জাল টাকার গ্যাংয়ের কৌশলে বলির পাঠা ফুটপাত ব্যবসায়ী মেহেদী
ঢাকার আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় জাল টাকা উদ্ধার ও আটকের ঘটনায় এক চাঞ্চল্যকর সত্য উন্মোচিত হয়েছে। জাল টাকা কারবারি চক্রের নিখুঁত ফাঁদে পড়ে নিরপরাধ ফুটপাত ব্যবসায়ী মোঃ মেহেদী হাসান (২৩) আসামী হয়েছেন বলে অনুসন্ধান ও পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ঘটনায় সংশ্লিষ্ট এজাহার, প্রত্যক্ষদর্শী এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট ফুটে ওঠে যে, মেহেদী হাসান কোনো জাল টাকা কারবারি নন; বরং তিনি প্রতারক চক্রের শাতিল কৌশলের শিকার এক সাধারণ ক্ষতিগ্রস্ত বিক্রেতা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বুধবার (১ জুলাই) রাতে আশুলিয়ার জামগড়া ছয়তলা স্ট্যান্ডে রাস্তার পাশে নিজের ফুটপাতের দোকানে পুরাতন মোবাইল ফোন সহ বিভিন্ন সরঞ্জাম নিত্যদিনের মতো বেচাকেনা করছিলেন মেহেদী হাসান। রাত আনুমানিক সাড়ে ৮.৩০ মিনিটের দিকে ক্রেতা সেজে দোকানে আসেন অভিযুক্ত সাথী হাওলাদার (২৫) নামের এক নারী এবং তার সাথে থাকা এক পুরুষ সঙ্গী।
সাথী হাওলাদার প্রথমে মেহেদীর দোকান থেকে ২০ টাকা দামের একটি হাতের আঙুলের চাড়া কাঁটার মেশিন ও ৮০ টাকা দামের একটি ছোট বাচ্চাদের ফ্যান ক্রয় করেন। এর মূল্য পরিশোধ করতে গিয়ে তিনি মেহেদীকে একটি ১,০০০ টাকার নোট দেন। সরল বিশ্বাসে সাধারণ ক্রেতার দেয়া টাকা মনে করে মেহেদী নোটটি গ্রহণ করেন এবং ১০০ টাকা কেটে রেখে বাকি ৯০০ টাকা আসল নোট ফেরত দেন।
এর পরপরই প্রতারক সাথী হাওলাদারের সাথে থাকা পুরুষ লোকটি একটা পুরাতন মোবাইল ফোন দামাদামি করে।এবং মেহেদীর দোকানে থাকা ৪,০০০ টাকা মূল্যের একটি ব্যবহৃত পুরাতন মোবাইল ফোন পছন্দ করেন এবং অতিরিক্ত আরও ৪টি জাল টাকার নোট প্রদান করে মোবাইল ফোনটি কিনে নেন। খালি চোখে একজন সাধারণ ফুটপাত ব্যবসায়ীর পক্ষে মুহূর্তের মধ্যে অতি সূক্ষ্মভাবে ছাপানো জাল নোট চেনা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না।
দোকানদার মেহেদী জাল নোট সন্দেহ করলে আশেপাশের দোকানদারদের বিষয়টি তাৎক্ষণিক ভাবে অবগত করেন।
আশেপাশের ব্যবসায়ীরা ৫টি নোটই জাল টাকা বলে আখ্যায়িত করেন।সাথী হাওলাদার সহ তার সাথে থাকা লোকটা মুহূর্তের মধ্যে ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে চান।সাথী হাওলাদারের সাথে থাকা পুরুষ লোকটি দৌড়ে পালিয়ে গেলেও স্হানীয় বাসিন্দারা সাথী হাওলাদারকে আটক করে তাৎক্ষণিক ভাবে পুলিশকে খবর দেন।
সাথী হাওলাদার মুলত কি পেশায় নিয়োজিত তাহা জিগ্যাসা করলে তিনি একটি বিউটি পার্লারে কাজ করে বলে জনসম্মুখে বলেন।গণমাধ্যম কর্মীরা অনুসন্ধান করলে জানা যায় গত ১১ মাস যাবৎ আশুলিয়ার কাঠগড়া তামান্না বিউটি পার্লারে থেকে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে তাহার সংযোগ বিচ্ছিন্ন।
