শুধু শাহপুর-দৌলতপুর নয়, দেশজুড়ে সড়কের বেহাল দশা: কত দূর স্মার্ট বাংলাদেশ
১. ভূমিকা: একটি সড়ক, কোটি মানুষের কান্না
“আর কত দুর্ভোগ পোহাতে হবে? ধৈর্য আর কুলাচ্ছে না। দেশ কি এমনিই স্বাধীন হয়েছে? কেন ঠিক হবে না এই রাস্তা?”—ক্ষোভ, ক্লান্তি আর চরম অসহায়ত্ব মিশিয়ে কথাগুলো বলছিলেন শাহপুর থেকে দৌলতপুরগামী যাত্রী মাহফুজা খাতুন।
দৈনিক পূর্বাঞ্চলে প্রকাশিত এই আর্তি কেবল খুলনার একটি উপজেলার গল্প নয়। এটি আজ দেশের হাজারো সড়কের সাধারণ চিত্র। শাহপুর-দৌলতপুর সড়কটি বর্তমানে “অসহনীয় দুর্ভোগের প্রতীক” হয়ে দাঁড়িয়েছে। পিচ উঠে গিয়ে তৈরি হয়েছে বিশালাকার গর্ত; বর্ষায় যা রূপ নেয় কাদার রাজ্যে, আর শুকনায় ওড়ায় ধুলার ঝড়। অথচ খুলনা, সাতক্ষীরা ও যশোর—এই তিন জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথ এটি। একটি সড়ক যখন জনজীবনের জন্য মৃত্যুফাঁদ হয়ে ওঠে, তখন বুঝতে হবে আমাদের টেকসই উন্নয়নের ভিত কতটা ভঙ্গুর। শাহপুর-দৌলতপুর সড়কের ক্ষতবিক্ষত রূপকে সামনে রেখেই আজ আমাদের দেশের সড়কের সামগ্রিক ব্যবচ্ছেদ করা প্রয়োজন।
২. শাহপুর-দৌলতপুর: এক কিলোমিটারের নরকযন্ত্রণা
ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, খুলনার দৌলতপুর-ফুলবাড়ী-শাহপুর সড়কটি ১৯৮০-এর দশকে পাকাকরণ করা হয়েছিল। এরপর কয়েক দফায় জোড়াতালির সংস্কার হলেও বর্তমানে শন্যুয়া থেকে শোলাগাতিয়া পর্যন্ত অংশটি যাতায়াতের সম্পূর্ণ অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
সড়কটির বর্তমান চালচিত্র:
- গভীর খানাখন্দ ও উল্টে যাওয়া যান: সড়কের বিভিন্ন অংশের পিচ ও খোয়া পুরোপুরি উঠে গিয়ে পুকুরের মতো গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই সেসব গর্তে পানি জমে যাচ্ছে। ফলে মোটরসাইকেল, মাহেন্দ্র, ইজিবাইক এমনকি জরুরি রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সও নিয়মিত উল্টে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে।
- মৌসুমি অভিশাপ: শুকনো মৌসুমে এই পথ দিয়ে যাতায়াত করলে ধুলাবালিতে চোখ-মুখ অন্ধকার হয়ে যায়, শ্বাসকষ্টে ভোগেন যাত্রীরা। আর বর্ষা এলে এটি হয়ে ওঠে এক কাদার নদী।
- থমকে যাওয়া জনজীবন: এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজারো সাধারণ মানুষ, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও রোগীরা যাতায়াত করেন। বর্তমানে এই বেহাল দশার কারণে শিক্ষার্থীরা সময়মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছাতে পারছে না, কৃষকের পণ্যবাহী ট্রাক আটকে থাকছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ড. রবিউল মন্ডল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “খুলনা থেকে শোলাগাতিয়া পর্যন্ত অংশে এত খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে যে, আতঙ্ক নিয়ে মানুষজন যাতায়াত করছে। প্রতিদিন এখানে দুর্ঘটনা ঘটছে।”
৩. ২ কোটি ২ লাখ টাকার প্রকল্প ও জবাবদিহিতার অপমৃত্যু
এই সড়কটির সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক অধ্যায় হলো এর সংস্কারের পেছনের গল্প। গত অর্থবছরে প্রায় ২ কোটি ২ লাখ টাকার একটি বড় প্রকল্প এই সড়কের জন্য অনুমোদন পেয়েছিল। কাজের দায়িত্ব পায় ‘অনিক এন্টারপ্রাইজ’ নামক একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, কাজের নির্ধারিত সময়সীমা পার হয়ে গেলেও ঠিকাদার কাজ শেষ করেনি।
