মুখ চেপে ধরলেই কি কণ্ঠ রোধ হবে?
ইতিহাস সাক্ষী, মুখ চেপে ধরে কখনও কণ্ঠ রোধ করা যায়নি। গ্যালিলিওকে চেপে ধরেছিল চার্চ, তবু পৃথিবী ঘুরেছে। সক্রেটিসকে হেমলক খাইয়েছিল এথেন্স, তবু প্রশ্ন থামেনি। আমাদের সময়ে এসে সেই মুখ চেপে ধরার কাজটা করছে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান, আর একদল রক্ষণশীল মানসিকতা। কখনও তা আসছে দোররার আঘাত হয়ে, কখনও সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত হয়ে, কখনও আবার ‘ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন’র ধোঁয়াশাপূর্ণ অভিযোগ হয়ে।
২০২৪ সালে ইরানের শিল্পী পারাস্তু আহমাদি ইউটিউবে হিজাব ছাড়া দেশাত্মবোধক গান গেয়েছিলেন। ‘আজ খুনে জাভানানে ওয়াতান’— যে গানে রক্তের দামে কেনা স্বদেশের কথা ছিল। রাষ্ট্র দেখল তাঁর মাথায় হিজাব নেই, গান শুনল না। আদালত রায় দিল: ৭৪টি দোররা। তাঁকে ও তাঁর প্রযোজনা দলের আট সদস্যকে। অপরাধ? ‘অশ্লীল ও অনৈতিক’ কনটেন্ট। রাষ্ট্রের যুক্তি, গান নয়, হিজাব না পরাই সমস্যা। অর্থাৎ কণ্ঠ নয়, মুখের আবরণটাই আসল।
২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশে এলো তার উল্টো পিঠ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী মো. তাশরিক-ই-হাবিব ফেসবুকে শাহ আব্দুল করিম, জেমস, ফজলুর রহমান বাবুর গান কভার করে ভাইরাল হলেন। সিন্ডিকেট সভা বসল। ২২ জুন রাতে সিদ্ধান্ত: তাঁকে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি। অভিযোগ তিনটি— আর্থিক অনিয়ম, একাডেমিক কার্যক্রমবহির্ভূত কাজ, এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন।
ইরানে চাবুক, ঢাকায় অব্যাহতি। পদ্ধতি আলাদা, মনস্তত্ত্ব এক। দুই জায়গাতেই প্রশ্ন একটাই: কণ্ঠ কার, আর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে?
*০১. লালসালু থেকে লালসালু ২.০*
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘লালসালু’ আমাদের চিনিয়েছিল মজিদকে। শস্যহীন অঞ্চলের এক সুবিধাবঞ্চিত মানুষ, যে ধর্মকে পুঁজি করে মহব্বতনগরে ঢোকে। সেখানে মাজার নেই, পীর নেই। তবু লাল কাপড়ে মোড়া ঢিবিকে মাজার বানিয়ে ভয় দেখায়— অবহেলা করলে বিপদ। গ্রামবাসী মানে। মজিদের আধিপত্য শুরু। সে স্কুলের বিরোধিতা করে, কারণ শিক্ষিত সমাজ প্রশ্ন করবে। আকালু-হাসু সত্য বোঝে, কিন্তু খালেক ব্যাপারীর ছায়ায় মজিদ টিকে থাকে।
আজকের বাংলাদেশে ‘লালসালু’ ছাপা হয় মাজারে মাজারে। পার্থক্য হলো, মজিদ একা ছিল, এখন সিন্ডিকেট আছে। মজিদ ঢিবিকে পুঁজি করত, এখন গিলাফ, গদি, ডেগকে পুঁজি করা হয়। সিলেটের ডিসি সারওয়ার আলম যখন হযরত শাহজালাল রহ.-এর মাজারের ৭০০ বছরের প্রথা ভেঙে টাকা প্রকাশ্যে গণনা করলেন, তখনই আমরা লালসালু ২.০-এর হিসাব পেলাম।
