ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন: যশোর
✓ যশোর- ৪ দৌড়ে এগিয়ে বিএনপির হেব্বি ওয়েট দুই প্রার্থী আইয়ুব ও মসিয়ুর!
✓ আওয়ামী লীগ পূণর্বাসনের অভিযোগে আইয়ুবের বিকল্প ভাবছে বিএনপি!
✓ দীর্ঘদিন এমপি হওয়ার সুবাদে মাঠ দাপিয়ে বেড়ায় বিএনপি নেতা টিএস আইয়ুব ৫ আগস্টের পর আলোচনায় এগিয়ে মসিয়ুর
✓ রাজনৈতিক শিষ্টাচারের রোষানলে যশোর- ৪
✓ লুটেপুটে খাচ্ছে বিএনপি নেতা টি এস আইয়ুব দম্পতি
যশোর- ৪ (অভয়নগর- বাঘারপাড়া ও বসুন্দিয়া ইউনিয়ন) আসনটি এক সময় আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত থাকলেও দীর্ঘ দিন ধরে এ আসনের মানুষের সেবা করে আসছে বিএনপি নেতা ইঞ্জিনিয়ার টিএস আইয়ুব। তবে, তিনি দীর্ঘদিন মাঠে থাকার সুবাদে দলের জন্য একসময় ব্যায়বহুল অর্থ খরচ করেছেন। যে কারণে এই আসনে এক সময় তার বিকল্প ভাবেনি বিএনপি। কিন্তু বর্তমান সংস্কার বিএনপি যশোর – ৪ আসন নিয়ে নতুন করে ভাবছে বলে দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছেন। স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্র জানায়, এ আসনে এক সময়ের জনপ্রিয় নেতা হলেন টিএস আইয়ুব। বিএনপির ৫ আগস্টের পর তার বিরুদ্ধে বেশ কিছু সাংগঠনিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পেয়েছে। যে কারণে আইয়ুবকে সাংগঠনিক পদে রাখতে চায় বিএনপি। তবে তাকে এমপির টিকিট থেকে বিরত রাখতে পারে দলটি। যেটা নিয়ে সম্প্রতি বিএনপির বিভিন্ন জায়গায় আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে।

জানা যায়, ৫ আগষ্টের আগে এবং পরে রাজনৈতিক নয়, দূর্নীতির মামলায় জেলে ছিলেন আইয়ুব দম্পতি। জুলাই বিপ্লবের পর জেল থেকে বের হয়ে তিনি নিজ চরিত্র পাল্টে ফেলেন। এবং দলীয় নেতাকর্মীদের ভালো পদপদবি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ও ফ্যাসিস্টের দোসরদের শেল্টার দিয়ে রাতারাতি হয়ে উঠেন কোটি টাকার মালিক। অথচ জেলে যাওয়ার আগে তিনি ব্যাপক ভাবে অর্থনৈতিক সংকটে ভোগেন। অভিযোগ উঠে টাকার বিনিময়ে তিনি আওয়ামী লীগ পূণর্বাসনের করছেন এবং রাজনৈতিক পরিচয় না থাকার পরেও নিজ স্ত্রীকে থানা বিএনপির সভাপতি করেছেন। যে কারণে ৫ আগষ্টে রাজপথে থাকা বিএনপি’র একাধিক নেতারা ইঞ্জিনিয়ার টিএস আইয়ুবের ওপর অসন্তোষ প্রকাশ করেন। নিজ দলের নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ থাকার বিষয়টি বুঝতে পেরে আইয়ুব বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের সকল কমিটি রদবদলের জন্য কাজ করতে থাকেন এবং সব জায়গায় নিজের পছন্দের যোগ্যতার থেকে অযোগ্যদের বেশিই দায়িত্ব দেন। তার এমন সিদ্ধান্তে বিরুদ্ধে গেলে এক পর্যায়ে দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাকর্মীদের নামে অসংখ্য মামলা থাকলেও আইয়ুবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় তাঁরাও দলীয় পদপদবি থেকে বঞ্চিত হন। যেটা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা জন্ম হয় এবং কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাও ঘটে। আইয়ুবের রাজনৈতিক এমন বৈষম্যের শিকার অসংখ্য নেতাকর্মীরা জানান, বিএনপিতে এখন সুবিধাবাদীদের অবস্থান। আইয়ুব সাহেব নিজেই যশোর ৪ আসনের মানুষদের হুমকিতে ফেলেছেন। যা দেখার কেউ নেই।