এটাই আজ বাংলাদেশের সড়ক সংস্কারের নির্মম বাস্তবতা। বরাদ্দ আসে, টেন্ডার হয়, কিন্তু মাঝপথে কাজ আটকে থাকে। ফলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও তদারকি কর্মকর্তাদের উদাসীনতা ও অপেশাদারিত্বের কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কেবলই বাড়ে। খুলনা সড়ক বিভাগের কর্মকর্তাদের কথাতেও সেই অসহায়ত্বের সুর—অমর্যাদা ও দায়িত্বহীনতার কারণে জনগণের ভোগান্তি আজ চরম সীমায় পৌঁছেছে।
৪. টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া: দেশজুড়ে একই ক্ষত
শাহপুর-দৌলতপুর কোনো একক বা বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়। দেশের জাতীয় মহাসড়ক থেকে শুরু করে গ্রামীণ সড়ক—সবখানেই একই রকমের ক্ষতচিহ্ন দৃশ্যমান।
| সড়কের নাম/অঞ্চল | বর্তমান পরিস্থিতি ও প্রধান সমস্যা |
|---|---|
| ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক | দেশের অর্থনীতির এই লাইফলাইনের কুমিল্লা-ফেনী অংশে প্রতি ৫০ মিটারে গর্ত। পণ্যবাহী ট্রাক উল্টে প্রায়ই ঘটছে প্রাণহানি। |
| ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়ক | গাজীপুর অংশে ৪ লেনের কাজ বছরের পর বছর ধরে চলায় ধুলা আর অন্তহীন যানজটে মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। |
| উত্তরবঙ্গের সড়কসমূহ | রংপুর-দিনাজপুর ও বগুড়া-নওগাঁ সড়ক বর্ষায় আক্ষরিক অর্থেই ‘নদী’ হয়ে যায়। ফলে কৃষকেরা সময়মতো ফসল বাজারে নিতে পারছেন না। |
| গ্রামীণ সড়ক (LGED) | গ্রামীণ সড়কের অবস্থা আরও শোচনীয়। নিম্নমানের কাজের কারণে নির্মাণের ৫ বছরের মধ্যেই প্রায় ৯০% সড়ক ভেঙে যাচ্ছে। |
উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান: সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (RHD) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের ২১ হাজার ৪৮০ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়কের প্রায় ৪০ শতাংশেরই অবস্থা “খারাপ” থেকে “খুব খারাপ” শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
৫. সড়কের এই বেহাল দশার ৫টি মূল কারণ
কেন আমাদের সড়কগুলো টেকসই হচ্ছে না? গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে ৫টি প্রধান কারণ বেরিয়ে আসে:
- দুর্নীতি ও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী: অনেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ অসমাপ্ত রেখে বা সাব-বেইসে বালির পরিমাণ বেশি ও পিচ কম দিয়ে তড়িঘড়ি কাজ শেষ করে। ফলে এক বছর পার হতে না হতেই সড়ক ধসে যায়।
- রক্ষণাবেক্ষণের তীব্র অভাব: নতুন সড়ক তৈরিতে যতটা উৎসাহ দেখা যায়, পুরোনো সড়ক মেরামতে ততটা উদাসীনতা। বাজেটের সিংহভাগ নতুন প্রকল্পে গেলেও রক্ষণাবেক্ষণে বরাদ্দ থাকে নামমাত্র।
- অতিরিক্ত পণ্য পরিবহন (Overloading): নিয়ম অনুযায়ী ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যানের যে ওজন নেওয়ার কথা, আমাদের দেশে তার চেয়ে ৩ গুণ বেশি ওজন নিয়ে গাড়ি চলে। ফলে একটি সড়কের আয়ুষ্কাল ৫ বছর হলে তা ১ বছরেই নষ্ট হয়ে যায়।
- সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা: সড়ক বিভাগ রাস্তা বানানোর পরদিনই ওয়াসা, বিদ্যুৎ বা গ্যাস কোম্পানি এসে তা খনন করে। এই চিরন্তন সমন্বয়হীনতার খেসারত দিতে হয় জনগণকে।
- জবাবদিহিতা ও শাস্তির অভাব: প্রকল্প সময়মতো শেষ না হলে বা খারাপ কাজ হলে ঠিকাদারদের ব্ল্যাকলিস্ট বা শাস্তির মুখোমুখি করার নজির খুবই কম।
