মুনিয়ার মৃত্যু: পাঁচ বছরেও মেলেনি ন্যায়বিচারের উত্তর
২০২১ সালের এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহ। রাজধানীর গুলশানের এক অভিজাত ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে পুলিশ যখন ভেতরে ঢোকে, তখন সিলিং ফ্যানে ঝুলছিল একুশ বছরের এক তরুণী। নাম মোসারাত জাহান মুনিয়া। কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। বই-খাতা, ডায়েরি আর অসমাপ্ত স্বপ্ন ফেলে চলে গিয়েছিল সে। চার বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু সেই মৃত্যুর ফাইলটা আজও বন্ধ হয়নি। বরং বারবার খুলছে, আবার আটকাচ্ছে। কারণ প্রশ্ন একটাই—একজন নারী যদি অন্তসত্ত্বা অবস্থায় মারা যান, তাহলে তিনি বিচার পাবেননা কেন? যদি বিচার না হয় তাহলে মানবিকতা কোথায় থাকে?
আমি সাংবাদিকতা করি আশির দশক থেকে। শিল্প-সাহিত্য-আদালত-থানা—সব দেখেছি। কিন্তু মুনিয়ার ফাইলের কথা মনে পড়লে বুকের ভেতর কেমন যেনো হিম হয়ে আসে। এটা শুধু একটা মৃত্যুর খবর না। এটা রাষ্ট্র, আইন আর প্রভাবের সামনে সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বের দলিল।
২০২১ সালের ২৬ এপ্রিল। পুলিশের খবর পেয়ে গুলশান থানা ছুটে যায়। ফ্ল্যাটের মালিক ছিলেন ইব্রাহিম আহমেদ রিপন। ঘরের এক কোণে পড়ে ছিল মুনিয়ার ডায়েরি। সেই ডায়েরির পাতায় সম্পর্ক, প্রতিশ্রুতি আর ভয়ের কথা লেখা ছিল।
পরদিন মুনিয়ার বড় বোন নুসরাত জাহান তানিয়া গুলশান থানায় একটি মামলা করেন। অভিযোগ— আত্মহত্যায় প্ররোচনা। যার নাম এলো, তিনি দেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিন মাসের মাথায়, ২০২১ সালের জুলাইয়ে পুলিশ তদন্ত শেষে বলে— তার সম্পৃক্ততা মেলেনি। আদালত সেই চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে নেয়।
এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত। কিন্তু মুনিয়ার পরিবার মানতে পারেনি। কারণ ময়নাতদন্ত আর ফরেনসিক রিপোর্টে অন্য কথা বলা ছিল। শরীরে পুরুষের জৈবিক আলামত পাওয়া গিয়েছিল। আর সবচেয়ে বড় কথা—মৃত্যুর সময় মুনিয়া প্রায় তিন সপ্তাহের অন্তসত্ত্বা ছিলেন।
২০২১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। নুসরাত জাহান তানিয়া ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮-এ নতুন মামলা করেন। এবার অভিযোগ সরাসরি—ধর্ষণ ও শ্বাসরোধে হত্যা। আসামি আটজন। প্রধান আসামি সেই ব্যবসায়ী সায়েম সোবহান আনভীর এমডি, বসুন্ধরা গ্রুপ। বাকিদের মধ্যে ছিলেন তার পরিবারের সদস্য, ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান ও তার স্ত্রী, দু’জন মডেল, ফ্ল্যাটের মালিক ও তার স্ত্রী।
আদালত তদন্তের ভার দিল পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন, পিবিআই-কে। পিবিআই ঢাকা মেট্রো সাউথ অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগ কাজ শুরু করল। দেড় বছর পর, ২০২২ সালের ২২ অক্টোবর তারা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। রিপোর্টে বলা হয়—অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। সবাইকে অব্যাহতি দেওয়া হলো।
২০২৪ সালের ২০ মার্চ ট্রাইব্যুনাল-৮ সেই প্রতিবেদন মেনে নিল। মামলা খারিজ। প্রধান আসামিসহ সবাই আইনের চোখে নির্দোষ হয়ে গেলেন। মুনিয়ার বোনের করা ‘নো-কনফিডেন্স’ পিটিশনও নাকচ হলো।
রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পট বদলায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। তারপর আইনি লড়াইয়ে নতুন মোড়। নুসরাত জাহান তানিয়া হাইকোর্টে আপিল করেন। বলেন— নিম্ন আদালত ভুল করেছে। পিবিআই-এর রিপোর্টে যথেষ্ট আলামত ছিল, তবু বিচার হয়নি।
২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর। বিচারপতি শহীদুল করিম ও বিচারপতি মো. আতাবুল্লাহর ডিভিশন বেঞ্চ আপিল গ্রহণ করে নেন। আদেশ—নিম্ন আদালতের খালাস বাতিল। মামলা পুনরুজ্জীবিত।