সূত্র জানায়, ৫ আগষ্টের আন্দোলনে মাঠে না থেকেও আইয়ুব দূনীতির মামলায় খালাস পেয়ে নিজ এলাকায় গিয়ে নেতাকর্মীদের কাছ থেকে বন্যায় প্লাবিত মানুষকে সহযোগিতার নামে লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেন। এরপর এই বিষয়টি নিয়ে পত্রপত্রিকায় ব্যাপক ভাবে লেখালেখি হয় এবং আইয়ুবের জন্য সমালোচনায় পড়ে বিএনপি। এছাড়া টিএস আইয়ুব নিজ দলের সহজ সরল নেতাকর্মীদের জিম্মি করে ও তাদের মাধ্যমে দলীয় ও বিভিন্ন ফ্যাসিবাদের দোসরদের কাছ থেকে কর্মসূচির নামে মোট অর্থ চাঁদা বাবদ সংগ্রহ করে নিজ পকেট ভারী করে, নিজেকে মিডিয়াতে জনপ্রিয় নেতা হিসেবে ফোকাস করতে চেষ্টা করে। নিজেকে দলের নেতাকর্মীদের কাছে ভিন্ন রুপে উপস্থাপন করে সংবর্ধনার অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। যদিও তিনি কিসের সংবর্ধনা নিয়েছেন সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপির শীর্ষস্থানীয় এক নেতা। সাংগঠনিক কাঠামোর আওতায় না পড়ায় আইয়ুবের এমন কার্যক্রমে ক্ষুব্ধ হয়ে ডেকে নিয়ে শ্বাসান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। এসময় আব্বাস বলেন, আইয়ুব সাহেব কিসের সংবর্ধনা নিয়েছেন? আর বন্যায় প্লাবিত মানুষের টাকা মেরে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আপনার বিরুদ্ধে সঠিক জবাব কি আছে? দল প্রশ্নবিদ্ধ হয় দয়া করে এমন কার্যক্রম আর করবেন না বলে হুশিয়ারি দেন।

এছাড়া ওই সময় বিএনপি’র শীর্ষ আরেক নেতা বলেন, আইয়ুব ভাই আপনি ৫ আগষ্টের আন্দোলন সংগ্রামের সময় কোথায় ছিলেন? জেলে ছিলেন না কি? তো সেটা কি রাজনৈতিক মামলা? নাকি ঋণ জালিয়াতি না কি চিটিং ? দলের দুঃসময়ে ছিলেন এজন্য আপনাকে আর কিছুই বলতে পারছি না। আমার ঢাকা ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করবেন কবে? যদিও সিনিয়র নেতাদের এমন শ্বাসনে দমেনি বিএনপি’র প্রভাবশালী হয়ে উঠা এই নেতা। বরং আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন আধিপত্য ও দখলবাজির নেশায়। দিন দিন তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগের পাল্লা ভারী হচ্ছে।
দলীয় সূত্র ও অভিযোগের তথ্য মতে জানা যায়- ৫ আগস্টের পর আইয়ুব নিজের প্রয়োজনে দলকে ব্যবহার করছেন এবং রাজপথের নেতাকর্মীদের তেমন পাত্তা দিচ্ছেন না। যে কারণে যশোর- ৪ আসন থেকে আগামী সংসদ নির্বাচনের জন্য বিএনপি ক্লিন ইমেজের নেতাকে সামনে আনতে চাইচ্ছেন। সম্প্রতি এই আসনের দলীয় নেতাদের নিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে বেশ কিছু আলামত জমা পড়েছে। বিএনপির লন্ডন ও গুলশান কার্যালয়ের একাধিক সূত্র গণমাধ্যমকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ওই সূত্রটি জানায়, আইয়ুব যশোর- ৪ আসনের ইমেজসম্পন্ন বিএনপি নেতাদের সাথে বৈষম্যমূলক আচারণ করছে ও তাদের মাইনাস করতে টাকা দিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে নিজ দলের ত্যাগীদের অবমূল্যায়ন ও মিডিয়া ম্যানেজ করে গুজব রটাচ্ছেন। যেটা