বিদেশে বাংলাদেশি নারী শ্রমিক: স্বপ্ন থেকে শোকের যাত্রা
২০২৬ সালের ২৬ জুন সন্ধ্যা। সৌদি আরবের রিয়াদ শহরের মারকাব এলাকায় পুলিশ অভিযান চালায় এক বাংলাদেশি নাগরিকের বাসায়। ডিপ ফ্রিজ খুলতেই বেরিয়ে আসে প্রায় দুই মাস ধরে নিখোঁজ থাকা এক নারী গৃহকর্মীর নিথর দেহ। নাম রত্না। বাড়ি ঢাকা। বাবা-মা নেই, অভিভাবক এক খালা। দেশে ফেলে এসেছেন শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী একমাত্র মেয়েকে। মেয়েটির চিকিৎসা আর পরিবারের ঋণ শোধের টাকা জোগাড় করতেই মধ্যপ্রাচ্যে পা রেখেছিলেন তিনি। খালার ভাষায়, মেয়েটি অনেক প্রত্যাশা নিয়ে গিয়েছিল, কঠোর পরিশ্রম করছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই প্রত্যাশা ট্র্যাজেডিতে গিয়ে ঠেকল।
রত্না একা নন। গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান, আদালতের রায়, এনজিওর রিপোর্ট আর পরিবারের আর্তনাদ মিলিয়ে একটা চিত্র উঠে আসে। সেটি হলো: স্বপ্ন নিয়ে যাওয়া, আর লাশ হয়ে ফেরা।
*১. রিয়াদের ফ্রিজ থেকে শুরু: রত্নার ঘটনা*
সৌদির রাজধানীর এক বাসা থেকে উদ্ধার হয় রত্নার দেহ। প্রাথমিক তথ্য বলছে, তিনি সেখানে গৃহকর্মীর কাজ করতেন। দীর্ঘ সময় পরিবারের সাথে কথা বলতে না পারায় স্বজনরা উদ্বিগ্ন ছিলেন। পুলিশি অভিযানের পর বিষয়টি সামনে এলে প্রবাসী মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করেছে। মৃত্যুর ধরন ও জড়িত কারা, তা এখনো তদন্ত পর্যায়ে। সামাজিক মাধ্যমে দাবি উঠেছে নিরপেক্ষ তদন্তের, দোষীদের দ্রুত শনাক্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির।
*২. আদালত পর্যন্ত গড়ানো মামলা: আবিরন বেগম, খুলনা ২০১৯*
খুলনার পাইকগাছার আবিরন বেগম ২০১৭ সালে সংসারের জন্য অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে যান। ২০১৯ সালের মার্চে তিনি খুন হন গৃহকর্ত্রীর হাতে। সৌদি কর্তৃপক্ষের দেওয়া মৃত্যু সনদে কারণ হিসেবে উল্লেখ ছিল হত্যা।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়, মারধর করা হয় এবং গরম পানি ঢেলে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে মামলার বিচার শুরু হয় সৌদি আদালতে। ২০২১ সালে রায় আসে: গৃহকর্ত্রী আয়েশা আল জিজানীর মৃত্যুদণ্ড, তার স্বামীর ৩ বছর কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার সৌদি রিয়াল জরিমানা, এবং তাদের নাবালক ছেলের ৭ মাস কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে থাকার নির্দেশ।
২০১৯ সালের অক্টোবরে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের সহায়তায় আবিরনের মরদেহ দেশে আনা সম্ভব হয়। সাত মাস সৌদির মর্গে রাখার পর লাশ বাংলাদেশে পৌঁছায়। স্বজনরা লাশ দেখে জানান, অবস্থা এমন ছিল যে তাকানো যাচ্ছিল না।
এই মামলা ব্যতিক্রমী কারণ সৌদিতে এ ধরনের বিচার খুব কম দেখা যায়। পরিবার প্রতিশোধমূলক বিচার চাইলে তা আইনি নজির হতে পারে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন।
*৩. ছাদ থেকে পড়ে যাওয়া: শাজেদা, নরসিংদী-জর্ডান*
নরসিংদীর শাজেদা যখন জর্ডানে যান তখন তার বয়স ছিল আনুমানিক ১৭ থেকে ১৮। চার বছর আগে গৃহকর্মী হিসেবে যাওয়ার এক বছরের মাথায় তার মৃত্যুর খবর আসে। মৃত্যু সনদে কারণ দেখানো হয় দুর্ঘটনা।
তার ভাই নুর মোহাম্মদের দাবি, বোনকে ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। তিনি স্থানীয় থানায় দালালের বিরুদ্ধে মামলা করেন। কিন্তু অগ্রগতি হয়নি। তার ভাষ্য ছিল, দেশে হলে তিনি শেষ পর্যন্ত খুঁজতেন, কিন্তু বিদেশে হওয়ায় কিছুই করার নেই।
