তিন প্রেসিডেন্টের মেয়াদ শেষ হয়নি কেন?
বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে রাষ্ট্রপতির পদ একটি প্রতীকী কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মেয়াদ ৫ বছর। কিন্তু ১৯৭৫ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ৫১ বছরের ইতিহাসে অন্তত: তিনজন রাষ্ট্রপতিকে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদ ছাড়তে হয়েছে। কাকতালীয়ভাবে এই তিনটি ঘটনার সাথেই জড়িয়ে আছে জিয়া পরিবারের নাম। ১৯৭৫ সালে জেনারেল জিয়াউর রহমানের হাতে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, ২০০২ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের চাপে প্রফেসর ডা. এ.কিউ.এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী এবং ২০২৬ সালে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে মো. সাহাবুদ্দিন। এই তিনটি ঘটনা আলাদা প্রেক্ষাপটে ঘটলেও এর মধ্যে কিছু মিল এবং কিছু পার্থক্য আছে। এই তিনটি ঘটনার বিস্তারিত কালপঞ্জি, কারণ, প্রতিক্রিয়া এবং এর রাজনৈতিক তাৎপর্য উপস্থাপন করা হলো।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন শুরু হয়। ক্ষমতায় আসেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ। কিন্তু মাত্র ৮৩ দিনের মাথায় ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ জেল হত্যার মাধ্যমে রাজনৈতিক পালাবদল আবার ঘটে। সেনাবাহিনী তখন সামনে নিয়ে আসে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে। ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর তাকে রাষ্ট্রপতি করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল সামরিক শাসনকে একটি সাংবিধানিক ও নিরপেক্ষ মুখ দেওয়া। সায়েম তখন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানের অধীনে কাজ করছিলেন।
কিন্তু এই সম্পর্ক বেশিদিন টেকেনি। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন। এরপর দেশের রাজনীতিতে সামরিক নেতৃত্বের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই অবস্থায় একজন বেসামরিক বিচারপতির রাষ্ট্রপতি পদে থাকা জিয়া ও সেনাবাহিনীর কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। ১৯৭৬ সালের ২১ এপ্রিল সায়েমকে পদত্যাগ করতে হয়। সরকারিভাবে কারণ দেখানো হয় “স্বাস্থ্যগত কারণ ও দেশের বৃহত্তর স্বার্থ”। কিন্তু পরবর্তীতে সায়েম নিজেই তার আত্মজীবনী “অ্যাট বঙ্গভবন: লাস্ট ফেইজ” বইতে লিখেছেন কীভাবে সেদিন তার বিছানার চারপাশে অস্ত্রধারী সেনারা দাঁড়িয়েছিল এবং জিয়া নিজে বুটসহ পা তুলে তার বুকের সামনে রিভলভার ধরে “সাইন ইট” বলেছিলেন। তিনি লিখেছেন, “আমি কোনোমতে সই করে বাঁচলাম”। সায়েমের পদত্যাগের পরদিনই জিয়াউর রহমান নিজে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। এভাবেই বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো প্রমাণিত হয় বন্দুকের জোরে রাষ্ট্রপতিও তবদলানো যায়।
এর ২৬ বছর পর ২০০২ সালে দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। ওই সরকারের আমলে ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রফেসর ডা. এ.কিউ.এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। তিনি বিএনপির রাজনীতির সাথে দীর্ঘদিন জড়িত ছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হওয়ার ৬ মাসের মধ্যেই সরকারের সাথে তার দূরত্ব তৈরি হয়। মূল কারণ ছিল দলীয় সিদ্ধান্তে দ্বিমত। সরকারের বিভিন্ন নিয়োগ, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনিক বিষয়ে রাষ্ট্রপতির অবস্থান প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সাথে মিলছিল না। এছাড়া বি. চৌধুরী বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দলের ঊর্ধ্বে উঠে গণতন্ত্র ও সহনশীলতার কথা বলতেন। সরকারের একাংশ এটাকে নিজেদের সমালোচনা হিসেবে দেখে।
২০০২ সালের জুন মাসে পরিস্থিতি চূড়ান্ত রূপ নেয়। বিএনপি সরকার সংবিধানের ৫২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব আনার প্রস্তুতি নেয়। অভিযোগ ছিল সংবিধান লঙ্ঘন ও গুরুতর অসদাচরণ। তখন সংসদে বিএনপি জোটের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। তাই অভিশংসন পাস হওয়া সময়ের ব্যাপার ছিল। এই চাপের মুখে ২০০২ সালের ২১ জুন রাত ১০টায় জাতির উদ্দেশে টেলিভিশন ভাষণ দিয়ে বদরুদ্দোজা চৌধুরী পদত্যাগ করেন। তিনি বলেন, “আমি কোনো অন্যায় করিনি। কিন্তু দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে আমি পদত্যাগ করছি”। তার পদত্যাগের পর স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন এবং দুই মাস পর বিচারপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। বি. চৌধুরী পরে বিএনপি ছেড়ে বিকল্পধারা বাংলাদেশ গঠন করেন।