সাংগঠনিক কাঠামোর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। যা নিয়ে বিক্ষুব্ধ বিএনপি’র হাইকমান্ড। সম্প্রতি বেপরোয়া হাওয়ায় আইয়ুব ও তার স্ত্রী মিসেস তানিয়া রহমান সুমির একক আধিপত্যের বিষয়টি আমলে নিয়ে সাংগঠনিক ভাবে বিশ্লেষণ ও তদন্তে নেমেছে বিএনপির ৫ বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি। যদিও এসব বিষয়ে আইয়ুব কিছুটা অবগত। তবে, আইয়ুবের শক্তি হলো টাকা, বিএনপির কিছু কেন্দ্রীয় নেতা ও স্থায়ী কমিটির দুই সদস্যদের ম্যানেজ করে মোটা অংকের টাকা দিয়ে তারেক রহমানের কাছে নিজেকে যোগ্য বলে বিবেচনায় আসতে চাইছেন।
তথ্য মতে ও বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে জানা গেছে, আইয়ুব যে কোনো মূল্যে নিজে এমপি হওয়ার টিকিট অথবা স্ত্রীকে এমপি করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। এজন্য বৈধ্য ও অবৈধ পথে হাঁটছেন। এক সময়ের যশোর- ৪ আসনের জনপ্রিয় এই নেতা হঠাৎ করে অসাধু হয়ে উঠলো কেনো এমন প্রশ্ন অনেকের মনে । যদিও তিনি বেশ কয়েক মাস ধরে দূর্নীতি, অনিয়ম, টাকা ওয়ালা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পূণর্বাসন, এবং রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়নের কারণে এমপির টিকিট নাও পেতে পারেন এটা ভেবে স্ত্রীকে ৫ আগষ্টের পরে স্থানীয় বিএনপি’র নেতাদের মতামতের বাইরে গিয়ে জোরজবরদস্তি করে প্রতিষ্ঠিত করতে মরিয়া এবং তার স্ত্রীর যোগ্যতা না থাকার স্বত্বেও রাজনৈতিক মাঠে এলাকার শীর্ষ দলীয় পদে বসিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ছেন। নানা বিষয় নিয়ে বিতর্কিত হচ্ছেন বিএনপির এই নেতা। শুধু এখানেই শেষ নয়, তিনি স্ত্রীকে দলের শীর্ষ পদে রাখতে দীর্ঘদিন রাজপথে না থাকা সুযোগসন্ধানী বিএনপি নেতা শামসুর রহমানকে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পদে একক প্রার্থীকে তথাকথিত ভোটের মাধ্যমে দায়িত্ব দেন।
জানা যায়, দেশে স্বাধীনের পর এই আসন থেকে ১২টি নির্বাচনে ৮ টিতেই বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর পাল্টে গেছে এই আসনের ভোটের সমীকরণ। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হতে চায় বিএনপি। পিছিয়ে নেই জামায়াতে ইসলামীও। একক প্রার্থী নিয়ে জোরেশোরে মাঠে নেমেছে দলটির নেতাকর্মীরা। যদিও জামায়াতের গ্রহণ যোগ্যতা মাঠে তেমনটা দেখা না গেলেও গোপনে কাজ করছে দলটির নেতাকর্মীরা। সূত্র জানায়, এই আসন থেকে বিএনপির ৫ নেতা দৌড়ঝাঁপ করছেন। দীর্ঘদিনের জোট মিত্র বিএনপি-জামায়াত এবার প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। সেই হিসাবে ভোটের হিসাবনিকাশ ভিন্ন হতে পারে। সম্ভাব্য এমপি প্রার্থীরা ব্যানার-ফেস্টুন টাঙিয়ে সভা-সমাবেশ, মতবিনিময়, গণসংযোগ, বস্ত্র ও ত্রাণ বিতরণ প্রভৃতি কর্মসূচিতে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় পল্টন অফিসের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, যশোর- ৪ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীর তালিকায় অন্তত ৫ জনের নাম শোনা যাচ্ছে। এরমধ্যে প্রথম হলেন – বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও কৃষক দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার টিএস আইয়ুব। তিনি দীর্ঘদিন ধরে এলাকার মানুষের সেবা করে আসছেন। তবে ৫ আগস্টের পর প্রশ্নবিদ্ধ। দ্বিতীয় ব্যক্তি হলেন- বাঘারপাড়া উপজেলা বিএনপি সিনিয়র যুগ্ম-আহবায়ক ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মসিয়ুর রহমান। মসিয়ুর নম্র, ভদ্র, বিনয়ী মানুষ। তিনি সব সময় নিরব থাকেন উশৃঙ্খল নয়। এছাড়া জুলাই আগস্টে ফ্যাসিস্ট বিদায় আন্দোলনের অন্যতম ভূমিকা পালন করেছেন। এ পদে ৩ নম্বরে যার নাম আসছে তিনি হলেন – অভয়নগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ফারাজী মতিয়ার রহমান। তিনি বেশ জনপ্রিয় এবং ইমেজসম্পন্ন মানুষ। আইয়ুবের সাথে তার রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আছে বলে জানা গেছে। তিনি এমপি হতে ব্যাপক দৌড়ঝাঁপ করছেন। ৪র্থ নম্বরে যার নাম আসছে তিনি হলেন – বাঘারপাড়া পৌর বিএনপির সভাপতি ও সাবেক মেয়র আবদুল হাই মনা। মনা নিজেই টিএস আইয়ুবকে রাজনীতিতে আনছে এমনটায় জানালেও তিনি শেষ বয়সে একবার হলেও এমপির টিকিট চাইছেন। এছাড়া ৫ম নম্বরে যার নাম আসছে তিনি হলেন- জাতীয়তাবাদী যুবদল ঢাকা মহানগর দক্ষিণের যুগ্ম আহ্বায়ক ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট নূরে আলম সিদ্দিকী সোহাগ।

দলীয় সূত্রে মতে ও যশোর- ৪ আসনের একাধিক বিএনপি’র নেতাকর্মীরা জানান, প্রথমে এমপি পদে একাই আলোচনায় শীর্ষ ছিলেন বিএনপি নেতা ইঞ্জিনিয়ার টিএস আইয়ুব। আইয়ুব দীর্ঘ ২০-৩০ বছর মাঠ চষে বেড়ালেও ৫ আগষ্টের সরকার পতনের আন্দোলনে আগে ও পরে তার ভূমিকা অনেকটা নিষ্ক্রিয়। এবং দীর্ঘদিন ক্ষমতায় না থাকায় লোভ লালসার কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছেন। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির এই নেতা অর্থনৈতিক সংকটে থাকায় দলীয় নেতাকর্মীদের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা দল পরিচালনার বাবদ ধার ও ব্যবসায়ী বাবদ ধার নিলেও এ পর্যন্ত কারো টাকা নিজ ইচ্ছায় ফেরত দেননি বলে অভিযোগ আছে।
জানা গেছে, আইয়ুব সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আবু তাহের সিদ্দিকীর কাছ থেকে এক সময় লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়েছেন যা ফেরত দেননি। এমনকি একটি বিশেষ কাজে ও উপজেলা পর্যায়ের নির্বাচনের সময় এই আসনের আওয়ামী লীগের এমপি বাবু রণজিত কুমারের কাছ থেকেই গোপনে মোটা অর্থ নিয়ে তাকে বিভিন্ন সুবিধা দেন। বর্তমান ধলগ্রাম বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল ইসলাম মোর্শেদের কাছ থেকেই ১০ বছর আগে কোনো এক সময় পদপদবি দেওয়া ও ব্যাবসায়িক কথা বলে ৩ লক্ষ টাকা ধারদেনা করেন। এক সময় মোর্শেদ বাঘারপাড়া বিএনপি’র একাধিক নেতাদের কাছে এসব কথা বলতেন। এজন্য মঞ্জুরুল মোর্শেদকে পুরাতন ঋণ পরিশোধ হিসেবে ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পদের দায়িত্ব দেন। শুধু মঞ্জুরুল মোর্শেদ নয়, এমন অসংখ্য বিএনপি নেতাকর্মীদের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা দলীয় খরচ বাবদ হাতিয়ে নিয়েছেন বিএনপি এই নেতা। এসব কারণে আইয়ুব যশোর- ৪ ও বিএনপিতে সমালোচনার শিকার। আইয়ুবের নির্বাচনী এলাকার সাধারণ মানুষ বলেছেন – আইয়ুব সাহেব হয়তো সংকটে পড়ে খুব কম সংখ্যক লোকের সঙ্গে এমনটা করেছেন। অন্যথায় এমনটা হওয়ার কথা নয়। তবে তার বিরুদ্ধে ৫ আগষ্টের পরে জোরজবরদস্তি দখল ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ অস্বীকার করা যায় না।
