হাসিনা পারভীনের দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা
সংগ্রাম, সততা ও মানুষের পাশে এক নারী
দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার প্রত্যন্ত দৌলতপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া হাসিনা পারভীন, যিনি মোছাম্মদ হোসনেয়ারা বেগম নামেও পরিচিত, স্থানীয় রাজনীতি ও সমাজসেবায় এক সুপরিচিত নাম। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের পাশে থেকে কাজ করে গেছেন। রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, আর্থিক সংকট এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তার অবিচল পথচলা আজ তাকে এলাকার মানুষের আস্থার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পাস করার পর থেকেই হাসিনা পারভীন সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে নিজেকে যুক্ত করেন। অল্প বয়স থেকেই মানুষের জন্য কিছু করার দৃঢ় ইচ্ছাই তাকে রাজনীতি ও জনসেবার পথে নিয়ে আসে। দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার দৌলতপুর গ্রামে তার জন্ম। এই প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উপজেলা সদর প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে, আর সেই পথও ছিল দীর্ঘদিন ভাঙাচোরা কাঁচা রাস্তা। তবুও মানুষের সেবা করার অদম্য মানসিকতা থেকেই তিনি প্রতিদিন হেঁটে এই পথ অতিক্রম করে উপজেলা সদরে যাতায়াত করতেন।
রাজনৈতিক জীবনে তার পথচলা শুরু হয় তৃণমূল থেকে। ১৯৮০ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তিনি ইউনিয়ন মহিলা সংগঠনের সভানেত্রী এবং জাতীয়তাবাদী রাজনীতির একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি ফুলবাড়ী উপজেলার মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং ১৯৯৬ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা প্রায় তিন দশক এই পদে থেকে সংগঠনকে সুসংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রাজনীতির পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনিক ও সমবায় ক্ষেত্রেও তার অবদান উল্লেখযোগ্য। ২০১৪ সালে তিনি ফুলবাড়ী উপজেলার সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি ফুলবাড়ী মহিলা কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন, যেখানে নারীদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে তিনি নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
বর্তমানে ফুলবাড়ী উপজেলায় মহিলা দলের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সেখানে সভাপতি পদে তিনি প্রার্থী হয়েছেন। স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতে, দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, তৃণমূল পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা এবং নিষ্ঠার কারণে তার বিজয়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বল। হাসিনা পারভীনের রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার সততা ও আদর্শিক দৃঢ়তা। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি কখনো দুর্নীতির আশ্রয় নেননি বলে স্থানীয়রা দাবি করেন। অনেকেই বলেন, যদি তিনি ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দিতেন, তবে আজ তার জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত। কিন্তু তিনি বরাবরই মানুষের কল্যাণকে নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন। তার কর্মক্ষেত্রের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে আদিবাসী ও সনাতন ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠী। এই সব সম্প্রদায়ের মানুষের কল্যাণে তিনি দীর্ঘদিন কাজ করে আসছেন। শিক্ষা, সামাজিক অধিকার এবং বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের চাপ ও নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখিও তাকে হতে হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ফুলবাড়ী-পার্বতীপুর এলাকার তৎকালীন সংসদ সদস্য এবং জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার তাকে দল পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন প্রলোভন দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে তিনি নিজের রাজনৈতিক আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। পরবর্তীতে তাকে বিভিন্ন মামলার মাধ্যমে হয়রানিরও শিকার হতে হয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেন। এলাকার অনেক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মতে, দীর্ঘদিনের এই ত্যাগ, সংগ্রাম এবং সংগঠন গড়ে তোলার ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে তাকে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনে মনোনয়ন দেওয়া হলে তা দল ও এলাকার জন্য ইতিবাচক হবে। তাদের মতে, তৃণমূল থেকে উঠে আসা এই নেত্রী সংসদে প্রতিনিধিত্ব করলে স্থানীয় মানুষের কণ্ঠস্বর আরও শক্তভাবে প্রতিফলিত হবে। রাজনীতির কঠিন বাস্তবতায় যেখানে ব্যক্তিগত স্বার্থ অনেক সময় আদর্শকে ছাপিয়ে যায়, সেখানে হাসিনা পারভীনের মতো নেত্রীদের গল্প ভিন্ন এক বাস্তবতার কথা বলে। তার দীর্ঘ পথচলা যেন মনে করিয়ে দেয়—রাজনীতি শুধু ক্ষমতার খেলা নয়, বরং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক অনবরত অঙ্গীকার।



আপনার মতামত লিখুন