তৃতীয় এবং সাম্প্রতিক ঘটনাটি ঘটে ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সেদিন স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি জটিলতার কারণে তিনি অসুস্থ। চিকিৎসকদের পরামর্শে বিশ্রামে থাকতে হচ্ছে। তাই সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদের ৩ উপ-অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তিনি পদত্যাগ করছেন। তিনি ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৮ সালের এপ্রিলে। অর্থাৎ ২১ মাস বাকি থাকতেই তিনি সরে গেলেন।
এই পদত্যাগের পেছনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট জটিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ছাত্র-জনতা রাষ্ট্রপতির অপসারণ দাবি করেছিল। কিন্তু ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার কথা বলে তাকে বহাল রাখে। এরপর ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করে। নতুন সরকারের সাথে রাষ্ট্রপতির সম্পর্কের ঢ়
কিছুটা উন্নতি হয়। কিন্তু ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে এসে আবার টানাপোড়েন শুরু হয়। রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ছিল আগামী ৩০ জুলাই মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোরের সফর নিয়ে। একই সাথে শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার গুঞ্জনও ছিল। এই প্রেক্ষাপটে সরকার রাষ্ট্রপতির পদে পরিবর্তন চাইছিল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।
সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ নিয়ে এখন তিন ধরনের বর্ণনা প্রচলিত। প্রথমটি সরকার ও স্পিকারের বর্ণনা। তারা বলছেন- এটি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ। সংবিধানসম্মত প্রক্রিয়া। দ্বিতীয়টি আওয়ামী লীগ ও এর সমর্থকদের বর্ণনা। তারা বলছেন- এটি চাপ দিয়ে করানো হয়েছে। তাদের যুক্তি, শেখ হাসিনা ফিরবেন শুনে সরকার ভয় পেয়ে গেছে। তৃতীয়টি সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমের বর্ণনা। তারা বলছেন- এটি রাজনৈতিক সমঝোতার ফসল। স্বাস্থ্যের অজুহাত থাকলেও মূল কারণ রাজনৈতিক।
এই তিনটি ঘটনার মধ্যে মিল হলো, তিনজনই মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে পদত্যাগ করেছেন। ১৯৭৫ সালে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জিয়াউর রহমান, ২০০২ সালে তার দল বিএনপির বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন জোট সরকার এবং ২০২৬ সালে তাঁর পুত্র তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার। পার্থক্য হলো পদ্ধতিতে। ১৯৭৫ সালে ছিল সরাসরি সামরিক চাপ ও অস্ত্রের ভয়। ২০০২ সালে ছিল সাংবিধানিক অভিশংসনের চাপ। আর ২০২৬ সালে কাগজে-কলমে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে চাপের অভিযোগ।
এখন প্রশ্ন হলো রাষ্ট্রপতির পদটি কেন বারবার বিতর্কের কেন্দ্রে আসে? উত্তর হলো আমাদের সংবিধানে এই পদের ক্ষমতা ও ভূমিকা স্পষ্ট না। ১৯৭২ সালের সংবিধানে রাষ্ট্রপতি নির্বাহী প্রধান ছিলেন। ১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংশোধনীতে সংসদীয় পদ্ধতি ফেরার পর রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক প্রধান হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া তিনি কিছু করতে পারেন না। কিন্তু সংকটের সময় জাতি তার দিকে তাকায়। ২০২৪ এর জুলাই-আগস্টে সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা নিয়েও তাই বিতর্ক হয়েছে। কেউ বলেছেন তিনি স্থিতিশীলতা রেখেছেন, কেউ বলেছেন তিনি নীরব ছিলেন।
সাহাবুদ্দিন কেমন রাষ্ট্রপতি ছিলেন এই প্রশ্নের উত্তরও বিতর্কিত। সমালোচকরা বলেন তিনি আওয়ামী লীগের মনোনীত। তাই নিরপেক্ষ ছিলেন না। সমর্থকরা বলেন তিনি তিনটি ভিন্ন সরকারকে শপথ করিয়েছেন। ২০২৪ এর ডামি নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার, এরপর ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার এবং সর্বশেষ বিএনপি সরকার। এই রেকর্ড বাংলাদেশে আর কারো নেই। আবার ৫ আগস্টের পর তিনি আওয়ামী লীগকে ফ্যাসিস্ট বলেছেন, বিএনপির দেওয়া ভাষণে শেখ হাসিনার সমালোচনাও করেছেন। তাই কেউ কেউ বলেন তিনি পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়েছেন।
