খালেদার বাসার সামনে বালুর ট্রাক রাখার ঘটনায় মামলা করে নিরাপত্তহীতায় শ্রমিক দল নেতা দেলু
- খালেদা জিয়ার পক্ষে মামলা করে বেপাকে শ্রমিক দলের নেতা দেলোয়ার দেলু
- খালেদা জিয়ার পক্ষে মামলা করায় বিমানবন্দর থানার আহবায়ক রুনু মোল্লার সহযোগিতায় শ্রমিক লীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হামলার শিকার শ্রমিক দল নেতা দেলু
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গুলশানের বাসার সামনে ১১ বছর আগে (২৯/১২/২০১৩) বালুর ট্রাক দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির মামলায় গুলশান থানার সাবেক ওসি রফিকুল ইসলামকে কারাগারে প্রেরণ করেছেন আদালত। গুলশান থানায় দায়ের করা মামলাটি করেছেন কেন্দ্রীয় কৃষক দলের সদস্য ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রদল নেতা মো. শরীফুল ইসলাম। অন্যদিকে এই ঘটনায় আরেকটি মামলা করেন বিমানবন্দর থাকার শ্রমিক দলের নেতা দেলোয়ার হোসেন দেলু। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে এক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের বাসার সামনে বালুর ট্রাক রেখে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করার অভিযোগে এ মামলা দায়ের করা হয়। এতে আসামি করা হয় যুবলীগ, ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগসহ আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের বেশ কিছু নেতাকর্মীদের।

এজাহারে বলা হয়, যখন আওয়ামী লীগ সরকার সব দাবি প্রত্যাখ্যান করে ভোটারবিহীন নির্বাচন করার প্রস্তুতি নেয়। এর প্রতিবাদে ২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর বিএনপি ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচি ঘোষণা করে বিএনপি। ওই কর্মসূচিতে বিএনপি চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও পরিকল্পিতভাবে গুলশানের বাসার সামনে ৫/৬টি বালুর ট্রাক দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়। পুলিশের সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, শ্রমিক লীগ, যুবলীগের নেতাকর্মীরাও বাসার সামনে অবস্থান নেয়। এ ধরনের কাজ করে গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ন করা, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা, চলাচলে বাধাদান, অবৈধভাবে আটকে রাখার অভিযোগ আনা হয় মামলায়।
৫ আগস্টের পর ফ্যাসিস্ট সরকার শেখ হাসিনা পতনের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ফিরোজার বাসার সামনে শ্রমিক লীগের নেতাকর্মীরা কয়েকটি বালুর ট্রাক দিয়ে তাকে আটকে রাখে এবং সেই সময় শ্রমিক লীগ ও চালক লীগের নেতাকর্মী কাফনের কাপড় বেঁধে বালুর ট্রাক দিয়ে খালেদা জিয়াকে দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ করে রাখে। খালেদা জিয়ার সঙ্গে এমন অন্যায়ের ঘটনা অনেকেই জানেন। সেই ঘটনায় একটি মামলা করেছেন শ্রমিক দলের এক সমর্থনও একনিষ্ঠ কর্মী। ওই কর্মীর নাম দেলোয়ার হোসেন দেলু। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা মহানগর উত্তরের রাজনীতি করে আসছেন। এবং দলের সংকটেও আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন। দেলু এই ঘটনায় অনেক আগেই মামলা করতে চেয়েছিলেন কিন্তু আওয়ামী সরকারের ক্ষমতার সঙ্গে পেরে ওঠেনি। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের পর দেলু এই ঘটনা ২০/১০/২৪ তারিখে বিজ্ঞ মহানগর আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। এই মামলা দায়ের এরপর দেলুকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে কয়েকজন অসাধু রাজনৈতিক ব্যক্তি ও বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ ষড়যন্ত্র করে। তারা এই মামলার পর দেলুকে চাপ দেয় মামলাটি তুলে নেওয়ার জন্য। কিন্তু শ্রমিক দলের কিছু অসাধু নেতাকর্মী মামলা নিষ্পত্তিতে দেলুকে চাপ দিলেও দেলু মামলা নিষ্পত্তি করতে রাজি নয়। তাকে মোটা অংকের টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও অসাধু রাজনৈতিক চক্র। কিন্তু দেলু