মালির স্বপ্ন : খান আখতার হোসেন
মালির স্বপ্ন
— খান আখতার হোসেন
মাগুরার রাত গভীর। ঘড়িতে ২টা ১৭। পরেশ কান্তি সাহার ঘুম ভাঙে কুকুরের ডাকে। জানালা খুলে দেখে স্কুল মাঠে মশালের আগুন। ইউনিয়নের মেম্বার শহিদুলের লোকজন “সত্যের উপাসনা পাঠাগার” এর তালা ভাঙতেছে। মেম্বারের ডান হাত সালাম চিৎকার করে – “সরকারের বিরুদ্ধে কবিতা পড়াও ক্যা মাস্টার? লাইব্রেরি বন্ধ কর।”
পরেশ দৌড়ে গিয়া বুক পেতে দেয় কাঠের দরজায়। “খবরদার। আমার বুকের উপর দিয়া যাও। বই আমার মা। মারে কেউ মারে?”
শাবল উঠে আসে মাথার উপর। পরেশ চোখ বন্ধ করে। তখনই পিছন থেকে ২০টা কচি গলা – “মারো শালারে!” ক্লাস টেনের রিফাত সামনে এসে দাঁড়ায়। হাতে লাঠি নাই, বই আছে। “চাচা, মারেন স্যাররে। কিন্তু এই বইগুলা আমাদের বাবা। এই লাইব্রেরি আমাদের মা। বই মার খাইলে জাতি মার খাবে।”
সালাম ভয় পায়। মশাল ফেলে পালায়। পরেশ মাটিতে বসে পড়ে। রিফাতের মাথায় হাত রাখে – “বাবা, তুই আমার শাবল। অন্যায়ের তালা তুই ভাঙিস। তোর হাতে বই থাক। লাঠি না।”
সেই রাতেই পরেশ বোঝে – ঝড় শুরু হইছে। ওর কলমই এখন অস্ত্র।
পরেশ লড়ে বাইরে, বউ রুমি লড়ে ঘরে। চালের ড্রামে ২ মুঠ চাল। মেয়ে মিতুর ইন্টারের ফর্ম ফিলাপ ১২০০ টাকা। রুমি পাতিলে চাল ধোয়া পানির মাড় রাঁধে। নিজে খায় না। সব ছেলে-মেয়েরে দেয়। সন্ধ্যায় পরেশ ৫ টাকায় সুকান্তের “ছাড়পত্র” কিনে আনে। রুমির বুক ফেটে যায়, কিন্তু মুখে কিছু কয় না। রাতে স্বামী ঘুমাইলে মিতুর ছেঁড়া জামা সেলাই করে। আঙুল ফুটে রক্ত পড়ে।
একদিন রুমি নিজের বিয়ার সোনার আংটিটা পরেশের বালিশের নিচে রাখে। চিরকুট লিখে – “বেচো না। শুধু ধরে রেখো। অভাব গেলে ফেরত নিমু। তোমার বিবেকের দাম এই আংটি না।” পরেশ সকালে আংটি দেখে রুমির পায়ে সালাম করে। রুমি কয় – “সালাম কইরো না। পাশে থাকো। এইডাই আমার গহনা।”
ছেলে রাকিব অংকে ফেল করে। “মাস্টারের ছেলে অংকে ফেল” – এই কথা শুনে রাকিবের কান পচে যায়। পরেশ নিজে অংক পারে না। বাংলা-ইংরেজির মাস্টার। তবুও রাত ২টা পর্যন্ত ইউটিউবে “লসাগু-গসাগু” শিখে। পরদিন উঠানে চক দিয়া নদী আঁকে। “এইডা নদী রে বাবা। অংকের সূত্র হইলো নৌকা। আমি তোর মাঝি।”
রোজ রাত ১০টা। বাপ-বেটা মাটিতে বসে। পরেশ ভুল করে, রাকিব শুধরায় দেয়। এসএসিতে রাকিব অংকে ৮০ পায়। স্কুলে ফার্স্ট। হেডমাস্টার স্টেজে কয় – “মেধা রক্তে না, যত্নে।” রাকিব সবার সামনে বাবার পায়ে সালাম করে – “বাবা, তুমি আমার সবচেয়ে কঠিন অংক। আর সবচেয়ে সহজ সমাধান।”
মেয়ে মিতুও বাপের উপর রাগ করে। “তুমি কেন গরিব বাবা? অন্য বাপেরা মেয়েরে সোনার চেইন দেয়।” পরেশ মেয়েরে লাইব্রেরিতে নিয়া যায়। ২০০টা ছেলে-মেয়ে উঠে দাঁড়ায় – “আপা, আসসালামু আলাইকুম।” একজন কয় – “আপা, আপনার বাবা আমার জীবন বাঁচাইছে। আমি ক্লাস এইটে ঝরে যাইতাম।” আরেকজন কয় – “আমার বাপ আমারে বিয়া দিতে চাইছিল। স্যার আইসা বাঁচাইছে।”
মিতু বাসায় এসে বাবার পা ধরে কাঁদে – “বাবা, তুমি গরিব না। তুমি রাজা। তোমার রাজ্যে ২০০টা রাজপুত্র-রাজকন্যা।” সেদিন থেকে মিতুও লাইব্রেরিতে ছোট বাচ্চাদের পড়ায়।
কিন্তু ঝড় থামে না। মেম্বার শহিদুল এবার চেয়ারম্যান করিমরে নিয়া আসে। চেয়ারম্যান চেয়ারে বসে হুমকি দেয় – “লাইব্রেরি বন্ধ করো। না হইলে চাকরি খাবো।” পরেশ চকের টুকরা দিয়া মাটিতে “শিক্ষা” লিখে – “স্যার, এই শব্দটা মুছবেন কেমনে? পানি দিয়া? আগুন দিয়া? মুছতে পারবেন?”