তার বিদায় নিয়েও নানা মন্তব্য। কেউ বলছেন বিএনপির আগের রাষ্ট্রপতি বি. চৌধুরীর তুলনায় প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিনে বিদায় সম্মানজনক। কারণ তাকে অভিশংসন বা গ্রেপ্তার করা হয়নি।
এখন সামনে কী? সংবিধান অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ এখন অস্থায়ী দায়িত্বে। সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় তাদের মনোনীত প্রার্থীই জিতবেন। গণমাধ্যমে চারটি নাম আলোচনায়। ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ড. আব্দুল মঈন খান এবং নজরুল ইসলাম খান। এর মধ্যে মোশাররফ হোসেনের নাম সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে। তবে বিএনপি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।
এই ঘটনা থেকে আমরা তিনটি শিক্ষা নিতে পারি। এক. রাষ্ট্রপতির পদকে দলীয়করণ করলে এর মর্যাদা নষ্ট হয়। দুই. সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী না করলে বারবার ব্যক্তির উপর নির্ভর করতে হবে। তিন. ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে বঙ্গভবনের দরজা না বদলানোর সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
শেষ কথা হলো, ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। সামরিক শাসক যেমন ১৯৭৫ সালে সায়েমকে সরিয়েছিল, ২০০২ সালে বি. চৌধুরীকে সরিয়েছিল, ২০২৬ সালে সাহাবুদ্দিনের ক্ষেত্রেও তাদের নাম এসেছে। কিন্তু প্রতিটি ঘটনার প্রেক্ষাপট আলাদা। ১৯৭৫ ছিল সামরিক শাসন, ২০০২ ছিল সংসদীয় চাপ, ২০২৬ হলো রাজনৈতিক সমঝোতা ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট।
জনগণের প্রত্যাশা এখন একটাই। নতুন রাষ্ট্রপতি যেন শুধু সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ না মানেন, জাতির বিবেকের কথাও শোনেন। যিনি দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ১৮ কোটি মানুষের প্রতীক হতে পারেন। কারণ সম্মান কেউ কাউকে দেয় না। আল্লাহ যাকে সম্মান দিতে চান পৃথিবীর কোনো শক্তি তাকে তা থেকে বঞ্চিত করতে পারে না। রাজনীতির এই পালাবদলের মাঝেও এই সত্যটাই বারবার প্রমাণ হয়।
পুনশ্চঃ
মেয়াদ পূরণ করতে না পারা প্রেসিডেন্টগণের জীবন ও কর্ম-
১) বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের নাম বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ৫ম রাষ্ট্রপতি। আইনজ্ঞ, বিচারক এবং সাংবিধানিক রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তার জীবন ছিল নীতি, সংযম ও সংকটের সমন্বয়। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাকে রাষ্ট্রপতি করা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু মাত্র ৫ মাসের মাথায় সামরিক চাপের মুখে তাকে পদত্যাগও করতে হয়েছিল। তার জীবনের এই উত্থান-পতন বাংলাদেশের রাজনীতির বাঁকবদলের সাক্ষী।
আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম জন্মগ্রহণ করেন ১৯১৬ সালের ২৬ মার্চ, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির রংপুর জেলায়। তার পিতার নাম ছিল আবু জাফর মোহাম্মদ সায়েম। ছোটবেলা থেকেই তিনি মেধাবী ছিলেন। রংপুর জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করার পর তিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে বিএ এবং পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন।
আইন পড়াশোনা শেষে তিনি কলকাতা হাইকোর্টে আইন পেশা শুরু করেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তিনি পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন এবং ঢাকা হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে যোগ দেন। তার আইনজ্ঞান, যুক্তি এবং ব্যক্তিত্বের কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি আইন অঙ্গনে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন।
১৯৫৭ সালে আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৬২ সালে তাকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি করা হয়। ১৯৭০ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পান।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি পাকিস্তানি সরকারের অধীনে চাকরি করলেও যুদ্ধের পর বাংলাদেশ সরকার তাকে দায়িত্বে বহাল রাখে। কারণ তার বিরুদ্ধে স্বাধীনতাবিরোধী কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল না এবং তিনি একজন নিরপেক্ষ বিচারক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট গঠিত হলে তিনি আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৫ সালের ১৭ জানুয়ারি তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন। প্রধান বিচারপতি হিসেবে তিনি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা রক্ষার চেষ্টা করেছেন। তার রায় ও পর্যবেক্ষণগুলো আজও আইন শিক্ষার্থীদের পাঠ্য।
