ঢামেকে স্বার্থের চাদর : ঔষধ কোম্পানির টাকায় চাদর ক্রয়
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসেন কয়েক হাজার রোগী। শয্যার অনুপাতে বেশি রোগী হলেও এখান থেকে কেউ ফেরে না বিনা চিকিৎসায়। সরকারের সর্বোচ্চ নজরদারিতেও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবুও এ হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগটি চলছে পরিচালকের একচ্ছত্র স্বেচ্ছাচারিতায়। রোগীদের কল্যাণের নামে নিয়মবহির্ভূতভাবে ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে নিয়েছেন বিছানার চাদর কেনার টাকা। আর চিকিৎসকদের বাধ্য করছেন ওই কোম্পানির ওষুধের নাম লিখতে।
চিকিৎসকদের কাছ থেকে ডোনেশনের নামে চাঁদা তুলে কিনেছেন ইন্টারেকটিভ প্যানেল। একই পদ্ধতিতে কিনেছেন প্রজেক্টর। এখন উদ্যোগ নিয়েছেন আলাদা সার্ভার কেনার। সবই কোনো না কোনো ওষুধ কোম্পানির বা ডাক্তারদের চাঁদার টাকায় কেনার এ উদ্যোগকে তিনি হাসপাতালের কল্যাণের জন্য দাবি করলেও এটিকে সম্পূর্ণ অনৈতিক বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। সরকারি হাসপাতালে নিয়মের বাইরে ব্যক্তির টাকায় একটি সুঁইও কেনার সুযোগ নেই বলে জানান তারা।
অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের ১১৩ এবং ১১৫ নম্বর- এ দুই ওয়ার্ডে রয়েছে ৬টি ইউনিট। যেগুলোর আলাদা আলাদা নাম। রংধনুর সাত রঙের আসমানি ছাড়া বেগুনী, নীল, সবুজ, কমলা, লাল, হলুদ রঙের ইউনিটগুলো নজর কাড়বে যে কারোই। কারণ প্রত্যেকটি ইউনিটের সঙ্গে মিল রেখে সব শয্যায় বিছানো রয়েছে রঙ-বেরঙের চাদর।
এই চাদর কেনা হয়েছে বিভাগের বর্তমান প্রধান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ জাকির হোসেনের নির্দেশনায়। কিন্তু এর জন্য কোনো টেন্ডার বা সরকার থেকে পাননি এক টাকাও। এরিস্টো ফার্মা, বেক্সিমকো, স্কয়ারসহ কয়েকটি কোম্পানি থেকে চাদর কেনার জন্য তিনি নিয়েছেন ৫ লাখ করে টাকা। এসব টাকায় চাদর কিনেছেন তিনি। যা সরকারি নীতিমালার সম্পূর্ণ বাইরে।
বেসরকারি ওষুধ কোম্পানির টাকায় চাদর কেনার কারণ জানতে চাইলে সাংবাদিকদের মুঠোফোনে অধ্যাপক ডা. সৈয়দ জাকির হোসেন বলেন, ‘চাদর কেনার বিষয়টি তো এক বছর আগের। এটি নিয়ে এখন কথা হচ্ছে কেন? আমি তো শুধু চাদর কিনিনি। বিভাগের কল্যাণে যা যা করণীয় অনেক কিছুই করেছি। এই যেমন ধরেন আমাদের একটা ইন্টারেকটিভ প্যানেল (ডিজিটাল স্মার্ট বোর্ড-ক্লাসরুমে ব্যবহারের জন্য) কিনেছি চিকিৎসকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে। যেখানে খরচ হয়েছে ৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা।’
চিকিৎসকরা নিজ উদ্যোগেই সেই টাকা দিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি এবং বলেন, ‘একইভাবে নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে বিভাগে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগিয়েছি। কথা বলার এক পর্যায়ে প্রতিবেদককে (দৈনিক ঢাকার ডাকের সহ-সম্পাদক, স্বাস্থ্য) চায়ের দাওয়াত দিয়ে বলেন, ‘আপনি সামনা-সামনি আসেন। বিভাগের কল্যাণে কি কি কাজ করেছি তা নিজের চোখে দেখে যান।’ তার সঙ্গে চা না খেয়ে প্রতিবেদন না লেখার জন্যও অনুরোধ করেন।