শনি, রবি, সোম— সপ্তাহের সবচেয়ে কম আয়ের তিন দিনে পাওয়া গেল ১৭ লক্ষ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা ৭ আনা, সাথে স্বর্ণ ও ২টি সৌদি রিয়াল। গিলাফের উপর প্রতিদিন ৫-৬ লাখ, গম্বুজের নিচে গদিতে ৩ লাখ। গরু-ছাগল-মুরগির মান্নতের হিসাব বাদই। আনুমানিক আয় প্রতিদিন ২০-২৫ লাখ। এর ৭০% যায় কথিত খাদেমচক্রের পকেটে। দানবাক্সে পড়ে মাত্র ৩০%।
সারওয়ার আলম ঘোষণা দিয়েছিলেন, মাজারের টাকা জনকল্যাণে যাবে। খাদেম ও জেলা প্রশাসন মিলে হিসাব চালাবে, গণনা হবে প্রকাশ্যে। সাথে সাথে ‘বিত্তশালী মিসকিনরা’ তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল। মন্ত্রী আরিফুল হকের বিদেশ সফরের ফাঁকে তাঁকে প্রত্যাহার করা হলো। যাওয়ার আগে তিনি পাঁচ লাখ টাকা যোগ করে ব্যাংকে রেখে গেলেন। বার্তা দিয়ে গেলেন: “সারওয়ার প্রত্যাহার হয়েছেন, কিন্তু তাঁর স্বচ্ছতার নীতি সিলেটবাসীর নিকট আমানত।”
মজিদের মাজারে প্রশ্ন তুলেছিল আকালু, হেরে গিয়েছিল। সারওয়ারের মাজারে প্রশ্ন তুললেন রাষ্ট্রেরই একজন কর্মকর্তা, তাঁকেও সরিয়ে দেওয়া হলো। মুখ চেপে ধরার পুরনো খেলা।
*০২.. গান যখন অপরাধ*
অধ্যাপক তাশরিক-ই-হাবিব কী গেয়েছিলেন? “আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম”, “বাবা কতদিন দেখি না তোমায়”, “ইন্দুবালা”। কোনোটাই অশ্লীল না, রাষ্ট্রবিরোধী না। বরং শাহ আব্দুল করিমের গান তো বাংলা বিভাগের সিলেবাসেই আছে। তবু অভিযোগ: “ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন”।
ভাবমূর্তি কী? বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ডিন্যান্স ১৯৭৩-এ “নৈতিক স্খলন”, “দায়িত্বে অবহেলা”, “স্বার্থবিরোধী কাজ” এর কথা আছে। কিন্তু “ফেসবুকে গান গাওয়া” নিষিদ্ধ না। সমস্যা হলো, “ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন” ক্লজটা এতটাই অস্পষ্ট যে একে দিয়ে সবকিছু মাপা যায়। কার ভাবমূর্তি? যারা মনে করে শিক্ষক মানেই গম্ভীর, নির্লিপ্ত, কঠোর— তাদের ভাবমূর্তি।
অথচ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসই তো গান আর সাহিত্যের মিলনের ইতিহাস। রবীন্দ্রনাথ গান লিখেছেন, গেয়েছেন, স্বরলিপি করেছেন। নজরুল “ধূমকেতু” পত্রিকা বের করার পাশাপাশি “বিদ্রোহী” গানের সুর দিয়েছেন। লালন, শাহ আব্দুল করিম একতারা হাতে সমাজ বদলেছেন। আজকের বাংলা বিভাগের শিক্ষক যদি ক্লাসের বাইরে সেই ধারাকে ছুঁয়ে দেখেন, তাহলে সেটা অপরাধ কেন?
