশের উন্নয়নে অবদান রাখা তিন অনুপ্রেরণাদায়ী ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাদের জীবনসংগ্রাম ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগের কথা শুনে প্রশংসা করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস ।

১৪ অক্টোবর বুধবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। সাক্ষাৎ করা তিন ব্যক্তি হলেন বুয়েট থেকে পড়াশোনা শেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা বেছে নেওয়া নায়লা শারাফ, দুই হাত না থাকা সত্ত্বেও বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা মো. আলতাফ হোসেন এবং নিজ উদ্যোগে হাজার হাজার গাছ লাগানো রেজাউল কিবরিয়া বাবুল।

এ সময় তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশ গঠনে আপনাদের মতো মানুষের অনেক প্রয়োজন। আপনাদের মতো সবাই এগিয়ে এলে দেশ গঠন সহজ হবে।’

বুয়েট থেকে পড়াশোনা শেষ করে নায়লা শারাফ প্রথমে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। পরে জনতা ব্যাংকেও কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন তিনি। ৩৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হলেও সরকারি চাকরিতে যোগ না দিয়ে শিশুদের শিক্ষাদানের পথ বেছে নেন নায়লা।

গত সাত বছর ধরে নেত্রকোনার পাঁচআননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন তিনি। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাঠদান সহজ করতে নিজ উদ্যোগে তৈরি করছেন বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ ও ডিজিটাল কনটেন্ট।প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় নিজের শিক্ষকতা ও শিশুদের শিক্ষার উন্নয়নে নেওয়া উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন নায়লা।

জন্ম থেকেই দুই হাত নেই নরসিংদীর মো. আলতাফ হোসেনের। তবে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তার পথচলায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। পা দিয়ে লেখালেখি শিখে ২০০৭ সালে নরসিংদীর পাঁচদোনায় প্রতিষ্ঠা করেন প্রতিভা দুঃখু মিয়া কিন্ডারগার্টেন স্কুল।নিজের সঞ্চয় ও পৈতৃক জমি বিক্রির অর্থে গড়ে তোলা বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ১৪৫ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। শিক্ষক রয়েছেন ১০ জন। পা দিয়েই লেখালেখি করার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেন তিনি।

আলতাফের জীবনসংগ্রাম ও বিদ্যালয় পরিচালনার কথা শুনে প্রধানমন্ত্রী নতুন স্কুল ভবন নির্মাণ করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

ভোলার চরফ্যাশনের রেজাউল কিবরিয়া বাবুলের অনুপ্রেরণার উৎস পরিবেশ ও প্রকৃতি। মসজিদে ইমামতির পাশাপাশি প্রায় তিন দশক ধরে নিজের অর্থ ও শ্রম ব্যয় করে বিভিন্ন সড়কের পাশে হাজার হাজার গাছ লাগিয়েছেন তিনি।পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে নার্সারি গড়ে তোলেন বাবুল। পরে সেখান থেকে উৎপাদিত চারা বিভিন্ন এলাকায় রোপণ শুরু করেন। তার লাগানো অনেক গাছ এখন বড় হয়ে পথচারীদের ছায়া দিচ্ছে।

সাক্ষাৎকালে তিনজনের কাজের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমাজ ও দেশের কল্যাণে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কাজ করা মানুষের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতো মানুষের উদ্যোগ অন্যদেরও ভালো কাজে এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করবে।

প্রধানমন্ত্রী তাদের নিজ নিজ কার্যক্রম অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

ঢাকার ডাক নিউজ/এস