১৯৭৫ সাল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে নাটকীয় বছর। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতি হন। কিন্তু ৩ নভেম্বর জেল হত্যার ঘটনায় মোশতাককে সরিয়ে সেনাবাহিনী ক্ষমতা নেয়। সেনাবাহিনী তখন একটি “নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য” মুখ খুঁজছিল যার মাধ্যমে তারা সামরিক শাসনকে বৈধতা দিতে পারে।
সেই প্রেক্ষাপটে ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতি করা হয়। একই সাথে তাকে “প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক” জেনারেল জিয়াউর রহমানের অধীনে কাজ করতে হয়। সায়েমের নিয়োগের উদ্দেশ্য ছিল দুইটি: এক. দেশে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা দেখানো, দুই. আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি রক্ষা করা।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে সায়েমের মেয়াদের মধ্যে খুব বেশি নির্বাহী সিদ্ধান্ত নেননি। কারণ বাস্তব ক্ষমতা ছিল সেনাবাহিনীর হাতে। তবে তিনি চেষ্টা করেছিলেন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে যেন পুরোপুরি সামরিকীকরণ না করা হয়।
২১ এপ্রিল ১৯৭৬
সায়েমের রাষ্ট্রপতি জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা তার পদত্যাগ। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর “সিপাহী-জনতার বিপ্লবের” পর জেনারেল জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রের প্রকৃত নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন। জিয়া ও সেনা নেতৃত্বের কাছে একজন বেসামরিক বিচারপতির রাষ্ট্রপতি পদে থাকা তখন অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। তারা চাচ্ছিলেন একজন সামরিক ব্যক্তিই রাষ্ট্রপ্রধান হন।
১৯৭৬ সালের ২১ এপ্রিল সায়েমকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। সরকারিভাবে বলা হয় “স্বাস্থ্যগত কারণ ও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে” তিনি পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।
তার নিজের লেখা বই “অ্যাট বঙ্গভবন: লাস্ট ফেইজ” এ তিনি এই ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “জিয়াউর রহমান আমার বিছানায় তাঁর বুটসহ পা তুলে দিয়ে বলেন, সাইন ইট। তাঁর একহাতে ছিল স্টিক, অন্য হাতে রিভলভার… ততক্ষণে আট দশজন অস্ত্রধারী আমার বিছানার চারপাশে অস্ত্র উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জিয়া আবার আমার বিছানায় পা তুলে আমার বুকের সামনে অস্ত্র উঁচিয়ে বললেন, ‘সাইন ইট’। আমি কোনোমতে সই করে বাঁচলাম।”
সায়েমের পদত্যাগপত্রে লেখা ছিল: “অসুস্থতার কারণে আমি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করলাম।” পদত্যাগের সাথে সাথেই জেনারেল জিয়াউর রহমান নিজে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এভাবেই বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো প্রমাণিত হয় যে বন্দুকের জোরে রাষ্ট্রপতিও বদলানো যায়।
পদত্যাগের পর আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাজনীতি থেকে দূরে সরে যান। তিনি আর কোনো সরকারি পদ গ্রহণ করেননি। বরং নিজেকে লেখালেখি ও আইন চর্চায় নিয়োজিত রাখেন। ১৯৮৮ সালে তিনি তার স্মৃতিকথা “অ্যাট বঙ্গভবন: লাস্ট ফেইজ” প্রকাশ করেন। এই বইতে তিনি ১৯৭৫-৭৬ সালের ঘটনাবলী, বঙ্গভবনের ভেতরের রাজনীতি এবং জিয়াউর রহমানের সাথে তার সম্পর্কের কথা অকপটে লিখেছেন। বইটি আজও ১৯৭৫ পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাস জানার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
সায়েম ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, ধর্মপ্রাণ ও নীতিবান মানুষ। বিচারক হিসেবে তিনি নিরপেক্ষতা ও আইনের শাসনে বিশ্বাসী ছিলেন। রাজনীতিবিদ না হওয়ায় তাকে রাষ্ট্রপতির পদে আনা সহজ হয়েছিল। কিন্তু রাজনীতির জটিল খেলায় তিনি ছিলেন অপেশাদার। তাই সামরিক শক্তির কাছে তাকে হার মানতে হয়েছে।