আধুনিক শিক্ষাতত্ত্ব বলছে ‘ইন্টারডিসিপ্লিনারি অ্যাপ্রোচ’-এর কথা। সাহিত্য পড়াতে গেলে সংগীত, চিত্রকলা, পারফরম্যান্স লাগবে। অক্সফোর্ড-ক্যামব্রিজের সাহিত্যের অধ্যাপকরা কবিতা আবৃত্তি করেন, গান করেন, ইউটিউব চ্যানেল চালান। ভারতে হরিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় ২০২৩ সালে এক অধ্যাপককে লোকগান গাওয়ার জন্য পুরস্কৃত করেছে। কারণ তারা বোঝে, জনপ্রিয়তা মানে পাঠকে ছুঁতে পারা।
আমাদের এখানে উল্টো। জনপ্রিয় হলেই ভয়। পাছে ছাত্ররা তাঁকে বেশি ভালোবাসে, পাছে প্রশাসনের চেয়ে তাঁর কথা বেশি শোনে। এটা ‘লালসালু’র মজিদেরই ভয়— স্কুল হলে আমার কেরামতি কমবে।
*০৩. অস্বচ্ছ বিচার, রক্ষণশীল মানসিকতা*
তাশরিকের বিরুদ্ধে “আর্থিক অনিয়ম”-এর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কত টাকা, কোথায় অনিয়ম, কোনো তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ হয়নি। “একাডেমিক কার্যক্রমবহির্ভূত কাজ”-এর মানে কী? তিনি কি ক্লাস ফাঁকি দিয়ে স্টুডিওতে ছিলেন? তারও প্রমাণ নেই। রইল বাকি “ভাবমূর্তি”। সেটা মাপার স্কেল কোথায়?
একই সিন্ডিকেট সভায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংক্রান্ত অভিযোগে আরও কয়েকজন শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ফলে প্রশ্ন ওঠে, তাশরিকের ইস্যুটাও কি সামগ্রিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার অংশ? যখন কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তখনই সৃজনশীলতাকে “হুমকি” হিসেবে দেখে।
এটা ভিক্টোরিয়ান মানসিকতা। উনিশ শতকে মনে করা হতো, শিক্ষক হবেন নীতিবাগীশ, তাঁর ব্যক্তিজীবন থাকবে না। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে সেই ধারণা ভেঙে পড়ছে। ছাত্ররা শিক্ষককে রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে দেখতে চায়। গান গায়, কবিতা লেখে, মাঠে খেলে— এমন শিক্ষককেই তারা আপন ভাবে।
কিন্তু সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতা এখনও বহাল। বিভাগের কিছু সিনিয়র শিক্ষক ভাবেন, “আমি ৩০ বছর ধরে গম্ভীর মুখে আছি, জুনিয়র এসে গান গেয়ে হাততালি পাবে কেন?” এটা পরশ্রীকাতরতা। এটা পরিবর্তনের ভয়। এর বলি হয় শিক্ষার্থীরা। তারা শুকনো ক্লাস, নোট-গাইড আর ডিগ্রি সর্বস্ব শিক্ষা পায়।
*০৪. ইরান থেকে ঢাকা: কণ্ঠের ভূগোল
পারাস্তু আহমাদিকে ৭৪ দোররা মারা হলো কারণ তিনি হিজাব পরেননি। রাষ্ট্র তাঁর কণ্ঠ শোনেনি, পোশাক দেখেছে। তাশরিককে অব্যাহতি দেওয়া হলো কারণ তিনি ভাইরাল হয়েছেন। প্রশাসন তাঁর সুর শোনেনি, ভিউ গুনেছে।
দুই দেশে, দুই পদ্ধতি। কিন্তু দর্শন এক: নিয়ন্ত্রণ। রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠান ঠিক করে দেবে, তুমি কী গাইবে, কীভাবে গাইবে, কখন গাইবে। এর বাইরে গেলেই তুমি “অশ্লীল”, “ভাবমূর্তি বিনষ্টকারী”।
অথচ মন্ত্রী আরিফুল হক নিজেই বলেছেন, “উনি আমাদের চোখ খুলে দিয়েছেন”। সারওয়ার আলম মাজারের আয় দেখিয়ে চোখ খুলেছেন। তাশরিক গান গেয়ে দেখিয়েছেন, বাংলা বিভাগের শিক্ষক মানে শুধু ‘চর্যাপদ’ মুখস্থ করানো না, চর্যাপদকে গেয়ে শোনানোও।
চোখ খোলার পর আবার চোখ বন্ধ করে দিলে লাভ কী? সারওয়ারকে সরানো হলো, তাশরিককে থামানো হলো। বার্তা পরিষ্কার: সিস্টেম প্রশ্ন পছন্দ করে না।
*০৫. মুখ চেপে ধরলে কী হয়?