কিন্তু তার সঙ্গে দেখা করলে প্রতিবেদন লেখা যাবে না দাবি করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিভাগের এক চিকিৎসক দৈনিক ঢাকার ডাক’কে বলেন, ‘তিনি এমনভাবে আপনাকে বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা দেবেন যে আপনি আর প্রতিবেদন করতে পারবেন না। তিনি বিভাগীয় প্রধান হয়েও কোনো অস্ত্রোপচার করেন না। একটাও ক্লাস নেন না। এমনকি দুপুরের আগে কোনোদিন বিভাগেই আসেন না। তিনি ক্যানসার সারভাইভর অজুহাতে এমন স্বেচ্ছাচারিতা করছেন। সরকারিভাবেই বিভাগে সিসিটিভি লাগানো আছে। কিন্তু বিশেষ কাউকে সুবিধা দিতে তিনি বাড়তি এসব ক্যামেরা লাগিয়েছেন। যেগুলোর কোনো প্রয়োজনই নেই। যদি যোগ্য লোকই না হন তাহলে পদ আকড়ে থেকে কি লাভ?’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের বিভাগে এক্স-রে মেশিনের সংকট প্রকট। প্লাস্টার রুমের জন্যও নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক। যে বিভাগীয় প্রধান সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনসহ আলাদা সার্ভার কেনার উদ্যোগ নেওয়ার মতো জটিল কাজগুলো করছেন তিনি এক্স-রে মেশিনের জন্য কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন না কেন?’
এতসব স্বেচ্ছাচারিতার পরও রোগীরা যে সুচিকিৎসা পাচ্ছেন তা কিন্তু নয়। সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল ১০টায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ঢামেকের অর্থোপেডিক বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন রাজধানীর মহানগর এলাকার বাসিন্দা সিকান্দার হোসেন। চিকিৎসক একটি এক্স-রে করতে দিয়েছেন। কিন্তু এক্স-রে রুমের সামনে দীর্ঘ লাইন দেখে তিনি পাশের একটি বেসরকারি হাসপাতালে যান। একই রকমভাবে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত শিল্পী আক্তারকে ডাক্তার নিজেই বলেন, ‘খোদ পরিচালক বলে দিলেও এখানে আপনি এক্স-রে করার সুযোগ পাবেন না।’
অর্থোপেডিক্স ডিপার্টমেন্টের প্রধান অধ্যাপক ডা. জাকির হোসেন বলেন, ‘বিভাগের উন্নয়নে যা যা করণীয় তা ধারাবাহিকভাবে করে যাচ্ছি। আপনারা জানেন সরকারের পক্ষ থেকে কোনো যন্ত্রপাতি পেতে হলে কত ঘাট ঘুরতে হয়। টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ করতেই বছর চলে যায়। আমার আগে যিনি বিভাগীয় প্রধান ছিলেন তার কাছে একটি অর্থোস্কোপি মেশিন আসে। কিন্তু তিনি সেটি রিসিভ করেননি। কারণ এটির রিকুইজিশন এর আগের বিভাগীয় প্রধান দিয়েছিলেন। এখন এটির জন্য প্রত্যেক রোগীর বাড়তি খরচ হচ্ছে ২৫ থেকে ২৬ হাজার টাকা। এমন দীর্ঘসূত্রতা থেকে বের হতেই আমি এসব উদ্যোগ নিয়েছি। কারো কোনো ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে না।’
তবে সরকারি হাসপাতালের কেনাকাটায় এমন উদ্যোগ সম্পূর্ণ অনৈতিক উল্লেখ করে অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. অনুপ মোস্তফা দৈনিক ঢাকার ডাককে বলেন, ‘বিস্তারিত আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। তবে সরকারি হাসপাতালে সরকারিভাবেই যেকোনো কেনাকাটা হবে। এর বাইরে একটি গজ বা সুতাও কেনা যাবে না। কেউ যদি সেটি করে তাহলে নিশ্চয়ই তার ব্যক্তিস্বার্থ রয়েছে এতে তা স্পষ্ট।’
ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, ‘রোগীর সেবা আমাদের আমাদের সর্বোচ্চ লক্ষ্য। এর জন্য সরকার থেকে পর্যাপ্ত সহযোগিতা আমরা পাই। কিন্তু কোনো বিভাগ যদি এরকম অনৈতিকভাবে নিজের স্বেচ্ছাচারিতায় কেনাকাটা করে থাকেন তাহলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’



আপনার মতামত লিখুন