তার সমালোচকরা বলেন, ১৯৭৫ পরবর্তী সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য তিনি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছেন। আবার সমর্থকরা বলেন, সেই সংকটময় সময়ে তিনি যদি পদে না থাকতেন, তাহলে দেশ আরও রক্তপাতের দিকে যেত। তিনি তার সাধ্যমতো সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার চেষ্টা করেছেন।
বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ১৯৯৭ সালের ৮ জুলাই ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। তাকে ঢাকায় দাফন করা হয়।
আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের জীবন আমাদের তিনটি শিক্ষা দেয়। এক. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা করা কতটা জরুরি। দুই. সাংবিধানিক পদে নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে বসালেও রাজনৈতিক শক্তির কাছে সে পদ কতটা অসহায় হতে পারে। তিন. ইতিহাসের কঠিন সময়ে একজন মানুষের ব্যক্তিগত নীতি ও আপসের মধ্যে ভারসাম্য রাখা কতটা কঠিন।
তিনি ৫ মাসের রাষ্ট্রপতি ছিলেন। কিন্তু তার সেই ৫ মাস বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ বদলে দিয়েছিল। ১৯৭৫ সালে তার মাধ্যমে শুরু হওয়া সামরিক শাসনের ধারা ১৯৯০ সাল পর্যন্ত চলেছিল। তাই ইতিহাসে তার নাম শুধু একজন রাষ্ট্রপতি হিসেবে না, একজন সাক্ষী হিসেবেও থেকে যাবে। একজন মানুষ যিনি বন্দুকের নলের সামনে দাঁড়িয়েও নিজের বিবেককে বিসর্জন দেননি, শুধু পদ ছেড়েছেন।
২)
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রফেসর ডা. এ.কিউ.এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী একটি ব্যতিক্রমী নাম। তিনি একাধারে চিকিৎসক, শিক্ষক, কূটনীতিক, রাজনীতিবিদ এবং রাষ্ট্রপতি। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হয়েও দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ইতিহাসে “নীতির জন্য পদত্যাগকারী রাষ্ট্রপতি” হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। তার জীবন বাংলাদেশের গণতন্ত্র, দলীয় রাজনীতি ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের টানাপোড়েনের গল্প বলে।
বদরুদ্দোজা চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩২ সালের ১ নভেম্বর, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার বাসুদেবপুর গ্রামে। তার পিতা খান বাহাদুর কফিলউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবক।
ছোটবেলা থেকেই তিনি মেধাবী ছিলেন। ঢাকা কলেজ থেকে আইএসসি পাস করার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। ১৯৫৫ সালে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি যুক্তরাজ্যের লন্ডনে গিয়ে পোস্ট গ্রাজুয়েশন করেন। ১৯৫৮ সালে তিনি MRCP এবং ১৯৬০ সালে FRCP ডিগ্রি লাভ করেন।
দেশে ফিরে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। দীর্ঘদিন তিনি শিক্ষকতা করেছেন এবং হাজারো চিকিৎসক তৈরি করেছেন। তার ছাত্রদের অনেকেই আজ দেশের স্বনামধন্য চিকিৎসক।
১৯৭৮ সালে বিএনপির প্রতিষ্ঠা লগ্নে জেনারেল জিয়াউর রহমানের ডাকে ডা. বি. চৌধুরী রাজনীতিতে আসেন। জিয়া যখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি গঠন করেন, তখন বি. চৌধুরী ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন।
১৯৭৯ সালে তিনি কুমিল্লা-১ আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালেও একই আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন।
বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তাকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
1. *১৯৭৯-১৯৮২*: শিক্ষা ও তথ্য মন্ত্রী
2. *১৯৯১-১৯৯৬*: পররাষ্ট্র মন্ত্রী
পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে তিনি বাংলাদেশের কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। সার্ক, ওআইসি ও জাতিসংঘে বাংলাদেশের অবস্থানকে শক্তিশালী করেন। তার সাবলীল ইংরেজি ও কূটনৈতিক দক্ষতা তাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত করে তোলে।
২০০১ সালের অক্টোবরে বিএনপি-জামায়াত জোট বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। তখন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা ও দলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে ডা. বি. চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়।