ইতিহাস বলে, সাময়িক নীরবতা আসে, কিন্তু কণ্ঠ মরে না। পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ ছিল। মানুষ আরও বেশি করে গেয়েছে। এরশাদ আমলে নজরুলের “কারার ঐ লৌহ কপাট” নিষিদ্ধ ছিল, মিছিলে মিছিলে বেজেছে।
তাশরিকের গান আজ ইউটিউবে, ফেসবুকে রয়ে গেছে। ছাত্ররা শেয়ার দিচ্ছে। অব্যাহতি দিয়ে তাঁর কণ্ঠ থামানো যায়নি, বরং প্রতিবাদের কণ্ঠ যোগ হয়েছে। সারওয়ারের হিসাব আজ সিলেটের চায়ের দোকানে আলোচনা হয়। প্রত্যাহার দিয়ে দুর্নীতির খবর চাপা দেওয়া যায়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় যদি ভাবে, একজনকে সরিয়ে দিলেই বাকিরা ভয় পাবে, তাহলে ভুল ভাবছে। ভয় দেখিয়ে সৃজনশীলতা আটকানো যায় না। বরং ভয় দেখালে সৃজনশীলতা বিদ্রোহী হয়। আজ তাশরিক গেয়েছেন শাহ আব্দুল করিম, কাল অন্য কেউ গাইবেন “লালসালু”র আকালুর গান।
*শেষ কথা: আলো নেভানো যায় না
মাস্টার বলেছিলেন, “আমি মরলে আরেক মাস্টার জন্ম নেবে।” সারওয়ার প্রমাণ করলেন, একজন ডিসি গেলে আরেকজন আসবে, কিন্তু স্বচ্ছতার দাবি থেকে যাবে। তাশরিক প্রমাণ করলেন, একজন অধ্যাপককে থামালেও ছাত্রদের ইউকুলেলে থামবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম হয়েছিল ১৯২১ সালে, “পূর্ববঙ্গের অক্সফোর্ড” হবে বলে। অক্সফোর্ডে অধ্যাপকরা ব্যান্ড দল করেন, স্ট্যান্ড-আপ কমেডি করেন, কেউ বাধা দেয় না। কারণ তারা জানে, মুক্ত কণ্ঠ মানেই মুক্ত চিন্তা, আর মুক্ত চিন্তা মানেই জ্ঞান সৃষ্টি।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় যদি ডিগ্রির কারখানা হতে চায়, তাহলে মুখ চেপে ধরুক। আর যদি জ্ঞান ও সংস্কৃতির বাতিঘর হতে চায়, তাহলে কণ্ঠকে মুক্তি দিক।
মুখ চেপে ধরলেই কি কণ্ঠ রোধ হবে? না। কণ্ঠ তখন দেয়াল ফুঁড়ে বেরোয়, বাতাসে ভাসে, পরের প্রজন্মের ঠোঁটে গান হয়ে ফিরে আসে। পারাস্তু আহমাদির দোররার দাগ শুকাবে, কিন্তু তাঁর গান ইউটিউবে থেকে যাবে। তাশরিকের অব্যাহতি পত্র একদিন ফাইলবন্দি হবে, কিন্তু “আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম” ছাত্রদের হোস্টেলে বাজবে।
সারওয়ার আলমের ব্যাংকে রাখা পাঁচ লাখ টাকা সুদে বাড়বে। তার চেয়েও বেশি বাড়বে মানুষের প্রশ্ন: মাজারের টাকা কার? বিশ্ববিদ্যালয় কার? গান কার?
এই প্রশ্নগুলোই আলো। আর আলোকে মুখ চেপে ধরা যায় না।



আপনার মতামত লিখুন