কৃত্রিম প্রজনন আইন উপেক্ষিত, ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ কৃষক
বাংলাদেশে কৃত্রিম প্রজনন নীতিমালা স্পষ্ট থাকা সত্ত্বেও, মাঠ পর্যায়ে এর যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রান্তিক কৃষকরা। কৃত্রিম প্রজনন নীতিমালা অনুযায়ী, দেশীয় গরুর জাতকে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে উন্নত করা গেলেও, কোনোক্রমেই তা ৬৫ শতাংশের বেশি উন্নত জাতে রূপান্তর করা যাবে না। এর প্রধান কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন যে, উন্নত জাতের গরু মূলত শীতল অঞ্চলের আবহাওয়ায় অভিযোজিত। আমাদের দেশের উষ্ণ আবহাওয়া এবং পরিবেশের সঙ্গে তাদের জিনগত অভিযোজন না থাকায়, উচ্চ তাপমাত্রায় উন্নত জাতের গরু বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগতে পারে। এমনকি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং প্রজনন ও উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। বাজারের কিছু অসাধু কৃত্রিম প্রজননকারী, নীতিমালাকে উপেক্ষা করে কৃষকদেরকে শতভাগ হলেস্টান ফ্রিজিয়ান অথবা অন্যান্য উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার করে সংকরায়নের প্রলোভন দেখাচ্ছে। তারা কৃষকদের কাছে উচ্চ উৎপাদনশীলতার মিথ্যা আশ্বাস দিচ্ছে এবং এর মাধ্যমে দ্রুত লাভের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। কৃষকরা সরল বিশ্বাসে এসব প্রলোভনে পা দিচ্ছেন এবং তাদের দেশীয় গরুতে ৯০ শতাংশ বা কোনো কোনো গরুতে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার করছেন। এর ফলস্বরূপ, স্বল্প সময়ের মধ্যেই এসব গরু নানা শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত হচ্ছে। দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, শ্বাসকষ্ট, হজমের সমস্যা এবং প্রজনন সংক্রান্ত জটিলতা এখন অনেক কৃষকের কাছে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। ভুক্তভোগী কৃষকরা জানান, কৃত্রিম প্রজননকারীরা বীজ বিক্রির সময় উচ্চ ফলনের প্রতিশ্রুতি দিলেও, পরবর্তীতে গরুর কোনো সমস্যা হলে তাদের আর। খুঁজে পাওয়া যায় না। ফলে, চিকিৎসার খরচ বহন করতে না পেরে অনেক কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এমনকি উন্নত জাতের গরু মৃত্যুবরণ করছে এবং তাদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে।এ বিষয়ে শৈলকুপা উপজেলার একজন প্রবীণ দুগ্ধ খামারি খোকন ঘোষ বলেন, আমি একজন কৃত্রিম প্রজননকারীর কথায় আমার গাভীতে ১০০ ভাগ ফ্রিজিয়ান বীজ দিয়েছিলাম। এ থেকে একটা ৯০% এর উপরে বকনা বাছুর পাই। বকনাটি ধীরে ধীরে গাভীতে রূপান্তরিত হয়ে গর্ভবতী হয় এবং একটি বাচ্চা প্রসব করে। প্রথম দিকে দুধের উৎপাদন কিছুটা বাড়লেও, কয়েক মাস পর থেকেই গাভীটি অসুস্থ হয়ে পড়ে। এখন চিকিৎসা করাতে অনেক টাকা খরচ হচ্ছে, কিন্তু আগের মতো আর দুধ পাই না। শৈলকুপা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রাসেল আহমেদ জানান, নীতিমালা লঙ্ঘনের বিষয়ে তারা অবগত আছেন এবং মাঠ পর্যায়ে নজরদারি জোরদার করার চেষ্টা করছেন। তবে, জনবল সংকট এবং অসচেতনতার কারণে অনেক সময় এটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়না না। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৌলিবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. আতাউর অংকন জানান, কৃত্রিম প্রজনন আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাব এবং কৃষকদের অসচেতনতাই এর মূল কারণ। তারা বলছেন, কৃষকদেরকে উন্নত জাতের গরুর বৈশিষ্ট্য, তাদের,পরিচর্যা এবং দেশীয় পরিবেশের সঙ্গে তাদের অভিযোজন ক্ষমতা সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি, কৃত্রিম প্রজনন নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা এবং অনিয়মকারীদের
বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
যদি এই প্রবণতা বন্ধ করা না যায়, তবে শুধু কৃষকই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না বরং দেশের মূল্যবান দেশীয় গরুর জাতও ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে চলে যেতে পারে। তাই, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।



আপনার মতামত লিখুন