২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর তিনি বাংলাদেশের ১৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। তখন তার বয়স ৬৯ বছর। রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। বিএনপির নেতাকর্মীরা ভেবেছিলেন দলের একজন বিশ্বস্ত ও জ্যেষ্ঠ নেতা রাষ্ট্রপতি হলে সরকারের জন্য সুবিধা হবে।
*
কিন্তু রাষ্ট্রপতি হওয়ার ৬ মাসের মধ্যেই সরকারের সাথে তার দূরত্ব তৈরি হয়। এর মূল কারণ ছিল ৩টি:
*!). দলীয় সিদ্ধান্তে দ্বিমত*: সরকারের বিভিন্ন নিয়োগ, প্রশাসনিক বদলি ও বিচার বিভাগীয় বিষয়ে রাষ্ট্রপতি একমত হতে পারেননি। তিনি মনে করতেন এসব সিদ্ধান্তে দলীয় বিবেচনার চেয়ে মেধা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত।
*!!). “উদার গণতন্ত্র” এর বক্তব্য*: রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতেন। সেই বক্তব্যে তিনি দলের ঊর্ধ্বে উঠে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সহনশীলতার কথা বলতেন। সরকারের একাংশ এটাকে নিজেদের সমালোচনা হিসেবে নেয়।
*!!!). স্বাধীন অবস্থান*: সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক প্রধান। কিন্তু বাস্তবে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে কাজ করেন। বি. চৌধুরী চেয়েছিলেন রাষ্ট্রপতির পদটিকে আরও মর্যাদাপূর্ণ ও নিরপেক্ষ রাখতে। এটা সরকারের সাথে তার সংঘাতের কারণ হয়।
২০০২ সালের মাঝামাঝি সময়ে পরিস্থিতি চরমে পৌঁছে। সরকারের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে “সংবিধান লঙ্ঘন” ও “সরকারের সাথে অসহযোগিতা”র অভিযোগ ওঠে।
২০০২ সালের ২১ জুন জাতীয় সংসদে বিএনপির সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব আনার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেয়। তখন সংসদে বিএনপি জোটের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। তাই অভিশংসন পাস হওয়া ছিল সময়ের ব্যাপার।
এই চাপের মুখে ২০০২ সালের ২১ জুন রাত ১০টায় রাষ্ট্রপতি ডা. বি. চৌধুরী জাতির উদ্দেশে টেলিভিশন ভাষণ দিয়ে পদত্যাগ করেন।
তার পদত্যাগের পর সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তৎকালীন স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। ২ মাস পর ২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর বিচারপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
বি. চৌধুরীর এই পদত্যাগ বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। কারণ তিনিই প্রথম রাষ্ট্রপতি যিনি অভিশংসনের চাপে পদত্যাগ করলেন, কিন্তু কোনো দুর্নীতি বা অপরাধের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে প্রমাণিত হয়নি।
পদত্যাগের পর তিনি বিএনপি ছেড়ে দেন। ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ তিনি “বিকল্পধারা বাংলাদেশ” নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। দলের স্লোগান ছিল “উদার গণতন্ত্র”।
তিনি মনে করতেন বিএনপি ও আওয়ামী লীগের হানাহানির রাজনীতির বাইরে তৃতীয় একটি শক্তি দরকার। কিন্তু দুই বড় দলের দাপটে বিকল্পধারা তেমন সুবিধা করতে পারেনি। ২০০৮ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে দলটি অংশ নিলেও উল্লেখযোগ্য আসন পায়নি।
পরবর্তীতে ২০১৭ সালে তিনি আবার বিএনপির সাথে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তা সফল হয়নি। শেষ বয়সে তিনি মূলত লেখালেখি ও বক্তৃতার মাধ্যমে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করতেন।
ডা. বি. চৌধুরী ছিলেন একজন ভদ্র, মার্জিত ও শিক্ষিত রাজনীতিবিদ। তার ইংরেজি বলার দক্ষতা, যুক্তি দিয়ে কথা বলা এবং বিনয় তাকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করেছিল।
তাঁর সমালোচকরা বলেন, তিনি রাজনীতিতে “খুব বেশি আদর্শবাদী” ছিলেন। দলীয় রাজনীতির বাস্তবতা তিনি বুঝতে পারেননি। তাই সরকারের সাথে তার সংঘাত হয়েছে।
আবার সমর্থকরা বলেন, তিনি ছিলেন “নীতির রাজনীতিবিদ”। পদ ও ক্ষমতার জন্য আপস করেননি। রাষ্ট্রপতির পদের মর্যাদা রক্ষার জন্য তিনি পদত্যাগ করেছেন। এটা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বিরল উদাহরণ।
তাঁর ছেলে মাহী বি. চৌধুরীও রাজনীতিবিদ। তিনি বিকল্পধার মহাসচিব এবং সাবেক এমপি। মাহী চৌধুরী বর্তমানে রাজনীতিতে সক্রিয়। বি. চৌধুরীর পরিবার কুমিল্লার একটি শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত পরিবার হিসেবে পরিচিত।
প্রফেসর ডা. এ.কিউ.এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ২০২৪ সালের ৫ অক্টোবর ঢাকার একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। তাকে কুমিল্লার গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়।
