অদ্ভুত বিড়িখোর
গ্রামের নাম শালিখাডাঙা। ছোট্ট একটি গ্রাম, চারদিকে সবুজ ধানক্ষেত, মাঝখানে আঁকাবাঁকা মাটির রাস্তা। গ্রামের মানুষজন একে অন্যের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়ায়। তবে সেই গ্রামের সবচেয়ে আলোচিত মানুষটির নাম ছিল কাদের আলী । আর তার পরিচয়—সে ছিল এক অদ্ভুত বিড়িখোর।
কাদের আলী বিড়ি খেত না—এমন দিন ছিল না। সকাল ঘুম থেকে উঠেই তার প্রথম কাজ ছিল বিড়ি খোঁজা। ঘরে খাবার আছে কি নেই, পকেটে টাকা আছে কি নেই—এসব তার কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। কিন্তু বিড়ির প্যাকেট কোথায়, দেশলাই কোথায়—এটাই ছিল তার প্রধান চিন্তা।
একদিন তার স্ত্রী রহিমা রাগ করে বলল,
—“সংসারে চাল নেই, ছেলের স্কুলের বেতন বাকি, ঘরের চাল ফুটো হয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে। আর তুমি সারাদিন বিড়ি টানো!”
কাদের আলী নির্বিকারভাবে বিড়িতে আগুন ধরিয়ে বলল,
—“বিড়ি না খেলে মাথা কাজ করে না।”
রহিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—“যেদিন মাথা আর শরীর দুটোই কাজ করবে না, সেদিন বুঝবে।”
কাদের আলী হেসে উড়িয়ে দিল কথাটা।
গ্রামের চায়ের দোকান ছিল তার দ্বিতীয় বাড়ি। সেখানে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিড়ি টানত আর আড্ডা দিত। দোকানদার মজনু একদিন মজা করে বলল,
—“কাদের ভাই, আপনি এত বিড়ি খান যে, একদিন মনে হয় আপনার মুখ দিয়ে কথা না বেরিয়ে ধোঁয়া বের হবে!”
সবাই হেসে উঠল।
কাদেরও হাসল। বলল,
—“আমি মরলেও বিড়ি হাতে নিয়েই মরব।”
কথাটা শুনে পাশে বসা বৃদ্ধ মফিজ মিয়া বললেন,
—“মৃত্যুকে নিয়ে ঠাট্টা করিস না বাবা। নেশা মানুষকে ধীরে ধীরে এমন জায়গায় নিয়ে যায়, যেখান থেকে ফেরার পথ থাকে না।”
কাদের আলী আবারও হেসে বলল,
—“মফিজ চাচা, মৃত্যু তো একদিন সবারই হবে। তার আগে একটু সুখ করে নিই!”
কিন্তু কাদের জানত না, তার সেই কথার উত্তর একদিন জীবনই দেবে।
দিন যেতে লাগল। তার কাশি বাড়তে লাগল। প্রথমে শুকনো কাশি, পরে কাশির সঙ্গে বুকব্যথা। রাতে ঘুম ভেঙে যেত। হাঁটতে গেলেই হাঁপিয়ে উঠত। গ্রামের লোকজন তাকে ডাক্তার দেখাতে বলল।
রহিমা একদিন জোর করে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে গেল।
ডাক্তার পরীক্ষা করে বললেন,
—“আপনি কি নিয়মিত ধূমপান করেন?”
কাদের মাথা নিচু করে বলল,
—“জি।”
—“কত বছর ধরে?”
—“ত্রিশ বছরের মতো।”
ডাক্তার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—“এখনই বিড়ি বন্ধ করতে হবে। আপনার ফুসফুস ভালো নেই। নিয়ম না মানলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।”
কাদের আলী বাইরে এসে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। রহিমা ভাবল, এবার বুঝি মানুষটা বদলাবে।
কিন্তু বাড়ি ফেরার পথে কাদের রাস্তার পাশের দোকানে দাঁড়িয়ে বলল,
—“এক প্যাকেট বিড়ি দেন।”
রহিমা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।
—“ডাক্তার কী বলেছে শুনলে না?”