কেনাকাটা শেষ হওয়া মাত্রই গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জামগড়া পুলিশ ক্যাম্পের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।পুলিশ তখন দোকানে অবস্থানরত সাথী হাওলাদার এবং সদ্য কেনাকাটার টাকা হাতে থাকা দোকানদার মেহেদীকে আটক করে।
প্রথমত, আলামত ও পণ্যের সমতা লক্ষ করলে দেখা যায়, পুলিশ মেহেদীর কাছ থেকে উদ্ধারকৃত ৫টি ১,০০০ টাকার জাল নোট ঠিক ওই নারী ক্রেতার কেনা আঙ্গুলের চাড়া কাঁটার মেশিন ২০ টাকা আর ছোটো বাচ্চাদের ফ্যান ৮০ টাকা সর্বমোট (১০০ টাকা) ও মোবাইলের (৪,০০০ টাকা) বিক্রয়লব্ধ টাকা। কোনো ব্যবসায়ী নিজের দোকানে মালামাল বেচে ক্রেতার কাছ থেকে জাল টাকা সংগ্রহ করে না।
দ্বিতীয়ত, কম দামের পণ্য কিনে বড় নোটে আসল টাকা ফেরত নেওয়া এবং দামি পণ্য কিনে জাল টাকা গছিয়ে দেওয়া প্রথাগত প্রতারক চক্রের কৌশল (Change Money Scheme)। মেহেদী ঠিক এই কৌশলেরই বলি হয়েছেন।
তৃতীয়ত, ঘটনার সময় মূল অপরাধী পুরুষ সঙ্গী পুলিশ আসার আগে পালিয়ে গেলেও মেহেদী নিজ দোকানেই স্থির ছিলেন। কারণ তিনি অপরাধের বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলেন এবং কোনো অপরাধমূলক মানসিকতা তাঁর ছিল না।
চতুর্থত, দীর্ঘদিন ধরে সততার সাথে ফুটপাতে ব্যবসা করা মেহেদীর বিরুদ্ধে পূর্বে কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড নেই এবং এলাকার ব্যবসায়ীরা একবাক্যে তাঁর সততার সাক্ষ্য দিয়েছেন।
পঞ্চমত, আইনি ব্যাখ্যায় অপরাধ প্রমাণের জন্য ‘মেনস রিয়া’ বা অপরাধমূলক উদ্দেশ্য থাকা বাধ্যতামূলক। মেহেদী হাসান সম্পূর্ণ সরল বিশ্বাসে (In Good Faith) পণ্য বিক্রি করে টাকা গ্রহণ করেছিলেন, ফলে তিনি অপরাধী নন বরং ভুক্তভোগী।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫-এ ধারায় অপরাধ প্রমাণের জন্য ‘মেনস রিয়া’ বা অপরাধমূলক উদ্দেশ্য (Knowing or having reason to believe) থাকা বাধ্যতামূলক। মেহেদী হাসান সম্পূর্ণ সরল বিশ্বাসে পণ্য বিক্রি করে টাকা গ্রহণ করেছিলেন। ফলে তিনি অপরাধী হিসেবে গণ্য হতে পারেন না, বরং তিনি চক্রের প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগী।
এ বিষয়ে জামগড়া এলাকার ব্যবসায়ী সমিতি ও স্থানীয় সচেতন মহল অবিলম্বে আশুলিয়া থানা পুলিশ এবং উর্ধতন পুলিশ কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। একজন নিরপরাধ ব্যবসায়ী যেন অন্যায়ভাবে সাজা না পান এবং সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে মূল অপরাধী পুরুষ সহযোগীকে যেন দ্রুত আইনের আওতায় আনা হয়—এই জোর দাবি জানিয়েছেন মেহেদীর পরিবার ও সহকর্মীরা।

আপনার মতামত লিখুন