আমার চোখে কবি এটিএম ফারুক
একজন মানুষের জীবনে কতগুলো পরিচয় থাকতে পারে? পুলিশ কর্মকর্তা, বীর মুক্তিযোদ্ধা, কবি, গীতিকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, অভিনেতা, আবৃত্তিকার, উপস্থাপক, সংগঠক—এটিএম ফারুক আহমেদের জীবন যেন এসব পরিচয়ের মালা। খাকি পোশাকের কঠোরতা আর সাহিত্যের কোমলতা—দুই বিপরীত মেরুকে তিনি এক সুতোয় গেঁথেছেন।
আমার চোখে তিনি শুধু একজন লেখক নন। তিনি একজন মানবিক পুলিশ, যিনি দায়িত্ব পালনের ফাঁকে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি একজন শিল্পী, যিনি ‘রংবাজ’ সিনেমায় অভিনয় করে দর্শকের মন জয় করেছেন। তিনি একজন সংগঠক, যার নেতৃত্বে আজ সাহিত্য সংগঠনগুলো নতুন প্রাণ পেয়েছে। আর সবচেয়ে বড় পরিচয়, তিনি একজন আদর্শ স্বামী ও বাবা।
বৃহত্তর নোয়াখালীর মাটি তাঁর শিকড়। বর্তমানে তিনি লক্ষ্মীপুর জেলার দক্ষিণ রাজাপুর গ্রামের সন্তান। ১৯৫৭ সালের ১ নভেম্বর তাঁর জন্ম। স্কুল জীবন থেকেই তাঁর কলম চলতে শুরু করে। পাঠ্যপুস্তক শেষ হওয়ার আগেই তাঁর লেখা কবিতার পাণ্ডুলিপি তৎকালীন বাংলাদেশ বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক মরহুম ফজলে খোদার নজরে পড়ে। ডাক পড়ে ঢাকার।
উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিষয় ছিল ইংরেজি সাহিত্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার পাশাপাশিই তিনি বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করেন। পিতা মরহুম হাজী এবিএম জয়নুল আবেদীন মাস্টারের উৎসাহ ও প্রেরণা তাঁর সাহিত্য, আবৃত্তি, অভিনয় ও উপস্থাপনার পথকে মসৃণ করেছে। পিতার হাত ধরেই তিনি মঞ্চে পা রাখেন। বিশেষ করে ‘সিরাজউদ্দৌলা’ নাটকে সিরাজের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি এতটাই প্রশংসা কুড়ান যে পুলিশের অনেকেই তাঁকে ‘নবাব ফারুক’ নামে চিনতেন। আজও অনুরোধ এলে তিনি সেই বিখ্যাত ডায়ালগ শোনান।
এটিএম ফারুক আহমেদ শুধু একজন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ছিলেন না। তিনি ছিলেন জনতার বন্ধু। চাকরি জীবনে তিনি অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার হিসেবে পিবিআই থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
পুলিশের চাকরি মানেই কঠোরতা—এই ধারণা তিনি ভেঙেছেন। তাঁর কর্মজীবনে তিনি বহু মানবিক কাজ করেছেন। রাত-বিরাতে থানায় আসা অসহায় মানুষকে শুধু আইনের ধারা শোনাননি, তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অনেক সময় নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে থেকেছেন। সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া, নিখোঁজ শিশুকে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেওয়া—এমন অসংখ্য ঘটনা তার সহকর্মীদের মুখে আজও ফেরে।
অধীনস্থদের কাছে তিনি ছিলেন বড় ভাইয়ের মতো। কেউ ভুল করলে বকা দিতেন, আবার সেই ভুল শুধরে দেওয়ার জন্য সময়ও দিতেন। তাই পিবিআই থেকে অবসরের সময় অনেক জুনিয়র অফিসার চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি।
সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তিনি ‘অনীক মাহমুদ’ ছদ্মনামে লেখালেখি করতেন। ফলে সাহিত্যাঙ্গনের অনেকে তাঁকে অনীক মাহমুদ নামেই বেশি চেন। দায়িত্ব আর সৃষ্টি—দুই নৌকায় পা রেখেও তিনি ভারসাম্য রাখতে পেরেছেন। ডিউটি শেষে রাত জেগে কবিতা লেখা, ছুটির দিনে সাহিত্য পত্রিকার জন্য প্রবন্ধ পাঠানো—এটাই ছিল তার রুটিন।