চেয়ারম্যান রেগে গিয়া মামলা দেয়। ধারা ১২৪ক। রাষ্ট্রদ্রোহ। পুলিশ আসে। হাতকড়া পরায়। গাড়িতে উঠার আগে পরেশ ছাত্রদের দিকে তাকায়া কয় – “আমি গেলে তোরা থাকবি। একটা বাতি নিভলে হাজারটা বাতি জ্বলে।”
পরদিন স্কুলের দেয়ালে, বাজারে প্ল্যাকার্ড – “পরেশ মাস্টারের মুক্তি চাই। কলম ভাঙা যাবে না।” আন্দোলন শুরু হয়।
যশোর জেলখানায় পরেশের ঠাঁই হয়। রাতে ৫ জন কয়েদিরে পড়ায়। “অ” থেকে শুরু করে। সেলিম নামের এক চোর কাঁদে – “স্যার, জেলে আসার পর প্রথমবার নিজেরে মানুষ মনে হইতেছে।” জেল সুপার দরজার ফাঁক দিয়া শুনে। পরে নিজেও চক নিয়া বসে।
এদিকে রুমি ৭ দিন অনশন করে স্কুল গেটের সামনে। মুখে ভাত নাই। হাতে প্ল্যাকার্ড – “মালিরে জেলে রাখলে ফুল মরে যাবে।” গ্রামের ৫০ জন মা এসে বসে। কোলে বই নিয়া। ছবি ভাইরাল হয়। ঢাকা থেকে ফোন আসে – “পরেশ কান্তি সাহার ফাইল দেখো। মানবিক দিক বিবেচনা করো।”
১৫ দিন পর মুক্তি। জেল গেটে হাজার মানুষ। সবাই বই দেয়। পরেশ মাইক ধরে – “আমি জেলে ছিলাম। কিন্তু আমার ক্লাস বন্ধ ছিলো না। ৫ জন কয়েদি আজ অ, আ শিখছে। এই আমার জেলের ডিগ্রি।”

৩ মাস পর ডাকপিয়ন চিঠি আনে। রিফাত বিসিএসে ৮ম হইছে। এডমিন ক্যাডার। চিঠিতে লিখে – “স্যার, মনে আছে ক্লাস ফাইভে আপনি ১০ টাকা দিয়া খাতা কিনা দিছিলেন? আমি ফুল হইছি। আপনার ১০ টাকার সুদ দিলাম।”
সপ্তাহখানেক পর রিফাত সরকারি গাড়ি নিয়া আসে। সবার সামনে পরেশের পায়ে পড়ে যায়। ঘোষণা দেয় – “আমার প্রথম বেতনের টাকায় স্যারের স্কুলে কম্পিউটার ল্যাব করমু। নাম দিমু ‘পরেশ কান্তি সাহা ডিজিটাল পাঠাগার’।”
স্কুলের ৫০ বছর পূর্তিতে মন্ত্রী আসে। জাতীয় শিক্ষা পদক দিতে চায়। পরেশ মাইক ধরে – “পুরস্কার চাই না। প্রমাণ চাই। এই দেশে আর কোনো মাস্টাররে ৪ মাস বেতন ছাড়া থাকতে হবে না। আর কোনো বউরে গহনা বেচতে হবে না। আর কোনো মালিরে জেলে যেতে হবে না।”
৫২ বছর বয়সে শরীর ভাঙে। ডাক্তার কয় হার্ট দুর্বল। পরেশ হাসে – “মালি গাছে পানি দেয়া বন্ধ করলে গাছ মরে। আমি ক্লাস বন্ধ করলে আমার ছাত্র মরে।”
শেষ ক্লাসে ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে – “শেষ পাঠ: মানুষ হও।” প্রতিটা বাচ্চার কপালে চুমু খায়। বাড়ি ফেরার পথে রাস্তায় বসে পড়ে। বুক চেপে ধরে। ছাত্র রিকশাওয়ালা কাদের হাসপাতালে নেয়। ডাক্তার কয় – “ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক।”