বদরুদ্দোজা চৌধুরীর জীবন আমাদের দুইটি শিক্ষা দেয়। এক. রাজনীতিতে নীতি ও আদর্শ ধরে রাখা কতটা কঠিন। দুই. সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখা না গেলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে।
তিনি মাত্র ৭ মাস রাষ্ট্রপতি ছিলেন। কিন্তু এই ৭ মাসেই তিনি প্রমাণ করেছেন রাষ্ট্রপতি শুধু রাবার স্ট্যাম্প না। তিনি চাইলে নীতির প্রশ্নে পদত্যাগও করতে পারেন।
ইতিহাস তাকে “বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা” হিসেবে মনে রাখবে, “পররাষ্ট্র মন্ত্রী” হিসেবে মনে রাখবে এবং “যে রাষ্ট্রপতি নীতির জন্য পদ ছেড়েছেন” হিসেবেও মনে রাখবে।
৩)
বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের জীবন একজন জেলা পর্যায়ের আইনজীবী থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে পৌঁছানোর গল্প। তিনি ছিলেন বিচারক, দুদক কমিশনার, মুক্তিযোদ্ধা এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে দীর্ঘদিন জড়িত একজন মানুষ। ২০২৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং মেয়াদ শেষ হওয়ার ২১ মাস আগেই পদত্যাগ করেন।
মো. সাহাবুদ্দিন জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৯ সালের ১০ ডিসেম্বর, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের পাবনা জেলার শাহজাদপুর উপজেলার বাগবাড়ি গ্রামে। তার পিতার নাম মো. শরফুদ্দিন আনসারী এবং মাতার নাম খায়রুন নেছা।
ছোটবেলা থেকেই তিনি মেধাবী ও শান্ত স্বভাবের ছিলেন। স্থানীয় স্কুল থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে বিএসি এবং পরে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মো. সাহাবুদ্দিন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি মুজিব বাহিনীর সদস্য ছিলেন। যুদ্ধের পর তিনি আইন পেশায় যোগ দেন এবং পাবনা জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য হন।
তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে দীর্ঘদিন জড়িত ছিলেন। ১৯৮২ সালে তিনি পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৯০-এর গণ-আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তার রাজনৈতিক আনুগত্য ও সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে।
১৯৯৫ সালে মো. সাহাবুদ্দিন বিচার বিভাগে যোগ দেন। তিনি জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে বিভিন্ন জেলায় দায়িত্ব পালন করেন। বিচারক হিসেবে তিনি ন্যায়নিষ্ঠতা ও কঠোরতার জন্য পরিচিত ছিলেন।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে তিনি কিছু রাজনৈতিক মামলার বিচার করেন। ২০০৬ সালে তাকে “বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক” হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ওই সময় তিনি বিএনপি নেতা তারেক রহমানের বিরুদ্ধে একটি মামলার বিচারকার্য পরিচালনা করেন।
২০১১ সালে তিনি বিচার বিভাগ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
বিচারক হিসেবে অবসরের পর ২০১১ সালের ১৩ মার্চ তাকে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকের একজন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি ২০১৬ সালের ১২ মার্চ পর্যন্ত এই পদে ছিলেন।
দুদক কমিশনার হিসেবে তিনি বেশ কয়েকটি আলোচিত দুর্নীতির মামলার তদন্ত ও অনুমোদনে ভূমিকা রাখেন। তার সময়ে দুদকের ভাবমূর্তি কিছুটা বৃদ্ধি পায়। সরকারের সাথে তার সুসম্পর্ক থাকার কারণে ২০১৬ সালে তাকে দুদকের চেয়ারম্যান করার গুঞ্জনও উঠেছিল, কিন্তু তা হয়নি।
২০২৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের মেয়াদ শেষ হয়ে আসলে আওয়ামী লীগ সরকার নতুন রাষ্ট্রপতি মনোনয়নের প্রক্রিয়া শুরু করে। ১২ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের মনোনয়নে মো. সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়।
বিরোধী দল কোনো প্রার্থী না দেওয়ায় তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল তিনি দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। শপথ বাক্য পাঠ করান স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার প্রথম কাজ ছিল নতুন মন্ত্রিসভাকে শপথ করানো। এরপর তিনি রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান, বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের পরিচয়পত্র গ্রহণ, বিলে স্বাক্ষর ইত্যাদি আনুষ্ঠানিক কাজ করেন।