অবসরের পর তিনি পুরোপুরি সাহিত্য সাধনায় মনোনিবেশ করেছেন। তাঁর সাহিত্য ভান্ডার আজ সমৃদ্ধ।
*কাব্যগ্রন্থ*: “অকৃতজ্ঞ”, “প্রত্যাশা”, “আগুন ঝরা ফাগুন”, “নির্বাচিত কবিতা”, “জনক বঙ্গবন্ধু”, “অব্যক্ত বেদনা”।
*গীতিকবিতা*: “গীতিমঞ্জরী”।
*উপন্যাস*: “পদ্মায় যখন ডুবল রবি” পাঠকমহলে ব্যাপক সমাদৃত। বইটির দ্বিতীয় সংস্করণও শেষ পর্যায়ে। “জনক বঙ্গবন্ধু” কাব্যের দ্বিতীয় সংস্করণ শেষে তৃতীয় সংস্করণের অপেক্ষায়।
তাঁর কবিতায় প্রেম আছে, প্রতিবাদ আছে, আবার দেশের মাটির গন্ধও আছে। “আগুন ঝরা ফাগুন” পড়লে ৫২’র ভাষা আন্দোলনের রক্ত দেখা যায়। “জনক বঙ্গবন্ধু” পড়লে মনে হয় বঙ্গবন্ধু নিজেই কথা বলছেন।
তিনি শুধু কবি নন, একজন এনলিস্টেড গীতিকারও। বিটিভির জন্য তিনি গান লিখেছেন। তাঁর লেখা গানে দেশপ্রেম ও মানবতার সুর মিশে থাকে। ২০০৪ সালে _The Daily Star_ পত্রিকায় তাঁর ৪টি কবিতা ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে “A Poets Corner” নামে বিশেষ পাতায় তাঁর ছবিসহ প্রকাশিত হয়। এটি তাঁর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির একটি দিক।
লেখালেখির বাইরেও তিনি অভিনয় করেছেন। জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘রংবাজ’-এ তাঁর উপস্থিতি দর্শক মনে রেখেছে। মঞ্চে আবৃত্তি ও উপস্থাপনায়ও তিনি সমান পারদর্শী। পুলিশ জীবনের অভিজ্ঞতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধ তাঁর অভিনয়ে প্রাণ দেয়।
একটি সাহিত্য সন্ধ্যায় তাঁর আবৃত্তি শুনলে মনে হয় শব্দগুলো কেবল উচ্চারিত হচ্ছে না, ছবির মতো চোখের সামনে ভাসছে। উপস্থাপনায় তাঁর কণ্ঠের জাদু শ্রোতাদের বেঁধে রাখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
চাকরি থেকে অবসরের পর তিনি নিজেকে সাহিত্য সংগঠনে নিয়োজিত করেছেন। বর্তমানে তিনি দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনের নেতৃত্বে আছেন—
1. *সিনিয়র সিটিজেন এসোসিয়েশনের সভাপতি*
2. *গাঙচিল সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদ, উত্তরা শাখার সভাপতি*
এছাড়াও তিনি চরও কয়েকটি সংগঠনের সাথে যুক্ত।
তাঁর নেতৃত্বে গাঙচিল সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদ উত্তরা শাখা অত্যন্ত দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। নতুন কবি-লেখকদের মঞ্চ করে দেওয়া, বই প্রকাশে সহায়তা, সাহিত্য আড্ডা ও কর্মশালা—সবকিছুতেই তাঁর সক্রিয় ভূমিকা। তিনি বিশ্বাস করেন, সাহিত্য বয়স মানে না। ৭০ বছর বয়সী একজনও প্রথম কবিতা নিয়ে মঞ্চে আসতে পারেন।
সিনিয়র সিটিজেনদের নিয়ে কাজ করার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন অবসর মানে থেমে যাওয়া নয়। বরং অভিজ্ঞতাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সময়। তাঁর উদ্যোগে অনেক প্রবীণ লেখক আবার লেখায় ফিরেছেন।
সব পরিচয়ের ভিড়ে এটিএম ফারুক আহমেদের সবচেয়ে আপন পরিচয়—তিনি একজন পারিবারিক মানুষ।
তিনি স্ত্রীকে খুব ভালোবাসেন। সংসার জীবনে স্ত্রী ছিলেন তাঁর নীরব সহযোদ্ধা। পুলিশের চাকরির অনিশ্চিত সময়, রাত জাগা ডিউটি, বদলির চাপ—সবকিছুর মধ্যে স্ত্রী ঘরটাকে আগলে রেখেছেন। আর তিনি? ফেরার পথে স্ত্রীর জন্য একগুচ্ছ ফুল বা একটা কবিতার খাতা নিয়ে আসতে ভুলতেন না। বন্ধুরা বলে, ফারুক ভাইয়ের কবিতার অনেক লাইনই নাকি স্ত্রীর জন্য লেখা। “অব্যক্ত বেদনা” কাব্যের অনেক কবিতায় সেই নিঃশব্দ ভালোবাসার ছাপ স্পষ্ট।