৬. দুর্ভোগের মানবিক ও অর্থনৈতিক পিঠ
একটি ভাঙা সড়ক শুধু গাড়ির কলকব্জাই নষ্ট করে না, এটি একটি দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনকে পঙ্গু করে দেয়।
- স্বাস্থ্যঝুঁকি ও চিকিৎসা সংকট: শাহপুরের একজন মুমূর্ষু রোগীকে খুলনা সদরে নিতে যেখানে ১ ঘণ্টা লাগার কথা, সেখানে লাগছে ৩ ঘণ্টা। ভাঙা রাস্তায় ঝাঁকুনিতে গর্ভবতী মা ও নবজাতকের জীবন বিপন্ন হচ্ছে।
- অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ: খারাপ সড়কের কারণে যানবাহনের জ্বালানি ও যন্ত্রাংশ বাবদ খরচ বাড়ছে, ফলে পরিবহন খরচ প্রায় ৪০% বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষকের সবজি বাজারে পৌঁছানোর আগেই পচে নষ্ট হচ্ছে।
- সড়কে মৃত্যুর মিছিল: বিআরটিএ-এর তথ্যমতে, বিগত বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় ৬ হাজার ৬৫৭ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। যার একটি বড় অংশের নেপথ্য কারণ—রাস্তার মারাত্মক ত্রুটি ও আকস্মিক গর্ত।
৭. সংকট উত্তরণে করণীয়
সরকারের প্রতি আহ্বান:
- ঠিকাদারদের কঠোর জবাবদিহিতায় আনতে হবে। নিম্নমানের কাজ হলে লাইসেন্স বাতিল ও কাজের ন্যূনতম ৫ বছরের ‘ওয়ারেন্টি’ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
- প্রতিটি সড়ক নির্মাণ ও সংস্কার প্রকল্পে ডিজিটাল মনিটরিং ও লাইভ ট্র্যাকিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ সরাসরি অ্যাপের মাধ্যমে অভিযোগ পাঠাতে পারে।
- বাজেটে নতুন প্রকল্প নেওয়ার চেয়ে বিদ্যমান সড়কগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ তহবিল (Maintenance Fund) দ্বিগুণ করতে হবে।
- মহাসড়কগুলোতে কঠোরভাবে ‘এক্সেল লোড কন্ট্রোল’ বা ওজন পরিমাপক স্কেল কার্যকর করতে হবে।
জনগণের ভূমিকা: নষ্ট সড়ক নিয়ে শুধু ভাগ্যকে দোষ না দিয়ে স্থানীয় স্তরে সচেতনতা বাড়াতে হবে। শাহপুরের মতো দেশের সব অঞ্চলের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি প্রদান, শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
৮. উপসংহার: উন্নয়ন ও বাস্তবতার দূরত্ব
একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নের প্রধান মাপকাঠি হলো তার যোগাযোগ ব্যবস্থা। আমরা যখন ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন দেখছি, তখন শাহপুর-দৌলতপুরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বছরের পর বছর ধরে কাদা-পানিতে ডুবে থাকাটা আমাদের জন্য লজ্জাজনক।
দৈনিক পূর্বাঞ্চলের সেই সতর্কবাণী আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক—“যতদিন টেকসই সংস্কার না করা হয় বা অন্তত জরুরি ভিত্তিতে গর্তগুলো ভরাট করে সড়কটি যানবাহনের উপযোগী করা না হয়, বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।”
ডিজিটাল বা স্মার্ট হওয়ার প্রাথমিক শর্তই হলো নাগরিকের মৌলিক স্বস্তি নিশ্চিত করা। একটি ভালো সড়ক মানে কেবল মসৃণ পিচ নয়; একটি ভালো সড়ক মানে একটি শিশুর নিরাপদে স্কুলে যাওয়া, একটি মুমূর্ষু রোগীর প্রাণ বাঁচা, আর একজন কৃষকের মুখে হাসি। আসুন, আমরা মেগা প্রকল্পের জৌলুসের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের যাতায়াতের এই ধমনীগুলোকে সচল করার দাবি তুলি। কারণ, দেশের সড়ক যদি সুস্থ না থাকে, তবে দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়ন কখনোই সুস্থ থাকবে না।



আপনার মতামত লিখুন