*৪. হঠাৎ আইসিইউ: মরজিনা, দুবাই থেকে সৌদি ২০২১*
মরজিনা চার বছর দুবাইয়ে কাজ করার পর সৌদি আরবে ছিলেন। ২০২১ সালে তার মৃত্যুর কারণ বলা হয় স্ট্রোক। পরিবার জানত না তিনি অসুস্থ। ছেলে মাসুম বলেন, সকালে মায়ের সাথে কথা বলার পর বিকেলে হাসপাতালের আইসিইউ থেকে ফোন আসে। ভিডিও কলে দেখতে চাইলেও অনুমতি মেলেনি। চার দিন পর মৃত্যুর সংবাদ।
লাশ পাওয়ার পর কর্তৃপক্ষ পরিবারকে আর অগ্রসর না হতে বলেছিল বলে তারা জানান।
*৫. গণ আটক ও অবহেলা: ২৪ জন গৃহকর্মী, সৌদি ২০২০*
২০২০ সালে সৌদিতে ২৪ জন বাংলাদেশি গৃহকর্মীকে অবৈধভাবে নিয়োগের পর কাজের জায়গায় না পাঠিয়ে আটকে রাখার অভিযোগ ওঠে। তাদের পর্যাপ্ত খাবার, পানি বা অসুস্থ হলে চিকিৎসা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। পরে তাদের উদ্ধার করা হয়।
*৬. সংখ্যার ভার: ৫ বছরে ২০০+ মরদেহ*
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের হিসাব অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে প্রায় পাঁচ শত নারীর মরদেহ বিদেশ থেকে দেশে এসেছে। এর মধ্যে অন্তত দুই শতাধিক সৌদি আরব থেকে।
২০১৬ থেকে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪৭৩ জন নারীর মরদেহ এসেছে। এর মধ্যে ১৭৫ জন সৌদি থেকে। এই ১৭৫ জনের মধ্যে ৫১ জনের মৃত্যু কারণ হিসেবে আত্মহত্যা দেখানো হয়েছে। সব দেশ মিলিয়ে আত্মহত্যা বলে রেকর্ড করা সংখ্যা ৮১ এর বেশি।
২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬৩ জন নারীর মরদেহ এসেছে, যার মধ্যে সৌদি থেকে ২ জন, লেবানন ১৪, জর্ডান ১, ওমান ৭, সংযুক্ত আরব আমিরাত ৪ জন।
*৭. বেঁচে ফেরা, কিন্তু ভাঙা শরীর নিয়ে: পিয়ারা ও মিম*
পিয়ারা বেগম চার বছর সৌদিতে ছিলেন। তিনি জানান, মাথা ও পেটের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায় ভুগলেও যথাযথ চিকিৎসা পাননি। দেশে ফেরার আবেদন করলে চার মাসের বেতন আটকে রাখা হয়। পরে একটি এনজিওর সহায়তায় তিনি দেশে ফিরে চিকিৎসা নেন। তার ছেলে ওমান থেকে শারীরিক নির্যাতন ও সর্বস্ব হারিয়ে ফেরেন।
মিম আক্তারের কাছ থেকে দালাল ৫ হাজার টাকা নেয়। সৌদিতে পৌঁছে কেউ তাকে গ্রহণ করেনি। দিনভর কাজ করানো হতো, শুধু দুপুরে খাবার দেওয়া হতো। একবার বুকের ওপর ইট পড়ে আহত হন। ৪০ হাজার টাকা নিজ খরচে চিকিৎসা করাতে হয়। মালিক ছয় মাস দেশে ফেরা আটকে রাখেন এবং প্রায় তিন লাখ টাকার মালামাল দখল করেন।
*৮. দূতাবাসের ভেতরেও অভিযোগ: রিয়াদ সেফহোম ২০২০*
নির্যাতনের শিকার হয়ে রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের সেফহোমে আশ্রয় নেওয়া কয়েকজন গৃহকর্মী সেখানকার এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তোলেন। তদন্তে অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় ২০২১ সালে ওই কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
*কেন বারবার ঘটছে? কাঠামোগত কারণগুলো*
*১. যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা*: রত্নার মতো অনেকের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে যোগাযোগ করতে পারেন না। পাসপোর্ট আটকে রাখা, ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা, কঠোর কাজের চাপ—সব মিলিয়ে বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন কর্মীরা।