সন্তানদের কাছে তিনি সেরা বাবা। চাকরির ব্যস্ততার মাঝেও সন্তানদের পড়াশোনার খোঁজ নিয়েছেন। ছেলেমেয়েদের গল্প শুনিয়েছেন, কবিতা আবৃত্তি করে শুনিয়েছেন। সন্তানদের তিনি শিখিয়েছেন—মানুষ হও, তারপর ডিগ্রি।
বাড়িতে তাঁর লেখার টেবিলের পাশেই পরিবারের ছবি। লিখতে লিখতে ক্লান্ত হলে সেই ছবির দিকে তাকান। তারপর আবার কলম ধরেন। সন্তানরা বড় হয়েছে, নিজেদের মতো প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু বাবার কাছে তারা আজও সেই ছোট্ট ছেলেমেয়ে। ঈদে, জন্মদিনে বাড়ি ভরে যায় নাতি-নাতনিদের কোলাহলে। তখন কবি এটিএম ফারুক হয়ে যান দাদুভাই, যিনি নাতিদের “পদ্মায় যখন ডুবল রবি” গল্পের মতো করে বলেন।
পরিবারই তাঁকে শিখিয়েছে মানবিক হতে। পুলিশের ইউনিফর্মে কঠোর থাকলেও, বাড়ি ফিরে তিনি ছিলেন স্নেহময় পিতা। এই ভারসাম্যের কারণেই তিনি মানুষের কাছে এত প্রিয়।
বর্তমানে তিনি কবিতা ও উপন্যাসের পাশাপাশি প্রবন্ধ, কলাম লিখছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো তাঁর আত্মজীবনী এবং পুলিশ জীবনের বর্ণাঢ্য অভিজ্ঞতার স্মৃতিকথা লেখা। একজন পুলিশ কর্মকর্তার চোখ দিয়ে দেখা সমাজ, অপরাধ, মানবতা—এগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মূল্যবান দলিল হয়ে থাকবে।
তিনি বলেন, “পুলিশের খাতায় যে এফআইআর থাকে, সাহিত্যের খাতায় থাকে মানুষের কান্না। দুইটাই লিখতে হয়।”
আমি এটিএম ফারুককে দেখেছি একজন ‘সম্পূর্ণ মানুষ’ হিসেবে।
পুলিশের ইউনিফর্মের নিচে যে নরম হৃদয় থাকতে পারে, তিনি তার প্রমাণ। বিপদগ্রস্ত মানুষকে সাহায্য করতে তিনি কখনো পিছপা হননি। এ কারণেই তিনি সবার কাছে প্রিয়।
চাকরি, সাহিত্য, সংগঠন, সংসার—যেখানেই হাত দিয়েছেন, সেখানেই নিষ্ঠার ছাপ রেখেছেন।
কবিতা লেখেন, গান লেখেন, উপন্যাস লেখেন, অভিনয় করেন, সংগঠন চালান, সংসার সামলান। এই বহুমুখিতা তাঁকে আলাদা করেছে।
তাঁর লেখায় মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, দেশপ্রেম বারবার ফিরে আসে। “জনক বঙ্গবন্ধু” কাব্য তারই সাক্ষ্য।
সব ব্যস্ততার মাঝেও তিনি পরিবারকে সময় দেন। স্ত্রীকে সম্মান করেন, সন্তানদের বন্ধু ভাবেন। এই গুণটিই তাঁকে সাধারণ থেকে অসাধারণ করেছে।
এটিএম ফারুক আহমেদ প্রমাণ করেছেন, পেশা মানুষকে আটকে রাখতে পারে না। একজন পুলিশ অফিসারও কবি হতে পারেন, একজন কবিও সমাজের দায়িত্ব নিতে পারেন, আবার একজন সংগঠকও আদর্শ পরিবার গড়তে পারেন।
তিনি আজকের তরুণদের জন্য একটি মডেল। যারা বলে “চাকরির চাপে লেখা হয় না”, তাদের জন্য তাঁর জীবন জবাব। যারা বলে “বয়স হয়ে গেছে, এখন আর কিছু হবে না”, তাদের জন্য তাঁর সংগঠন একটি উদাহরণ। আর যারা ভাবে “ক্যারিয়ার আর সংসার একসাথে হয় না”, তাদের জন্য তাঁর পারিবারিক জীবন শিক্ষা।
খাকি পোশাক খুলে তিনি যখন কলম ধরেছেন, তখন সাহিত্য পেয়েছে একজন নিবেদিত সৈনিক। আর সমাজ পেয়েছে একজন মানবিক মানুষ। পরিবার পেয়েছে একজন দায়িত্বশীল অভিভাবক।
তাঁর পথচলা দীর্ঘ হোক। তাঁর কলম আরও ধারালো হোক। গাঙচিলের পাখা মেলে আরও দূর উড়ে যাক। আর তাঁর পরিবারের ভালোবাসার ছায়া তাঁকে আরও সৃষ্টির প্রেরণা দিক।



আপনার মতামত লিখুন