আইনজীবী ব্যারিস্টার এম সরওয়ার হোসেন আদালতের বাইরে সাংবাদিকদের বলেন, পিবিআই-এর নিজস্ব রিপোর্টেই বিচারের উপাদান ছিল। তিনি আশা প্রকাশ করেন, হাইকোর্ট পুলিশকে নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দেবে।
এই আদেশের পর মুনিয়ার ফাইলটা আবার খুললো। মৃত একটা মামলা আবার কথা বলতে শুরু করল।
হাইকোর্ট মামলা ফেরাল, কিন্তু তদন্ত এগোল না। বরং থেমে গেল কাগজের ভারে।
২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত ঢাকার আদালত পিবিআইকে ১৬ বার সময় দিয়েছে রিপোর্ট জমা দেওয়ার জন্য। ২১ নভেম্বর ২০২৪, তারপর ২৮ ডিসেম্বর ২০২৪, তারপর একের পর এক তারিখ। তদন্ত কর্মকর্তা গোলাম মোক্তার আশরাফউদ্দিন একবারও চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেননি।
১ আগস্ট ২০২৫-এ হলো ১৫তম ব্যর্থতা। ২৩ আগস্ট ২০২৫-এ আদালত ১৬তম বার সময় দিল। সর্বশেষ তারিখ ধরা হলো ২০ এপ্রিল ২০২৫।
একটা মামলা, একটা মৃত তরুণী, আর এক বছরের অপেক্ষা। এই অপেক্ষার নাম কী? বিচার, নাকি কালক্ষেপণ?
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮ আর চুপ করে বসে থাকতে পারল না। ২০২৫ সালে তারা পিবিআই-এর তদন্ত কর্মকর্তাকে তলব করল। চারটি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল আদালত:
এক. প্রধান আসামিকে এখনও গ্রেপ্তার করা হলো না কেন?
দুই. তার ডিএনএ নমুনা মুনিয়ার শরীর বা কাপড়ের সাথে কেন মেলানো হলো না?
তিন. মুনিয়া দুই থেকে তিন সপ্তাহের অন্তসত্ত্বা ছিলেন—এই তথ্য তদন্তে কেন গুরুত্ব পেল না?
চার. ঘটনার দিনের ফ্ল্যাটের সিসিটিভি ফুটেজ কোথায়?
এই প্রশ্নগুলোই বলে দেয়, তদন্ত কতটা অসম্পূর্ণ ছিল। একজন নারী মারা গেলেন। তিনি অন্তসত্ত্বা ছিলেন। কিন্তু ডিএনএ টেস্ট হলো না, সিসিটিভি খোঁজা হলো না, গ্রেপ্তার হলো না। তবে তদন্ত হলো কোথায়?
মামলার আট আসামির ভাগ্য আলাদা হয়ে গেল।
মডেল ফারিয়া মাহবুব পিয়াশা। তাকে মুনিয়া মামলায় দুই দিন রিমান্ডে নেওয়া হয়। তিনি এখন কারাবন্দী। তার বিরুদ্ধে মাদক মামলাও আছে। সাইফা রহমান মিম—তাকেও পিবিআই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গ্রেপ্তার করে। তিনিও কারাগারে।
আনভীরের স্ত্রী সাবরিনা সায়েম ও ফ্ল্যাটের মালিক ইব্রাহিম আহমেদ রিপন হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন পান।
প্রধান আসামি সায়েম সোবহান আনভীর। ২০২১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় তার আগাম জামিনের আবেদন নাকচ করে। পরে ধর্ষণ-হত্যা মামলায় পিবিআই তাকে অব্যাহতি দেয়। ২০২৪-এ খালাসের পর হাইকোর্ট মামলা ফেরালেও এখনও গ্রেপ্তার বা নতুন জামিন শুনানির খবর নেই।
এই বৈপরীত্য চোখে লাগে। একজন বাইরে, দুজন ভিতরে। অথচ অভিযোগ একই মামলার।
২০২৪ সালের ২০ আগস্ট। জাতীয় প্রেস ক্লাব। মুনিয়ার বোন সংবাদ সম্মেলন ডাকলেন। অভিযোগের সুর ছিল তীব্র।
তিনি বলেন, বিগত সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী এবং সাবেক আইজিপি প্রভাব খাটিয়ে তদন্ত থামিয়ে দিয়েছিলেন। এমনকি মামলা তুলে নিতে ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত প্রস্তাব এসেছিল তাদের কাছে। তিনি আরও বলেন, মুনিয়া বেঁচে থাকতে তাকে বলেছিল—”আনভীর আমাকে মেরে ফেলবে”।
এই কথাগুলো আদালতের কাগজে নেই। কিন্তু মানুষের কানে আছে। যখন একজন বোন বলে—আমার বোন ভয় পেত, তখন রাষ্ট্রের উচিত সেই ভয়কে গুরুত্ব দেওয়া।
মামলার সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গা এটাই। ফরেনসিক রিপোর্ট বলছে—মুনিয়া মৃত্যুর সময় অন্তসত্ত্বা ছিলেন।
একজন নারী। একা। রাজধানীতে পড়তে এসেছেন। প্রেম-সম্পর্ক-প্রতিশ্রুতির জালে জড়িয়েছেন। তারপর জানতে পারলেন তিনি মা হতে চলেছেন। এরপরই তার মৃত্যু।
আমাদের সমাজে অন্তসত্ত্বা নারীকে ঘিরে যে নীরবতা, যে লজ্জা, যে বিচার— সেটা মুনিয়ার বেলায়ও কাজ করেছে কি না, প্রশ্নটা থেকেই যায়। আদালত যখন জিজ্ঞেস করে “ডিএনএ মেলানো হলো না কেন”, তখন সেই প্রশ্নের ভেতর লুকিয়ে থাকে আরেকটি প্রশ্ন—অন্তসত্ত্বা নারীর অধিকার কোথায়?
ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেলে, গর্ভের কথা উঠে এলে, তদন্তের গতি কেন থেমে যায়? এই নীরবতাই কি মানবিকতার পরাজয় নয়?
একটা কথা পরিষ্কার করে বলা দরকার। ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মামলাটি বিচারাধীন। হাইকোর্ট আপিল গ্রহণ করেছে মাত্র। চূড়ান্ত শুনানি হয়নি। নতুন তদন্তের নির্দেশ এসেছে, কিন্তু রিপোর্ট জমা পড়েনি।
আইনের ভাষায়—যতক্ষণ আদালত দোষী না বলছে, ততক্ষণ সবাই নির্দোষ। প্রধান আসামি, তার পরিবার— সবার জন্য এটা প্রযোজ্য।
কিন্তু আইনের প্রক্রিয়া যদি এক বছর ধরে আটকে থাকে, যদি ১৬ বার তারিখ পেরিয়ে যায়, যদি গ্রেপ্তার না হয়, ডিএনএ না হয়—তাহলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে। সেই প্রশ্নের উত্তর আদালতকেই দিতে হবে।
মুনিয়ার মৃত্যু ২০২১-এ। আজ ২০২৬। ৫ বছর পার। একটা পরিবার বিচার চেয়ে ক্লান্ত। একটা মামলা কাগজ থেকে কাগজে ঘুরছে।
ছাত্রীদের বলি—ন্যায়বিচারের জন্য লড়তে হবে। কিন্তু মুনিয়ার ফাইল দেখলে মনে হয়, লড়াইটা খুব একতরফা। একদিকে রাষ্ট্রের মেশিনারি, প্রভাব, আইনজীবী। অন্যদিকে একজন বোন আর তার বোনের ডায়েরি।
অন্তসত্ত্বা একজন নারীর মৃত্যু মানে দু’টি জীবনের অবসান। আইন যদি সেই দু”টি জীবনের কথাও না শোনে, তবে আমরা কোন সমাজে বাস করছি?
মুনিয়া ফিরবে না। তার পড়ার টেবিল, তার ডায়েরি, তার অসমাপ্ত স্বপ্ন—সব অতীত। কিন্তু প্রশ্নগুলো থেকে যায়।
কেন অন্তসত্ত্বা নারীর মৃত্যুতে ডিএনএ টেস্ট অগ্রাধিকার পায় না?
কেন সিসিটিভি ফুটেজ চাওয়া হয় দেরিতে?
কেন প্রধান আসামি গ্রেপ্তার হয় না, আর অন্যরা কারাগারে যায়?
কেন পিবিআই ১৬ বার সময় নিয়েও রিপোর্ট দিতে পারে না?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত বলতে হবে—আমাদের মানবিকতা অসহায়। আইন আছে, আদালত আছে, ফাইল আছে। কিন্তু একজন অন্তসত্ত্বা নারীর জন্য ন্যায়ের নিশ্চয়তা আছে কি?
মুনিয়ার বোন আজও আদালতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে। তার হাতে ফাইল। চোখে জল। আর আমাদের হাতে শুধু অপেক্ষা।
মানুষ বাঁচে ন্যায়ের আশায়। মুনিয়ার মৃত্যু যদি সেই আশাটুকুও কেড়ে নেয়, তবে সেটাই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় পরাজয়।



আপনার মতামত লিখুন