গ্রেপ্তার আতঙ্কে স্তব্ধ রাজশাহী আড়ালে চলছিল বড় কর্মসূচির প্রস্তুতি
২০২৪ সালের ২ আগস্ট রাজশাহীর রাজপথ ছিল প্রায় নিস্তব্ধ। বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম ছিল কার্যত স্থবির। নগরের বিভিন্ন প্রবেশপথে চেকপোস্ট শিক্ষার্থীদের মেসে অভিযান এবং গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় আন্দোলনের সমন্বয়কদের অনেকেই আত্মগোপনে ছিলেন। প্রকাশ্যে বড় কোনো কর্মসূচি না হলেও আড়ালে চলছিল যোগাযোগ সাংগঠনিক সমন্বয় ও পরবর্তী কর্মসূচির প্রস্তুতি। আন্দোলন সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী এই প্রস্তুতিরই বহিঃপ্রকাশ ঘটে পরদিন ৩ আগস্টের কর্মসূচিতে।
সেদিন ঢাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘোষিত দ্রোহযাত্রা য় হাজারো মানুষের অংশগ্রহণ হলেও রাজশাহীতে একই পরিসরে কর্মসূচি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। আন্দোলন সংশ্লিষ্টদের দাবি নগরজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি এবং আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীদের সক্রিয় অবস্থানের কারণে প্রকাশ্যে কর্মসূচি পালন সীমিত হয়ে পড়ে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জুলাইজুড়ে সহিংসতা প্রাণহানি ও ধরপাকড়ের ঘটনার পর আন্দোলনের চরিত্র দ্রুত বদলে যেতে থাকে। কোটা সংস্কারের দাবির গণ্ডি পেরিয়ে আন্দোলন সরকারবিরোধী গণআন্দোলনের দিকে মোড় নেয়। আন্দোলনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী ২ আগস্ট ছিল সেই রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন।
ঢাকার দ্রোহযাত্রায় অংশ নেওয়া আইনজীবী মানজুর আল মতিন বলেন “মিছিলের শুরু বা শেষ দেখা যাচ্ছিল না। মানুষের ক্ষোভ ও প্রতিবাদ সেদিন স্পষ্ট ছিল। তখনই মনে হয়েছিল পরিস্থিতি বড় ধরনের পরিবর্তনের দিকে যাচ্ছে।
এর ধারাবাহিকতায় ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও ‘ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার অবসান’-এর দাবিতে এক দফা ঘোষণা করা হয় এবং সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক মেহেদী সজিব বলেন, ২ আগস্টের কর্মসূচির প্রস্তুতি থাকলেও নিরাপত্তাজনিত কারণে কয়েকজন সমন্বয়ককে আত্মগোপনে যেতে হয়। ফলে পরিকল্পনামাফিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। তবে আন্দোলন থেমে থাকেনি পরদিনের কর্মসূচি সফল করতে বিভিন্ন ছাত্র ও রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় অব্যাহত ছিল।
আন্দোলন সংশ্লিষ্টদের দাবি ওই সময় রাজশাহীর বিভিন্ন প্রবেশপথে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানো হয় এবং শিক্ষার্থীদের মেস ও আবাসস্থলে অভিযান পরিচালিত হয়। একই সময়ে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করতে দেখা যায় বলেও তারা অভিযোগ করেন। এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
২ আগস্ট রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ কর্মসূচিতে অংশ নিতে গেলে আশিকুর রহমান নামে এক শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে আটক করে মতিহার থানায় নেওয়া হয়। পরে কয়েকজন শিক্ষক থানায় গিয়ে তার মুক্তির উদ্যোগ নেন। রাত সাড়ে ৯টার দিকে তাকে শিক্ষকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইফতিখারুল আলম মাসউদ বলেন, শিক্ষার্থী আটকের খবর পেয়ে তারা থানায় যান এবং দীর্ঘ আলোচনার পর তাকে মুক্ত করে আনেন। শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোকে তারা শিক্ষকের দায়িত্ব বলেই মনে করেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দীন খান বলেন আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অযৌক্তিক হয়রানির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াকে তারা নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে দেখেছেন। শিক্ষার্থীকে মুক্ত করে আনার ঘটনাও সেই দায়িত্ববোধের অংশ ছিল।
যদিও ২ আগস্ট রাজশাহীতে বড় কোনো গণমিছিল হয়নি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মতে দিনটি ছিল পরবর্তী কর্মসূচির প্রস্তুতি সমন্বয় এবং পুনর্গঠনের দিন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী সেই প্রস্তুতির ধারাবাহিকতায় ৩ আগস্ট রাজশাহীতেও আন্দোলন নতুন গতি পায় এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ বাড়তে শুরু করে।

আপনার মতামত লিখুন