দলীয় সূত্রে ও বিভিন্ন তথ্য মতে জানা গেছে, আইয়ুব দুদকের মামলায় জেলে থাকায় এই আসনের মানুষের সুখে দুঃখে দীর্ঘদিন পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টায় ছিলেন প্রয়াত বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলামের ভক্ত ও তার ছেলে খুলনা বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা এবং তার মা সদ্য বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান নার্গিস বেগমের সমর্থক বিএনপি নেতা মসিয়ুর রহমান ও আবদুল হাই মনা। এরমধ্যে মসিয়ুরকে এলাকার সাধারণ মানুষ নম্র, ভদ্র, বিনয়ী বলে জানেন। তার নামে প্রায় ৩০ টির মতো মামলা। তাকে মোট ৬ বার কারাবদ্ধ করেছে। মসিয়ুরের কপাল খুলছে দীর্ঘদিন কয়েকবার জেলে থাকা ও গেল বছরের ২৮ অক্টোবর বিএনপির সরকার পতনের এক দফা দাবির কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে কাকরাইল ও বিচারপতির বাস ভবনের সামনে পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মাধ্যমে এবং সর্বশেষ ৫ আগষ্টে আওয়ামী সরকার পতনের আন্দোলনে সরাসরি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় বিশেষ দায়িত্ব পালন করার মাধ্যমে। এছাড়া স্বচ্ছ থাকায় তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। তবে জানা যায়, তাকে এমপি পদে প্রার্থী হওয়ার পিছনে বড় সাপোর্ট দিচ্ছেন খুলনা বিভাগের বিএনপির এক প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যরা।

সূত্র জানায়, মসিয়ুরকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ক্লিন ইমেজের মানুষ হিসাবে চেনেন এবং বিভিন্ন সময় তার সার্বিক বিষয়ে সুনজরে রেখে নানা মাধ্যমে খোঁজ খবর রাখছেন। যদিও তারেক রহমান এরআগে বলেছেন- দলীয় অনেক নেতারা এমপির টিকিট পাবেন না। যদিও কেউ এমপির টিকিট পান সেক্ষেত্রে তাকে দলীয় পদ ছাড়তে হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যশোর – ৪ আসনে বিএনপি নেতা ইঞ্জিনিয়ার টিএস আইয়ুবকে সর্বশ্রেণীর মানুষ এক সময় ভালো বাসলেও বর্তমান তাকে সবাই ভয় পাচ্ছেন। তিনি আগের মতো কাউকে মূল্যয়ন করছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। একারণে মসিয়ুরকে সুনজরে দেখছেন অত্র এলাকার সাধারণ মানুষ। যেটা হয়তো মসিয়ুরের জন্য রাজনৈতিক কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন বাঘারপাড়া অভয়নগরের মানুষ।
তাদের দাবি – বিএনপি নেতা আইয়ুব এই আসন থেকে কাউকে মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে দেননি এবং দিবেও না। অনেক বছর আগে এই আসন থেকে বিএনপির পক্ষে এমপি হতে চাইছিলেন ব্যারিস্টার ওমর শাহাদাত। পরে তার নেতাকর্মীও সমর্থকদের সঙ্গে আইয়ুব গ্রুপের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে অনেক মানুষ আহত হন। তিনি নিয়মিত পেমেন্ট করে বিএনপির বেশ কিছু কেন্দ্রীয় নেতাদের বসে রেখে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করেছেন।
