সাইবার স্পেসে বৈষম্যহীন ডিজিটাল ভবিষ্যৎ গড়তে ৩ দফা প্রস্তাব আইসিটি মন্ত্রীর
বিশেষ প্রতিনিধি: চীনে অনুষ্ঠিত মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ব ইন্টারনেট সম্মেলন- ২০২৬ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে – বহুপাক্ষিক সাইবার শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা, প্রযুক্তি ও জ্ঞানের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং ডিজিটাল বৈষম্য দূরীকরণে ৩ দফা দূরদর্শী প্রস্তাব পেশ করেছেন বাংলাদেশের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
২২ জুলাই বুধবার চীনের প্রাচীন সিল্ক রোডের ঐতিহাসিক শহর শি’আনের আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত সিল্ক রোডে বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়, ডিজিটাল ভবিষ্যতের দিকে যাত্রা সাইবারস্পেসে অভিন্ন ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্যে যৌথভাবে একটি সম্প্রদায় গড়ে তোলা থিম নিয়ে আয়োজিত ওয়ার্ল্ড ইন্টারনেট কনফারেন্স -২০২৬ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির ভাষণদানকালে তিনি এ প্রস্তাবসমূহ তুলে ধরেন।
তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে প্রাচীন সিল্ক রোডের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা স্মরণ করে বলেন, “আজকের এই মূল প্রতিপাদ্য বাংলাদেশের জাতীয় চেতনার সাথে গভীরভাবে সঙ্গতিপূর্ণ”। তিনি জানান, বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে ৬৫ শতাংশই তরুণ ও কর্মক্ষম। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ এই জনমিতিক লভ্যাংশকে (Demographic Dividend) কাজে লাগিয়ে একটি প্রযুক্তি ও বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে কাজ করছে ।
বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের সাফল্য তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, দেশে বর্তমানে ৯০ শতাংশেরও বেশি মানুষ মোবাইল কানেক্টিভিটির আওতায় এসেছে। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) প্রান্তিক কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের দোরগোড়ায় ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় পোর্টাল ও ‘ডি-নথি’ (d-Nothi)-এর মাধ্যমে দাপ্তরিক কাজকর্ম সম্পন্ন হচ্ছে। ভূমি রেকর্ড থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসেবা ডিজিটালাইজড করায় প্রতিবছর নাগরিকদের কোটি কোটি কর্মঘণ্টা সাশ্রয় হচ্ছে।
ডিজিটাল রূপান্তর কেবল ভৌত অবকাঠামোর বিষয় নয়, এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেধারও বিষয়। বাংলাদেশে এআই (AI) গবেষণা, ফিনটেক উদ্ভাবন এবং সুবিশাল ডাটা সেন্টার অবকাঠামো গঠনে ব্যাপক বিনিয়োেগর উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। একই সাথে নদীমাতৃক বাংলাদেশে মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে বন্যার পূর্বাভাস প্রদান এবং সুনির্দিষ্ট কৃষিকাজের (Precision Agriculture) জন্য ড্রোন ব্যবহারের মতো স্থানীয় সমস্যার প্রযুক্তিগত সমাধান তৈরি করা হচ্ছে।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক সংযোগস্থলে অবস্থিত বাংলাদেশের জন্য “ডিজিটাল সিল্ক রোড” একটি অর্থনৈতিক জীবনরেখা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, হাই-স্পিড সাবমেরিন ক্যাবল কানেক্টিভিটির মাধ্যমে চীনের প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং আসিয়ান (ASEAN) অঞ্চলের উৎপাদন নেটওয়ার্কের সাথে বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি সংযুক্ত হচ্ছে।
সম্মেলনে যৌথ অগ্রগতির লক্ষ্যে মন্ত্রী ৩টি মূল স্তম্ভ বা প্রস্তাবনা পেশ করেন:
১) দক্ষতা বৃদ্ধি ও জ্ঞান হস্তান্তর (Capacity Building and Knowledge Transfer): কেবল হার্ডওয়্যারে নয়, বাংলাদেশের তরুণ মেধার বিকাশে বিনিয়োগের আহ্বান। সাইবার বিজ্ঞানী তৈরিতে যৌথ প্ল্যাটফর্ম গঠন।
২)সাশ্রয়ী কানেক্টিভিটি (Affordable Connectivity): প্রযুক্তি হস্তান্তর সাশ্রয়ী করা এবং বিশ্ব প্রযুক্তি নেতাদের সহযোগিতায় ডিজিটাল বিভাজন রোধ করা।
৩) ডিজিটাল পাবলিক গুডস (Digital Public Goods): ডিজিটাল উন্নয়নকে জনকল্যাণমূলক সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে আইপি (IP) ও ডাটা আর্কিটেকচার বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্য উন্মুক্ত করা।সাইবার অপরাধ, ভুয়া তথ্য ও ডাটা উপনিবেশবাদের মতো ঝুঁকি মোকাবেলায় সাইবার শাসনব্যবস্থাকে বহুমুখী (Multipolar), স্বচ্ছ এবং আন্তর্জাতিক আইনের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।
বক্তব্যের শেষে প্রাচীন সিল্ক রোডের “আস্থা ও বিশ্বাসের” নীতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে মন্ত্রী বলেন, “ডিজিটাল সুপারহাইওয়েকেও আমাদের সেই একই বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশ সংযোগ, তরুণ শক্তি ও উদ্ভাবনী চেতনা নিয়ে এই যাত্রায় নির্ভরযোগ্য অংশীদার হতে প্রস্তুত”।
উল্লেখ্য, ২১-২২ জুলাই অনুষ্ঠিত এই কনফারেন্সে বিশ্বের ৫২টি দেশ ও অঞ্চলের প্রায় ৮০০ জন অতিথি এবং প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল বাণিজ্য, সিল্ক রোড ই-কমার্স, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, স্মার্ট স্বাস্থ্যসেবা এবং বৈশ্বিক ডিজিটাল সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়।এছাড়া কোয়ালকম, লেনোভো, জেডটিই, ৩৬০, সুগন, ওয়াটারড্রপ, কিসন টেকনোলজি, পেঙ্গুয়া ফান্ডসহ চীনের এবং বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও ফোরামে অংশ নেন।
ঢাকার ডাক নিউজ/এস



আপনার মতামত লিখুন