মো. সাহাবুদ্দিনের রাষ্ট্রপতি জীবন ছিল অত্যন্ত ঘটনাবহুল। মাত্র ৩ বছরের মধ্যে তাকে তিনটি ভিন্ন সরকারের শপথ করাতে হয়েছে।
*১. ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচন পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার*: ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়। রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন নতুন মন্ত্রিসভাকে শপথ করান।
*২. ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার*: ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনই এই সরকারকে শপথ করান। এই সময় তিনি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার কথা বলেন।
*৩. ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ সংসদ পরবর্তী বিএনপি সরকার*: ২০২৬ সালের শুরুতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বিএনপির নতুন মন্ত্রিসভাকেও শপথ করান।
একজন রাষ্ট্রপতির আমলে তিনটি ভিন্ন মতাদর্শের সরকারের শপথ বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার সময়ে কিছু বিতর্কও হয়েছে।
*১. ২০২৪ এর জুলাই-আগস্ট*: গণ-অভ্যুত্থানের সময় তার নীরব ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা হয়। ছাত্ররা বঙ্গভবন ঘেরাও করে তার পদত্যাগ দাবি করে। কিন্তু তিনি পদত্যাগ করেননি।
*২. সাক্ষাৎকার*: ২০২৪ সালের শেষ দিকে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর তাকে বিভিন্নভাবে চাপ দেওয়া হয়েছে। বিদেশ সফরে যেতে দেওয়া হয়নি, বঙ্গভবনের প্রেস উইং গুটিয়ে দেওয়া হয়েছে।
*৩. শেখ হাসিনার সাথে কথোপকথনের অভিযোগ*: ২০২৬ সালে একটি গণমাধ্যম দাবি করে লন্ডনে চিকিৎসার সময় তিনি শেখ হাসিনার সাথে ফোনে কথা বলেছেন। তিনি এই অভিযোগ অস্বীকার করেন।
*পদত্যাগ: ২৪ জুলাই ২০২৬*
২০২৬ সালের ২৪ জুলাই বিকেলে তিনি স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। এক পৃষ্ঠার চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন:
“আমি দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি জটিলতা ও Autonomic Neuropathy তে ভুগছি। চিকিৎসকরা বিশ্রামের পরামর্শ দিয়েছেন। এই অবস্থায় সংবিধান প্রদত্ত দায়িত্ব পালন সম্ভব না। তাই সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদের ৩ উপ-অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আমি পদত্যাগ করছি।”
তিনি ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মেয়াদ থাকা সত্ত্বেও ২১ মাস আগে পদত্যাগ করেন। তার পদত্যাগের পর স্পিকার মেজর অব. হাফিজ উদ্দিন আহমেদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।
পদত্যাগের কারণ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তিনটি মত আছে। সরকার বলছে “স্বাস্থ্যগত কারণ”। বিরোধীরা বলছে “চাপের মুখে পদত্যাগ”। বিশ্লেষকরা বলছেন “রাজনৈতিক সমঝোতা”।
মো. সাহাবুদ্দিন ছিলেন নরম স্বভাবের, কম কথা বলা মানুষ। তিনি খুব বেশি জনসম্মুখে আসতেন না। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি আনুষ্ঠানিকতা মেনে চলেছেন।
তার সমালোচকরা বলেন, তিনি “আওয়ামী লীগের মনোনীত” ছিলেন। তাই নিরপেক্ষ ছিলেন না। আবার সমর্থকরা বলেন, তিনি সংকটের সময় সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন।
তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা, বিচারক ও দুদক কমিশনার হিসেবে রাষ্ট্রকে সেবা দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি রেকর্ড করেছেন, তিনটি ভিন্ন সরকারকে শপথ করিয়েছেন।
তার স্ত্রীর নাম রেবেকা সুলতানা। তাদের এক ছেলে আছে, যিনি মিডিয়া ও চলচ্চিত্রের সাথে জড়িত। পরিবার নিয়ে তিনি পাবনাতেই বেশি সময় কাটাতে পছন্দ করতেন।
মো. সাহাবুদ্দিনের জীবন বাংলাদেশের রাজনীতির পালাবদলের প্রতিচ্ছবি। তিনি মুক্তিযোদ্ধা থেকে বিচারক, বিচারক থেকে দুদক কমিশনার, দুদক কমিশনার থেকে রাষ্ট্রপতি হয়েছেন।
তার ৩ বছরের রাষ্ট্রপতি জীবনে দেশে ২ বার সরকারের পতন ও পরিবর্তন হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেও মেয়াদ শেষ করার আগেই সরে গেছেন।
ইতিহাস হয়তো একদিন বিচার করবে তিনি কেমন রাষ্ট্রপতি ছিলেন। তবে এটা নিশ্চিত যে ২০২৪-২০২৬ সালের বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটে তাঁর স্বাক্ষর, তাঁর শপথ ও তা্র পদত্যাগ সবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।



আপনার মতামত লিখুন