অন্যদিকে এই আসন থেকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একক প্রার্থী হিসাবে মাঠে দৌড়াচ্ছে যশোর জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক গোলাম রসূল। এছাড়াও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের আইন বিষয়ক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট জহুরুল হক জহির, বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবীর জাহিদ, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টির (বিএমজেপি) সভাপতি সুকৃতি কুমার মন্ডল, ইসলামী আন্দোলনের অ্যাডভোকেট বায়েজিদ হোসেন ও অধ্যক্ষ নাজমুল হুদা এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা মাসুম বিল্লাহর নাম শোনা যাচ্ছে। যদিও এরমধ্যে অনেক প্রার্থী যোগ্যতাসম্পন্ন নয় বলে এলাকাবাসীর দাবি। অনেকেই নাম মাত্র এমপি পদে আলোচনায় আসছে।
অত্র এলাকার সাধারণ মানুষ আক্ষেপ করে বলেন, যদি ভাগ্যক্রমে আইয়ুবের বদলে বিএনপি নেতা মসিয়ুর কোনো ভাবেই মনোনয়ন পান সেই ক্ষেত্রে মশিউর বড় একটি ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে। এর কারণ হলো তিনি ৫ আগস্টের সরকার পতনের আন্দোলনের পর অত্র এলাকার চুরি ডাকাতি লুটপাট ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে ছিলেন এবং সাধারণ অনেক হিন্দু মুসলিম পরিবারের নিরাপত্তার জন্য পাড়া মহল্লায় একটি কমিটি গঠন করে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
জানা যায়, যশোরের অভয়নগর ও বাঘারপাড়া উপজেলা এবং সদরের বসুন্দিয়া ইউনিয়ন নিয়ে যশোর-৪ আসন গঠিত। দুটি উপজেলা, দুটি পৌরসভা এবং ১৮টি ইউনিয়নের এ আসনের মোট ভোটার ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৮৫৪ জন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ আসনে ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের শাহ হাদিউজ্জামান, ১৯৭৯ সালে বিএনপির নাজিম উদ্দিন আল আজাদ, ১৯৮৬ সালে শাহ হাদিউজ্জামান, ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির নাজিম উদ্দিন আল আজাদ, ১৯৯১ সালে শাহ হাদিউজ্জামান, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপির নজরুল ইসলাম, ১৯৯৬ সালে শাহ হাদিউজ্জামান এবং ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের জাপার (নাফি) এমএম আমিন উদ্দিন বিজয়ী হন। এরপর ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে টানা চারবার আওয়ামী লীগের রণজিত কুমার রায় নির্বাচিত হন।

এবার আসনটিতে বিএনপির অন্যতম প্রার্থী কেন্দ্রীয় নেতা প্রকৌশলী টিএস আইয়ুব। ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে তিনি মাত্র ৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে নৌকার কাছে হেরে যান। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তিনি ধানের শীষের মনোনয়ন পেয়েছিলেন। তবে সেই নির্বাচনেও পরাজিত হন। এবারও তিনি সম্ভাব্য প্রার্থী হিসাবে জোরেশোরে প্রচারণায় রয়েছেন। তার বিকল্প হিসাবে ভোটের মাঠে সরব আছেন অভয়নগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ফারাজি মতিয়ার রহমান, বাঘারপাড়া পৌর বিএনপির সভাপতি আবদুল হাই মনা এবং যুবদল নেতা অ্যাডভোকেট নূরে আলম সিদ্দিকী।