পরেশ শেষবার চোখ খুলে। রুমি, মিতু, রাকিব, রিফাত পাশে। ফিসফিস করে – “কান্না করিস না। আমি মরতেছি না। আমি বীজ হইতেছি। মাটিতে পড়মু। হাজারটা গাছ হইমু।”
পরদিন কেশবপুরের মাঠে লক্ষ মানুষ। জানাজা পড়ায় রিফাত। কাঁপা গলায় কয় – “আমরা একটা লাশ দাফন করতেছি না। আমরা একটা বীজ দাফন করতেছি।” কবরের উপর শ্বেত পাথর – “এখানে একজন মালি ঘুমায়। যার বাগানে ২০০টা ফুল। পরেশ কান্তি সাহা – সাহিত্যরত্ন।”
মরার আগে উইল করে গেছে – চোখ দান, দেহ দান। রাতে ডাক্তারের টিম চোখ তোলে। পরদিন অন্ধ রিকশাওয়ালা জব্বার চিৎকার করে – “আমি আলো দেখি! পরেশ স্যারের আলো!” ছাত্রী সুমি কাঁদে – “স্যার, আপনার চোখ দিয়া আমি ডাক্তার হমু। গরিবের চিকিৎসা করমু ফ্রি।”
লাশ যায় খুলনা মেডিকেলে। এনাটমি ডিপার্টমেন্টে। প্রথম বর্ষের ছাত্ররা স্যালুট দেয় – “এই দেহটা একজন শিক্ষকের। সারা জীবন মানুষ গড়ছে। মরণের পরেও ডাক্তার গড়বে।”
৫ বছর পর স্কুলের নাম বদলায় – “পরেশ কান্তি সাহা স্মৃতি বিদ্যাপীঠ”। লাইব্রেরিতে ১০ হাজার বই। রিফাতের টাকায় কম্পিউটার ল্যাব। রুমি লাইব্রেরিয়ান। মিতু হেডমিস্ট্রেস। রাকিব ইঞ্জিনিয়ার।
গাঙচিল সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদ মরণোত্তর “সাহিত্যরত্ন” উপাধি দেয়। ক্রেস্টটা এখন লাইব্রেরির দেয়ালে। রিফাত মাইক ধরে কয় – “উনি কলম দিয়া যুদ্ধ করছে। হিন্দু হইয়া সাম্যের গান গাইছে। মরার পরেও দান করছে। এমন মানুষ মরে না।”
১০ বছর পর রুমিও মরে। চোখ দান করে। একটা বাচ্চা ছেলে চোখে আলো পায়। নাম রাখে “রুমি”।
আজও কেশবপুরের বটগাছের নিচে বাচ্চারা বসে। মাটিতে বসে। বই খুলে। এক বাচ্চা জিগায় – “দিদা, পরেশ স্যার কই?” দিদা আকাশ দেখায় – “ঐ তারাগুলার ভেতর রে মা।”
বাচ্চা কয় – “তাইলে স্যার মরে নাই?” দিদা হাসে – “মালি কখনো মরে না রে মা। মালি শুধু বীজ হয়। বীজ মাটিতে পড়ে, হাজারটা গাছ হয়। তুই হইলি সেই গাছ।”
বাতাসে বইয়ের পাতা ওড়ে। দূর থেকে কেউ যেন বলে – “মানুষ হও রে বাবা। মানুষ হও।”
পরেশ কান্তি সাহা মরে নাই। সে বাঁচে ২০০টা ছাত্রের মাঝে। বাঁচে দুইটা চোখে। বাঁচে একটা দেহে। বাঁচে হাজারটা বইয়ে। সে মালি। মালির স্বপ্ন মরে না।
সমাপ্ত



আপনার মতামত লিখুন