মামলা নিষ্পত্তি তো দূরের কথা কোনভাবেই শ্রমিক লীগের সঙ্গে আপসে যেতে চান না। এক পর্যায়ে সে আপসে যেতে না চাইলে মীমাংসার নামে এবং কৌশলে তাকে ডেকে নিয়ে একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হামলা চালায়। এই হামলায় সম্পন্ন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ব্যবহার করা হয়। মামলার কারণে দেলু নতুনরূপে পুনরায় আবারও আরেকটি মামলা করেন সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে। যদিও দেলুর আগে সড়ক দূর্ঘটনায় একটি পা গঙ্গু হয় সেই ভাঙ্গা পায়ে শ্রমিক লীগের ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা হামলা করে এবং হামলার সময় তারা বলতে থাকে খালেদা জিয়ার পক্ষের মামলাটি তুলে নিতে।
এখানেই শেষ নয় দেলু খালেদা জিয়ার পক্ষে যে মামলা করেছে সেটি তুলে নেওয়ার জন্য তাকে যে মোটা অংকের টাকার প্রস্তাব দেন ঢাকা মহানগর উত্তর শ্রমিক দলের সদস্য সচিব কামরুজ্জামান। সেটি তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। এসব কারণে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে একটি ইলেকট্রনিক মিডিয়া দিয়ে দেলুকে ভিলেন বানানো হয়। সেখানে দেখা যায় ওই মিডিয়াতে যারা বক্তব্য দিয়েছেন তারা সবাই ৫ আগষ্টের খুনসহ বিভিন্ন মামলার আসামি এবং পলাতক। পুলিশ তাদের খুঁজলেও তারা মিডিয়ার সামনে এসে ওপেন বক্তব্য দেন।
এদিকে আসামিদের গণমাধ্যমে প্রকাশ্যে তাদের এমন বক্তব্যের নিন্দা জানান শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা। যদিও এসব বিষয়ে দেলুর দাবি ওই টেলিভিশন সম্পূর্ণ তার কথা এবং ডকুমেন্ট ভিন্ন ভিন্ন ভাবে কেটে অপপ্রচার করেছে।
দেলুর ভাষ্য মতে, সে কখনোই শ্রমিক লীগের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন না। তার থানার শ্রমিক দলের সভাপতি মালেক হাওলাদার এসব বিষয়ে সব কিছু জানেন। তাছাড়া ওই টেলিভিশনের সাংবাদিক আমাকে মামলাটি নিষ্পত্তির জন্য চাপাচাপিও করলে আমি তাতে রাজি হয়নি।
দেলোয়ার হোসেন দেলু জানান, আমি যখন বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে মামলা করি তখন শ্রমিক লীগের যে সমস্ত নেতাকর্মীরা আসামি হয়েছে তারা নিষ্পত্তির জন্য বিভিন্ন কৌশল নেয় এবং আমাকে হয়রানি করতে দুইটা মামলা করেন। এই মামলা দুটি মিথ্যা। একটি মামলা হল বিমানবন্দর বন্দরের ভিতরে সিভিল এভিয়েশনের কাউন্টারে ভাঙচুর, আরেকটি মামলা হল নারী নির্যাতন। এই দুটি মামলায় মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন যেটার পিবিআই তদন্তে ও আইনগতভাবে প্রমাণ হয়েছে।
তিনি বলেন, আমাকে একটি বেসরকারি টেলিভিশনে সম্পন্ন খলনায়ক বানানো হয়েছে। আমি মনে করি ওই সংবাদটি সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এই সংবাদের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।

দেলু খালেদা জিয়ার পক্ষে যে মামলা করেছেন সেই মামলার আসামিরা হলেন- বিমানবন্দর থানা শ্রমিক লীগের নেতা মোঃ নুরুল ইসলাম ওরফে ফার্মা নুরুল ইসলাম, বিমানবন্দর থানার সাবেক ওসি এবিএম ফরমান আলী, শ্রমিক লীগ নেতা রফিক মোল্লা, শ্রমিক লীগ নেতা মোফাজ্জল হোসেন মোফা, আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মা সেলিম, সজল, চালক লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব হাওলাদার, সাবেক যুবলীগ নেতা ও শ্রমিক লীগ নেতা মোঃ বাদশা, শ্রমিক লীগ নেতা শাহজাহান, মোঃ সালাম, এম এ বাসার স্বপন, আশরাফ, হুমায়ুন, আক্তার হোসেন, রনি, মোঃ আলাউদ্দিন বিশ্বাস, মোঃ পারভেজ, মোঃ হুমায়ুন, বারেক, রুবেল, শরীফ, আলম সুলতান, আফতাব উদ্দিন ওরফে মাসুদ, মোঃ টিটু, ইলিয়াস, মোঃ, শিমুল, আয়নাল হক, মোঃ আলী ওরফে ল্যাংড়া আলী, মোঃ বাহার, খলিল, জামাল, ভাগিনা রানা আসামি সবাই আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার বাদী মোঃ দেলোয়ার হোসেন দেলু বলেছেন, আমি খালেদা জিয়ার পক্ষে মামলা করে খুব বিপদের মধ্যে পড়েছি। অনেকে মামলা নিষ্পত্তির জন্য আমাকে চাপ দিচ্ছেন এবং আমার বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে অপপ্রচার করছে। আমাকে দেশ-বিদেশ থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এবং মামলার আসামিরা সবাই আওয়ামী লীগের ও শ্রমিকলীগের লোকজন। তারা কিছু মিডিয়া ম্যানেজ করে টাকা দিয়ে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছে। যেটার কোনো সত্যতা নেই। আমি এই মামলা করে একবার হামলার শিকার হয়েছি। সেই ঘটনাও আমি আরেকটা মামলা করেছি। আমি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও বিএনপি ঊর্ধ্বতন নেতাকর্মীদের কাছে এই বিষয়ে সহযোগিতা কামনা করছি।