*২. আর্থিক ও চিকিৎসা বঞ্চনা*: বেতন আটকে রাখা, অসুস্থ হলে চিকিৎসা না দেওয়া, খাবার-পানিতে কার্পণ্য—এই অভিযোগগুলো পিয়ারা ও মিমের বর্ণনায় স্পষ্ট।
*৩. মৃত্যু সনদের অস্পষ্টতা*: স্ট্রোক, দুর্ঘটনা বা আত্মহত্যা—এই তিনটি শব্দ বারবার আসে। শাজেদার ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, মরজিনার ক্ষেত্রে স্ট্রোক, আর ৫১ জনের ক্ষেত্রে আত্মহত্যা। পরিবারগুলোর পক্ষে বিদেশে গিয়ে ময়নাতদন্ত, পুলিশ রিপোর্ট সংগ্রহ বা আইনি লড়াই চালানো কঠিন।
*৪. লাশ আনার জটিলতা*: সৌদির আইন কড়া। মৃত্যু অস্বাভাবিক হলে অটোপসি, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, ক্ষমতাপত্র বা পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নির্ধারণে সময় লাগে। আবিরনের লাশ সাত মাস মর্গে ছিল।
*৫. অভিযোগের অভাব*: ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের এক কর্মকর্তা বলেন, মৃতদের পরিবার থেকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ খুব কম আসে। আইনি সহায়তা, সচেতনতা বা সাহসের ঘাটতি এর কারণ।
*৬. এজেন্ট ও রিক্রুটিং সংস্থার ভূমিকা*: নুর মোহাম্মদ দালালের বিরুদ্ধে মামলা করেও ফল পাননি। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় এজেন্ট, রিক্রুটিং এজেন্সি ও দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।
*পরিবারের গল্প: রত্নার খালা থেকে নুর মোহাম্মদ*
রত্নার খালা বলেছিলেন, মেয়েটি স্বপ্ন নিয়ে গিয়েছিল। একমাত্র মেয়ের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য কঠোর পরিশ্রম করছিল। সেই স্বপ্ন ট্র্যাজেডিতে শেষ।
নুর মোহাম্মদ বলেছিলেন, দেশে হলে তিনি দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত ছুটে যেতেন। কিন্তু এখন তার মনে হয়, তার নিজের অস্তিত্বই না থাকলেই ভালো।
এই দু’টি বাক্য হাজারো পরিবারের প্রতিনিধিত্ব করে।
*রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া ও সুপারিশ*
এই ঘটনাগুলোর পর প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কিছু সুপারিশ দিয়েছে। কিন্তু ব্র্যাকের মূল্যায়ন হলো, বেশিরভাগ সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি।
আবিরনের মামলা একটি আশার দিক দেখায়। কারণ সৌদি আদালত হত্যার দায়ে শাস্তি দিয়েছে। যদি এই বিচার কার্যকরী হয়, তাহলে তা অন্য শোষক মালিকদের জন্য বার্তা হতে পারে এবং ভবিষ্যৎ মামলার জন্য নজির তৈরি করতে পারে।
*উপসংহার: স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা*
রত্না গিয়েছিলেন প্রতিবন্ধী মেয়ের চিকিৎসা আর সংসারের দারিদ্র্য ঘোচাতে। আবিরন গিয়েছিলেন পরিবারকে সাহায্য করতে। শাজেদা, মরজিনা, পিয়ারা, মিম—সবার পেছনে ছিল একই ধরনের অর্থনৈতিক চাপ ও পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, নির্যাতন, যোগাযোগহীনতা, চিকিৎসাহীনতা, বেতন আটকানো, এবং শেষ পর্যন্ত অস্বাভাবিক মৃত্যু।
ওয়েজ আর্নার্স বোর্ডের ভাষায়, নারী অভিবাসী কর্মীদের মৃত্যু দেশের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা আর বিদেশে তাদের নাজুক অবস্থার যোগসূত্র তুলে ধরে।
যতদিন না এজেন্টদের জবাবদিহি, দূতাবাসের সুরক্ষা ব্যবস্থা, দ্রুত লাশ আনা ও বিচার নিশ্চিত করা যায়, ততদিন ‘স্বপ্নের মৃত্যু’র গল্পগুলো থামবে না।
রত্নার ফ্রিজ, আবিরনের মর্গ, শাজেদার ছাদ, মরজিনার আইসিইউ—এগুলো আলাদা ঠিকানা হলেও, গল্পের শেষটা একই রকম বেদনার।



আপনার মতামত লিখুন