এ বিষয়ে প্রকৌশলী টিএস আইয়ুব গণমাধ্যমকে বলছেন, গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে ছিলাম। আমার নামে ৩৪টি মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা হয়েছে। অন্তত আটবার কারাবরণ করেছি। দল ত্যাগী ও নিবেদিতদের মূল্যায়ন করবে বলে আশাবাদী। তিনি বলেন, দুঃসময়ে যাদের দেখা যায়নি, তাদের অনেকেই এখন অতিথি পাখির মতো দলের মনোনয়ন পেতে চায়। এদের বিষয়ে তৃণমূল সতর্ক আছে।
সত্যতা যাচাই করে দেখা গেছে যে আমার নামে ১১টি তার মধ্যে নাশকতা মামলা ৭টি ও দুদকের মামলা ৪টি। সে মোট ৪ বার কারাবরণ করেছি।
এ বিষয়ে বাঘারপাড়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম-আহবায়ক ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মসিয়ুর রহমান বলেছেন, আমাদের আসন নিয়ে বিএনপি নেতা ইঞ্জিনিয়ার টিএস আইয়ুব দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। তিনি এমপি হওয়ার যোগ্যতা রাখে। তবে রাজধানী হলো ভাগ্যের ব্যাপার। যার ভাগ্যে এমপির টিকিট জুটবে সেই যশোর- ৪ আসনের অভিভাবক হবেন। এক্ষেত্রে দলীয় সিদ্ধান্ত যেটাই আসবে আমরা সেটাই মেনে নিবো।
এ বিষয়ে ফারাজী মতিয়ার রহমান বলেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনে দ্বিতীয় প্রার্থী হিসাবে দলের মনোনয়ন পেয়েছিলাম। আশা করি এবার দলের মনোনয়ন পাব। সম্ভাব্য প্রার্থী হিসাবে মাঠে আছি। সাধারণ মানুষের পাশে থেকে কাজ করছি। বিগত সরকারের আমলে আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে ছিলাম। ২৭টি মামলার আসামি হয়েছি। কয়েকবার কারাবরণ করেছি।
অ্যাডভোকেট নূরে আলম সিদ্দিকী সোহাগ বলেন, ঋণখেলাপি, দুর্নীতির অভিযোগ আছে-এমন কাউকে দল মনোনয়ন দেবে না বলে জানিয়েছে। সেক্ষেত্রে ক্লিন ইমেজের তরুণ ও ত্যাগী নেতারা মনোনয়ন পাবেন। আমি ১৭ বছর আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে ছিলাম। জেল, জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছি। এলাকার মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছি। আমি মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।
জেলা জামায়াতে ইসলামীর প্রচার সম্পাদক অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন বিশ্বাস বলেন, এ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসাবে জেলা আমির অধ্যাপক গোলাম রসূল প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি নিয়মিত এলাকায় নানা কর্মসূচি পালন করছেন। দীর্ঘদিন প্রকাশ্যে আমরা কর্মসূচি পালন করতে না পারলেও অভ্যন্তরীণ কাজ করেছি। জনগণের সঙ্গে আমাদের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। আমরা জনগণের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি।



আপনার মতামত লিখুন