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, আমি শ্রমিক দলের নেতা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মামলার বাদী। এরপর আওয়ামী লীগের পক্ষ নিয়ে আমাদের কিছু নেতাকর্মীরা আমার বিরুদ্ধে দাড়িয়েছে। এবং এই মামালার পর দুইটা মিথ্যা মামলাও করেছেন তারা। আমি মামলা করার পরেই সেই মামলা করে আমার আসামিরা। সেই মামলায় অভিযোগ করা হয়- আমি বিমানবন্দরের মধ্যে ভাঙচুর করেছি অথচ পিবিআই এর তদন্তে যে রিপোর্ট এসেছে সেটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি যাতে মামলা তুলেনি এজন্য আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা একজন নারী দিয়ে আমার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের আরেকটা মামলা করেছে। অথচ ওই নারীকে আমি চিনিই না। মামলাটিও মিথ্যা।
দেলু আক্ষেপ করে বলেন, আমি এসব বৈষম্যের শিকার হচ্ছি । আমাদের শ্রমিক দলের কিছু নেতাকর্মীদের কারণে। এরমধ্যে রয়েছে ঢাকা মহানগর উত্তর শ্রমিক দলের সদস্য সচিব কামরুজ্জামান ওরফে কামরুল। তিনি এই মামলাটি করতে নিষেধ করেন। সার্বিক বিষয় নিয়ে তখন আমি কামরুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করতে উত্তরার তার গাড়ির শোরুমে যায় তখন দেখি আওয়ামী লীগের লোকজন তার অফিসে বসে আছে। এবং আমার আসামিরাও সেখানে বসে আছে। তখন সে আসামীদের সামনে বলে আমি যেন মামলাটি না করি। আমি মামলা করার পরে সে আমার উপর ক্ষিপ্ত হয়ে বিভিন্ন আজেবাজে অপপ্রচার করতে থাকে। এবং কিছু লোকজন নিয়ে শ্রমিক দলের বিমানবন্দরের আহ্বায়ক রুনু মোল্লার নেতৃত্বে আমার উপর এক দল সন্ত্রাসী হামলা করে। আমার প্রশ্ন হচ্ছে আমিও শ্রমিক দলের সাবেক সদস্য। আমার উপর কিভাবে শ্রমিক দল হামলা করল তাও আবার খালেদা জিয়ার মামলা তুলে নেওয়ার জন্য। এটা আসলেই দুঃখজনক।
জানা যায়, শ্রমিক দলের নেতা রুনু মোল্লার আপন ভাই এস এম সুজন মোল্লা বিমানবন্দর থানা শ্রমিক লীগের সভাপতি। এজন্য রুনু মোল্লা শ্রমিক লীগকে সেলটার দিচ্ছেন এবং দেলুকে প্রেসার দিচ্ছে মামলা নিষ্পত্তি করার জন্য। আর রুনু মোল্লাকে সেলটার দিচ্ছে শ্রমিক দলের উত্তরের সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান। তবে, দেলুর অভিযোগ কোন শেল্টার কাজ হবে না। আমি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে হয়রানি করা এবং তাকে মেরে ফেলা ও কর্মসূচিতে যেতে বাধা দেওয়ার সঠিক বিচার চাই এবং আদালতের কাছে এই বিচারটি ছেড়ে দিয়েছি।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে খিলক্ষেত থানা শ্রমিক দলের সভাপতি মালেক হাওলাদার বলেন, দেলোয়ার হোসেন দেলু আমার শ্রমিক দলের সদস্য। তাকে কেউ কেউ শ্রমিক লীগ বলে চালাচ্ছেন সেটা মিথ্যা ও উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে রটানো হচ্ছে। সে খালেদা জিয়ার পক্ষে যে মামলা করেছে সেটার সর্মথন আমি করি। তার নিরাপত্তার জন্য প্রশাসনের কাছে সহযোগিতা কামনা করছি।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রমিক লীগের ঢাকা মহানগর উত্তরের সহ-সভাপতি আলমাস হাওলাদার মিন্টু সাংবাদিকদের বলেন, দেলোয়ার হোসেন দেলু নামের কোন শ্রমিক লীগ নেতা নাই। তবে মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন আছে তার বাড়ি জামালপুর এবং বাসা আশকোনায় কাস্টম হাউজের বেসরকারি কিছু কাজ কাম করতো। আর আপনি যার কথা বলছেন তাকে আমি চিনি না। আমাদের এমন নামে কেউ আছে কিনা আমার জানা নেই।



আপনার মতামত লিখুন