কাদের বিড়ির প্যাকেট হাতে নিয়ে মৃদু হেসে বলল,
—“ডাক্তার তার কাজ করেছে, আমি আমার কাজ করছি।”
রহিমার চোখে পানি এসে গেল।
এরপর একদিন কাদেরের ছেলে রাকিব বাবার সামনে এসে দাঁড়াল। হাতে তার স্কুলের পুরোনো খাতা।
সে বলল,
—“বাবা, তুমি কি আমাকে একটা কথা দেবে?”
—“কী কথা?”
—“তুমি বিড়ি ছেড়ে দেবে?”
কাদের কোনো উত্তর দিল না।
রাকিব বলল,
—“স্যার আজ বলেছেন, বাবা-মা আমাদের ভবিষ্যৎ গড়েন। কিন্তু তুমি যদি বিড়ির পেছনে টাকা খরচ করো, আমার বই কিনবে কী দিয়ে?”
কাদেরের বুকটা কেঁপে উঠল।
সে ছেলের মাথায় হাত রেখে বলল,
—“ঠিক আছে বাবা, চেষ্টা করব।”
সেদিন সত্যিই সে বিড়ি ছাড়ার চেষ্টা করল।
একদিন… দুইদিন… তিনদিন।
চতুর্থ দিন ভীষণ অস্থির হয়ে উঠল সে। হাত কাঁপতে লাগল। মাথা ঝিমঝিম করল। মনে হলো, একটা বিড়ি খেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।
সে চায়ের দোকানের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
দোকানের সামনে গিয়ে হঠাৎ তার চোখ পড়ল দেয়ালে ঝোলানো একটি পোস্টারের দিকে—
**“তামাকজাত দ্রব্য মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়।”**
কাদের কিছুক্ষণ পোস্টারের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর পকেট থেকে টাকা বের করল।
দোকানদার ভাবল, কাদের আবার বিড়ি কিনবে।
কিন্তু কাদের বলল,
—“এক কেজি চাল দেন।”
দোকানদার অবাক।
—“চাল?”
—“হ্যাঁ। আজ থেকে আমার বিড়ির টাকা দিয়ে আমার ছেলের বই-খাতা আর সংসারের খাবার কিনব।”
সেদিন কাদের আলী প্রথমবার নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে জয়ী হয়েছিল।
কিন্তু বহু বছরের নেশার ক্ষত সহজে শুকায় না।
কয়েক মাস পর তার শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হলো। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হলো। বিছানায় শুয়ে কাদের ছেলেকে কাছে ডেকে বলল,
—“রাকিব, আমি যদি আগে তোমার কথা শুনতাম, হয়তো আজ এ অবস্থায় আসতাম না।”
রাকিব বাবার হাত ধরে কাঁদতে লাগল।
কাদের মৃদু স্বরে বলল,
—“তুই কখনো কোনো নেশা করিস না। মনে রাখিস, নেশা প্রথমে মানুষকে আনন্দ দেয়, তারপর অভ্যাস বানায়, শেষে মানুষটাকেই কেড়ে নেয়।”
কিছুদিন পর কাদের আলী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরল। পুরোপুরি সুস্থ নয়, কিন্তু সে আর কখনো বিড়ি হাতে নেয়নি।
গ্রামের চায়ের দোকানে এখনো মাঝে মাঝে তার কথা ওঠে।
মজনু দোকানদার হাসতে হাসতে বলে,
—“একসময় কাদের ভাইয়ের হাতে সবসময় বিড়ি থাকত। এখন দেখো, হাতে থাকে নাতির বই!”
কাদের আলী দূর থেকে শুনে মুচকি হাসে।
তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলে—
**“বিড়িকে আমি ভেবেছিলাম আমার বন্ধু। আসলে সে ছিল আমার নীরব শত্রু।”**
কাদের আলীর গল্প গ্রামের মানুষের কাছে আজ একটি শিক্ষা।
কারণ নেশা কখনো বন্ধুত্ব করে না।
নেশা শুধু মানুষকে ধীরে ধীরে নিজের কাছে বন্দি করে।
**বিড়ি, সিগারেট, গুল ও তামাকজাত দ্রব্য স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তাই নেশাকে নয়—জীবনকে ভালোবাসুন।**

আপনার মতামত লিখুন